যাঁরা বিতর্ক তৈরি করছেন, তাঁদের বোধ সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ সফর এবং তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কটি অনভিপ্রেত। রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান। তাঁর পদমর্যাদা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তাঁর পদমর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ণ না-হয়, তা সমস্ত সংগঠনেরই দেখা উচিত। কিন্তু আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, যে সংগঠন তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তাদের বোধহয় এই ধরনের পদমর্যাদার ব্যক্তিকে নিয়ে অনুষ্ঠান করার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। গলদটা বিসমিল্লায়। কিন্তু সেই গলদের দিকে না-দেখে অযাচিত বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি যে কোনও সরকারি কর্মসূচিতে দেশের যে কোনও প্রান্তে, দেশের বাইরে যেতে পারেন। যে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানেও যেতে পারেন। তবে সংবিধান অনুযায়ী তাঁর কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাওয়া সমীচীন নয়। যে সংগঠন তাঁকে উত্তরবঙ্গে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সেই ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কাউন্সিল’-এর সদর দফতর ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগে। রাজ্যের বাইরের যে কোনও সংগঠন এ রাজ্যে এসে তাদের কর্মসূচি করতেই পারে। কিন্তু তাদের অনুষ্ঠানের ধরন, অতীতের উদাহরণ এবং রাষ্ট্রপতির বক্তব্য বিতর্কের উদ্রেক ঘটিয়েছে।
প্রথমত, সংগঠনটির তরফে বলা হয়েছিল, এটি ‘আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলন’। আমরা জানি, সম্মেলনে বাছা বাছা লোক নিয়ে হয়। সেখানে জনসভার মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ থাকেন না। ২০১৮ সালে এই সংস্থাই অসমের গুয়াহাটিতে একই ধরনের অনুষ্ঠান করেছিল ৫০০ প্রতিনিধি নিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি মন্তব্য করেছেন, তাঁর কর্মসূচির জায়গায় পাঁচ লক্ষ মানুষের বন্দোবস্ত করা যেত। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রপতির কর্মসূচি যাঁরা নির্ধারণ করেন, তাঁরা কি তাঁকে সঠিক ভাবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করেননি? নামে ‘আন্তর্জাতিক সম্মেলন’ বলা হলেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে যে, পৃথিবীর ক’টি দেশ থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন ওই সম্মেলনে?
কর্মসূচি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার গোড়ায় যাওয়া প্রয়োজন। গত ৪ মার্চ শিলিগুড়ির এসডিও রাষ্ট্রপতির কর্মসূচিস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন একটি বাঁশও পড়েনি। তিনি জানান জেলাশাসককে। সে দিনই জেলাশাসক অবগত করেন নবান্নকে। নবান্ন জানায় রাষ্ট্রপতির সচিবালয়কে। অর্থাৎ, যাঁরা আয়োজক (ভুলে গেলে চলবে না, সেই সংস্থার সঙ্গে রাজ্য সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই) তাঁরাই রাষ্ট্রপতির কর্মসূচির গুরুত্ব বোঝার জায়গায় ছিলেন না।
রাষ্ট্রপতিকে অসম্মানের কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু যাঁরা এই বিতর্ক তৈরি করতে চাইছেন, তাঁদের মনে করিয়ে দিতে চাই, রাষ্ট্রপতি যেমন দেশের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি যেমন দেশের তিনটি বাহিনীর প্রধান, তেমনই তিনি সংসদেরও অংশ। শুধু লোকসভা এবং রাজ্যসভা নিয়ে সংসদ নয়। সেখানে রাষ্ট্রপতিও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হল এই যে, নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে সেই রাষ্ট্রপতিকেই আমন্ত্রিতদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল! গণতান্ত্রিক দেশের সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী প্রবেশ করেছিলেন রাজতন্ত্রের প্রতীক হাতে নিয়ে। গত বছর সেপ্টেম্বরে উত্তরপ্রদেশের মথুরায় গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। সেই সময়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজ্যপাল আনন্দীবেন পটেল এবং মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ যাননি।
আগেই লিখেছি, রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান। তাঁর নিরাপত্তা-সহ ননাবিধ বিষয় সম্পর্কে ‘ব্লু বুক’-এ লেখা রয়েছে। যে ‘ব্লু বুক’-এর গোড়াপত্তন হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনে। ইংরেজ আমলে যত জন ‘ভাইসরয়’ ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এক জনকেই খুন হতে হয়েছিল। ১৮৭২ সালে আন্দামান পরিদর্শনের সময়ে ওয়াহাবি আন্দোলনের সমর্থক শের আলি আফ্রিদির ছুরিকাঘাতে লর্ড মেয়ো নিহত হওয়ার পরে উচ্চপদস্থদের নিরাপত্তা-সহ ইত্যাদি বিষয়ে ‘ব্লু বুক’ তৈরির ভাবনা শুরু হয়। যাঁরা জওহরলাল নেহরুর নামে সমালোচনা না-করে জলস্পর্শ করেন না, তাঁদের বোধহয় জানা নেই, এই ‘ব্লু বুক’ গ্রহণ করা হয়েছিল নেহরুর সময়েই। পরবর্তীকালে নানা সময়ে এই ‘ব্লু বুক’ সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ভারতের রীতি হিসাবে তা রয়েই গিয়েছে।
তাতে কী লেখা আছে? তাতে বলা আছে রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী দেশের মধ্যে কোথাও গেলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল থাকবেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে। থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী না-থাকলে অন্য কোনও ক্যাবিনেট মন্ত্রী। রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ সফতরের সময়ে রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস পদত্যাগ করেন। এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন রাজ্যপাল তখনও রাজ্যে আসেননি। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মানুষের অধিকার রক্ষায় কলকাতার রাজপথে ধর্নায় বসেছেন। জেলায় জেলায় মন্ত্রীরাও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাস্তায় রয়েছেন। তাই শিলিগুড়ির শহরের ‘প্রথম নাগরিক’ (মেয়র) গৌতম দেবকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে। গৌতম আগে রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন।
সময়টা বুঝতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের ৬০ লক্ষ মানুষের মাথার উপর খাঁড়া ঝুলছে। মানুষ বিপন্ন। মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অনেক বড় কাজ তিনি করছেন। ফলে সময়টা বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আবার আসা যাক ‘ব্লু বুক’-এ। যা কোনও ‘আইন’ নয়। ‘গাইডলাইন’। আইন লঙ্ঘিত হলে কেউ আদালতে যেতে পারেন। গাইডলাইনের ক্ষেত্রে বিষয়টি তা নয়। যাঁরা বিতর্ক তৈরি করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। অযথা তৈরি করা এই আকচাআকচি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। নচেৎ রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হবে।
(লেখক তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ। মতামত নিজস্ব)