শব্দরা ভেসে ভেসে আসে। যেমন, ইস্তাহার। উৎস আরবি, কিন্তু শতবর্ষেরও আগেই এই শব্দ বাংলার হয়ে গেছে। প্রতিশব্দ ঘোষণাপত্র বা প্রতিশ্রুতি। সম্প্রতি বিজেপি অভিযোগ করল, যাঁরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ‘সঙ্কল্প পত্র’ না বলে ইস্তাহার বলেন, তাঁরা বাঙালির উপরে উর্দু চাপিয়ে দিয়ে এ-রাজ্যকে ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ বানাতে চাইছেন। এই ভাবে, বিজেপির হাত ধরে বাংলা ভাষায় এল এক নতুন শব্দবন্ধের প্রয়োগ, সঙ্কল্প পত্র।
সেই ভাবেই জুমলা। উৎস আরবিতে। প্রয়োগ আছে হিন্দি, গুজরাতি ও উর্দুতে। অমিত শাহের সৌজন্যে জুমলা ছড়িয়ে পড়ল দেশের সব প্রান্তে। এল আমাদের বঙ্গেও। শব্দটির মূল অর্থ হল বাক্য, বাক্যাংশ বা সমষ্টি। বাংলায় যাকে বলে ‘কথার কথা’, জুমলা বস্তুটি তা-ই। আরবি-জাত এই শব্দকে গোটা দেশে এই ভাবে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সমার্থক হিসাবে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব শাহেরই।
হয়েছিল কি, মোদী ক্ষমতায় আসার মাস দশেক পর এক সাক্ষাৎকারে শাহকে জিজ্ঞেস করা হয়, মোদী যে কালো টাকা বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ করে ঢুকিয়ে দেবেন বলেছিলেন, তার কি হল? শাহ বলেন, “আরে, ওটা তো একটা জুমলা! কারও অ্যাকাউন্টে যে ওই ভাবে ১৫ লাখ টাকা ঢুকবে না, সেটা বিরোধীরাও জানে, দেশবাসীও জানত।” অর্থাৎ, ও-সব তো কথার কথা; কেউ বিশ্বাস করে নাকি?
সেই জুমলা সমানে চলেছে। ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট ত্রিপুরার ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করে। সেখানে তখন বাম সরকার। অভিযোগ অনিয়মিত নিয়োগের। মোদী-সহ বিজেপি নেতারা প্রায় সবাই প্রতিশ্রুতি দেন, এই ১০,৩২৩ জন বরখাস্ত শিক্ষকের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন। ২০১৮-য় ক্ষমতায় এল বিজেপি। চাকরি ফিরল না। ২০২০-র মার্চে চূড়ান্ত ভাবে বরখাস্ত। এর পর আন্দোলনরত শিক্ষকদের কপালে অনেক রাষ্ট্রীয় হেনস্থা জুটল। পরে কেউ কেউ এককালীন কিছু অনুদান পান। কেউ চাকরি পান অন্য পরীক্ষায় বসে। কিন্তু ওই চাকরি ফেরেনি।
নোটবন্দির সময় মোদী বললেন, সব কালো টাকা ধরা পড়বে। দেখা গেল, সব নোটই ব্যাঙ্কের হাতে ফেরত এল। কালো টাকা ভোঁ-ভাঁ। বলেছিলেন, এতে জাল টাকার নেটওয়ার্ক ভেঙে যাবে। উল্টে নতুন ২০০০ টাকার নোট এত বেশি জাল হওয়া শুরু হল যে, সেই নোট ছাপাই বন্ধ হয়ে গেল। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ চালু করে মোদী বললেন, ভারতই হবে উৎপাদনশিল্পের নতুন ঘাঁটি। তথ্য বলছে, দেশের জিডিপি-তে উৎপাদনশিল্পের হার কমে গেছে। বললেন, বছরে ২ কোটি কর্মসংস্থান হবে। সব তথ্যই যখন দেখাচ্ছে মোদী সরকারের আমলে কর্মসংস্থান কমছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী তখন বললেন, তোমরা চাকরি কমা দেখছ, কিন্তু পকোড়া বিক্রি থেকে রোজগার দেখছ না!
এ বার পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য ছ’টি গ্যারান্টি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: ১) বিজেপি ভয়ের বদলে ভরসা দেবে; ২) সরকারি ব্যবস্থা জনতাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকবে; ৩) দুর্নীতি ও মহিলাদের উপরে হওয়া অত্যাচারের সমস্ত ফাইল নতুন করে খোলা হবে; ৪) তৃণমূল জমানার দুর্নীতিবাজদের জায়গা হবে জেলের অন্ধকারে, তৃণমূলকে মানুষের টাকা খেতে দেবেন না মোদী; ৫) শরণার্থীরা সব সুযোগসুবিধা পাবেন, কিন্তু অনুপ্রবেশকারীকে বহিষ্কার করা হবে; ৬) বিজেপি সরকার তৈরি হলেই এখানে সপ্তম পে কমিশন চালু হবে।
শেষ থেকেই শুরু করি। ২০১৮-র ভোটের আগে ত্রিপুরায় সপ্তম বেতন কমিশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী। বিজেপি ক্ষমতায় এসে খাতায়-কলমে তা ঘোষণা করে। কিন্তু আট বছরেও তার সব সুযোগসুবিধা কর্মীরা পাননি। বস্তুত, ক্ষমতায় আসার কিছু দিন পরেই মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব বলেছিলেন, কেন্দ্রীয় হারে বেতন দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ভাল না। এ বছর মার্চে ৫% মহার্ঘভাতা বাড়ানোর পরেও কেন্দ্রের সঙ্গে এখনও ১৭ শতাংশ-বিন্দু ব্যবধান।
‘শরণার্থীরা’ নাগরিকত্ব-সহ সব সুযোগসুবিধা পাবেন, এটা তো ২০১৪ থেকেই বলছেন মোদী। তবে যেটা তাঁরা এসআইআর শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত বলেননি— সেটা হল নাগরিকত্বের এই পথ কণ্টকমুক্ত নয়, এর জন্য সাময়িক ভাবে ভোটাধিকার হারাতে হতেই পারে। সেই কথাটা প্রথম এসআইআর শুরুর পর বলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা শান্তনু ঠাকুর। ডিসেম্বর ২০২৫। বললেন, “কেন্দ্রীয় সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য আমাদের যদি এসআইআরের সমস্যা পোহাতে হয়, তা পোহাব।” এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ৫০ লক্ষ রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি মুসলিম, পাকিস্তানি মুসলিমকে বাদ দিতে যদি তাঁর সম্প্রদায়ের এক লক্ষ মানুষকে ভোটদান থেকে বিরত থাকতে হয়, সেটাই কি লাভ নয়? মতুয়ারা অনেকেই হতবাক। এমন তো কথা ছিল না!
শান্তনুর বাড়ি যেখানে, সেই গাইঘাটায় মোট ৪৩ হাজার বাদ যাওয়া নামের মধ্যে ৪১ হাজারই হিন্দু, মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের। রাজারহাটের মতুয়া নেতা নবীন বিশ্বাস ২০২১ নির্বাচনের আগে নিজের বাড়িতে সপার্ষদ শাহকে খাইয়েছিলেন। তিনিও বাদ। তিনি মোটেই এই অভিজ্ঞতাকে লাভজনক মনে করছেন না। তাঁর মতো মতুয়াদের মতে, সরকার এমন সব শর্ত চাপিয়ে নাগরিকত্ব আইন এনেছে যে, সেখানেই প্রথম প্রতিশ্রুতিভঙ্গ হয়ে গেছে। নাম বাদ পড়া হল সেই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে।
মোদী গ্যারান্টি দিয়েছেন, সরকারি সিস্টেম জনতাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকবে। ঘটনা হল, সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাওয়ার সুযোগ কমিয়ে এনেছে মোদী সরকার। তথ্যের অধিকার আইনকে ভোঁতা করতে করতে প্রায় অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। সমাজমাধ্যমেও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা আটকানোর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
মোদী-শাহ থেকে সবাই বার বার বলছেন অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর কথা। কিন্তু বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ক’জন রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধরা পড়ল, সে প্রশ্নে অমিত শাহ বলছেন— নির্বাচন কমিশন জানে; আর কমিশন বলছে— এটি শাহের মন্ত্রকের ব্যাপার। এমনকি বিহারেই বা কত অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়ল, তারও জবাব নেই। শেষে শাহ এও বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা রাজ্যে ক্ষমতায় না এলে বলা সম্ভব নয়। অথচ, মন্ত্রক তাঁর হাতে। বলেছেন, রাজ্যে ক্ষমতায় এলে নাগরিকত্ব দেবেন। অথচ, নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রেরই হাতে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তৃণমূলের কাউকে টাকা খেতে দেবেন না। সে তো উনি কবেই বলছিলেন, ‘নিজেও খাব না, কাউকে খেতেও দেব না’। তার পর দেখা গেল, একের পর এক নেতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ফাইল খোলে, তদন্ত-তল্লাশি শুরু হয়, তার পর সেই নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়ে নিষ্কলুষ হয়ে ওঠেন। অসম থেকে মহারাষ্ট্র, সর্বত্র একই চিত্র। এর থেকেই তৈরি হল এক শব্দবন্ধ— ‘ওয়াশিং মেশিন রাজনীতি’। বঙ্গেও তৃণমূলের দুর্নীতিবাজরা বিজেপির পক্ষিরাজ হয়ে উঠবেন না তো? রাজ্যের প্রধান বিজেপি নেতার মতো?
মধ্যপ্রদেশে বিজেপি আমলের ব্যাপম দুর্নীতি ভারতের অন্যতম বৃহত্তম পরীক্ষা ও নিয়োগ দুর্নীতি। ভয় ধরানো সিনেমার উপাদান। ২০১৩-১৫ সালে এই দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার পর চাকরিপ্রার্থী, দালাল, ডাক্তার, সাক্ষী, সাংবাদিক, কর্মকর্তা-সহ ডজনেরও বেশি মানুষের নানা রকম অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। কেউ আপাত-দুর্ঘটনায়, কেউ মদে বিষক্রিয়ায়, কেউ আত্মঘাতী। ২০২৩ সালে ‘নিউজ়লন্ড্রি’ একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দেখায়, মধ্যপ্রদেশ পঞ্চায়েত দফতর ৮৯টি পদে ইন্টারভিউ তালিকার কাউকে ইন্টারভিউতে না ডেকে আরএসএস-সংশ্লিষ্টদের সেই চাকরি দিয়ে দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশেও আদিত্যনাথ আমলে ৬৯,০০০ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিপুল বেনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এই নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছিল। মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট অবধি। অভিযোগ, আদালতের শুনানির সময় সরকারের অনুপস্থিতি বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও আইনি জটে হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি।
বাংলায় এ বার প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম গ্যারান্টি, ভয়ের বদলে ভরসা দেবে বিজেপি। মণিপুর জ্বলছে। হিংসা-বিদ্বেষের তাপে দগ্ধ অসম। কাশ্মীরে অশান্তির শেষ নেই। শান্ত লাদাখও এখন উত্তপ্ত। ত্রিপুরায় প্রবল সন্ত্রাসের আবহে ২০১৯-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি ৯৬% আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে। ২০২১ সালে পুরসভা নির্বাচনেও। ২০২৪-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনেও— ৯৩% আসন প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। স্বশাসিত পার্বত্য অঞ্চলে তো ভিলেজ কাউন্সিল ভোটই হয়নি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে।
সঙ্কল্প আর বাস্তবের দূরত্ব, এই মাত্র।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে