Droupadi Murmu-Mamata Banerjee row

যখন রাজধর্মের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে রাজদম্ভ!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’তে নন্দিনী ছিল প্রাণের প্রতীক। আর রাজা ছিল রুদ্ধদ্বারের আড়ালে থাকা যান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। এখন বাংলার শাসনব্যবস্থা সেই অভিশপ্ত যক্ষপুরীতে পরিণত।

Advertisement

শমীক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫৭
Share:

মুখ্যমন্ত্রী কি নিজেকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে মনে করেন? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

জালের দরজায় আঘাত করে নন্দিনী আকুল প্রশ্ন করেছিল, ‘শুনতে পাচ্ছ? রাজা শুনতে পাচ্ছ?’

Advertisement

নন্দিনীর সেই প্রশ্ন কেবল যক্ষপুরীর রাজার কানে পৌঁছনোর আর্তি ছিল না। তা ছিল যন্ত্রসভ্যতার পাষাণপ্রাচীরে বিদ্ধ প্রাণের স্পন্দন। ২০২৬ সালের ৭ই মার্চ শিলিগুড়ির মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী দ্রৌপদী মুর্মু যখন তাঁর লাঞ্ছনার কথা ব্যক্ত করলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের আকাশ-বাতাস জুড়ে নন্দিনীর সেই হাহাকারই যেন প্রতিধ্বনিত হল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আজকের নবান্ন যক্ষপুরী সেই স্বর্ণলোভী রাজার চেয়েও অধিকতর পাষাণ এবং অহঙ্কারী। সেখানে ক্ষমতার দম্ভ ছাপিয়ে গিয়েছে স্বাভাবিক প্রাণের স্পন্দন। সেখানে সংবিধানের চেয়ে বড় একনায়কতন্ত্রের দাপট।

ভারতের প্রথম নাগরিক, এক জনজাতীয় নারী যখন পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে পা রাখেন, তখন শিষ্টাচার অনুযায়ী তাঁর পথ কুসুমাস্তীর্ণই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন উপহার দিল এক সুপরিকল্পিত উপেক্ষা এবং অসম্মান। শিলিগুড়ির বিধাননগরের প্রশস্ত মাঠ থেকে রাষ্ট্রপতির সভাকে গোঁসাইপুরের সংকীর্ণ, এক ঘিঞ্জি কোণে সরিয়ে দেওয়া কেবল স্থানাঙ্ক পরিবর্তন ছিল না, ছিল ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে ‘একঘরে’ করার কদর্য প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র।

Advertisement

কবি বলেছেন, ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও/ মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।’ পাশে এসে দাঁড়ানো তো দূর অস্ত, কলকাতার ধর্নামঞ্চে বসে রাষ্ট্রপতির সফর নিয়ে যে বিদ্রূপ ছুড়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী, তা কি কোনও সুস্থ গণতন্ত্রের ভাষা? যখন মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “উনি কেন এসেছেন জানি না”, তখন তো তিনি প্রকারান্তরে ভারতের সংবিধানকেই অস্বীকার করলেন! মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণ আবার প্রমাণ করে দিল, পশ্চিমবঙ্গে শুধু সাংগঠনিক সঙ্কট উপস্থিত হয়নি, পশ্চিমবঙ্গে সংবিধানটাই নেই! এই দম্ভ, এই ঔদ্ধত্য কি সেই পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়, যে পশ্চিমবঙ্গ একদা বিশ্বকে শিষ্টাচার শিখিয়েছিল?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’তে নন্দিনী ছিল প্রাণের প্রতীক। আর রাজা ছিল রুদ্ধদ্বারের আড়ালে থাকা যান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। এখন বাংলার শাসনব্যবস্থা সেই অভিশপ্ত যক্ষপুরীতে পরিণত। যেখানে আদিবাসী সমাজের আত্মসম্মানকে ভোটের অঙ্কে মাপা হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতির মতো ব্যক্তিত্বকেও রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি বানানো হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি যখন জনসমক্ষে তাঁর বিষণ্ণতা জানিয়ে বলেন, “আমি জানি না মুখ্যমন্ত্রী কেন আমার ওপর রাগান্বিত”, তখন প্রতিটি দেশপ্রেমিক ভারতীয়ের মাথা লজ্জায় নুয়ে আসে। মুখ্যমন্ত্রী কি নিজেকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে মনে করেন? তিনি কোনও পৃথক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী? যেখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতিও একজন ‘অনাহূত বহিরাগত’?

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যে পশ্চিমবঙ্গ ভারতভুক্তি নিশ্চিত করেছিল, সেই পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে রাষ্ট্রপতির প্রতি পরিকল্পিত অবমাননা আসলে এক গভীর অশনিসংকেত। এটি কেবল এক দিনের ঘটনা নয়, এটি গত ১৫ বছরের ধারাবাহিক ‘প্রশাসনিক অরাজকতা’র চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। রাজ্যপাল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সংস্থা, আর এখন খোদ রাষ্ট্রপতি, এই সরকারের অসম্মানের তালিকা থেকে বাদ নেই কেউ। এই প্রশাসনের আকাশচুম্বী ধৃষ্টতা দিল্লির রাইসিনা হিল্‌সের মর্যাদাকেও ধুলোয় মেশাতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। যে পদ বা সংস্থাগুলি রাজনীতির বাইরে, তাদেরও আক্রমণ করতে ছাড়ছে না। দেশের রাষ্ট্রপতি, দেশের নির্বাচন কমিশন, হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, দেশের সেনাবাহিনী— সকলকে আক্রমণ করা হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’ এই লেখা লিখছি কোনও অনুরোধ করে নয়, বরং ধিক্কার জানিয়ে। যে সরকার দেশের রাষ্ট্রপতির ন্যূনতম সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনও নৈতিক অধিকার নেই। নন্দিনীর মতো আমরাও জালের দরজায় আঘাত করে বলছি, “শুনতে পাচ্ছ? সাধারণ মানুষের ধিক্কার শুনতে পাচ্ছ?”

এই দম্ভের বিনাশ অনিবার্য! ইতিহাসের পাতায় দেশের রাষ্ট্রপতির প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পরিকল্পিত অপমান কলঙ্কিত অধ্যায় হিসাবে থেকে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আর কতদিন এই ‘সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস’ মুখ বুজে সহ্য করবেন? সময় এসেছে উত্তর দেওয়ার। কারণ, মনে রাখবেন, যক্ষপুরীর সেই জাল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছিল। নবান্নের এই অহঙ্কারের জালও একদিন চুরমার হবে। আমরাই এই সরকারকে তিন বার ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় এনেছি। তাই পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে রাষ্ট্রপতির অপমানের দায় আমাদেরও। পাপস্খালন করতে হবে আমাদেরই।

(লেখক বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ। মতামত নিজস্ব)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement