কিছু ব্যক্তির কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ নয়, এ প্রবন্ধে সমগ্র মানবজাতির কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। ইলন মাস্ক বার বার বলছেন, আগামী ১০-২০ বছরের মধ্যে কাজ করাটা হবে ঐচ্ছিক— অনেকটা খেলাধুলা, ভিডিয়ো গেমে সময় কাটানো কিংবা এ রকমই একটা কিছু। এ কথা তিনি বলেছেন আমেরিকা-সৌদি বিনিয়োগ ফোরামে; ভারতের অনলাইন বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ‘জ়িরোধা’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিখিল কামাথের সঙ্গে আলাপচারিতায়; প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘ভিভা টেকনোলজি ২০২৪’-এ; কিংবা ব্লেচলি পার্কে অনুষ্ঠিত ‘২০২৩ এআই সেফটি সামিট’-এ। মাস্কের মতে, কাজ করা হবে বাজারে গিয়ে কেনাকাটার পরিবর্তে বাড়ির পিছনে আনাজের বাগান করার মতো সময়সাপেক্ষ কিছু।
প্রাথমিক ভাবে, আমার মতো কিছু অলস মানুষ স্বস্তি পেতে পারে এমন সম্ভাবনায়! কিন্তু কোনও মানুষ কাজ না করলে প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবা জুটবে কী ভাবে? মাস্ক বলছেন, রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এ সব পৌঁছে দেবে আমাদের দোরগোড়ায়। মাস্কের সংস্থা ‘টেসলা’-র ‘অপ্টিমাস’-এর মতো মানুষ-প্রতিম রোবটই হয়তো ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে বৃহত্তম শিল্প। কিন্তু কাজ না করলে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাব কোথায়? মাস্ক অভয় দিচ্ছেন, কৃত্রিম মেধা ও রোবোটিক্স-এর যুগে পৃথিবীর প্রত্যেকের নাকি থাকবে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ বা সর্বজনীন উচ্চ আয়— প্রতিটি মানুষই হয়ে উঠবে আজকের ধনীতম ব্যক্তির চেয়েও ধনী। এবং প্রচলিত অর্থে টাকাও হয়তো আর থাকবে না; শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনই হয়ে উঠবে প্রকৃত মুদ্রা। অবশ্য একটা ছোট্ট ‘শর্তাবলি প্রযোজ্য’-ও রয়েছে। সেটা আবার বড় বিমূর্ত— মাস্ক বলছেন, এ জন্য দরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে সত্য ও সুন্দরের প্রতি গভীর অনুরাগ ও দায়বদ্ধতা।
চাকা আবিষ্কার বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রপাতির প্রবর্তন, বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুতের ব্যবহার— প্রযুক্তিগত বিপ্লব কেবল উৎপাদনশীলতাই বাড়ায়নি, মানুষের শ্রমের একটি অংশকে চাপিয়ে দিয়েছে মানুষেরই সৃষ্ট যন্ত্রপাতির ঘাড়ে। ফলে অনেকটাই লাঘব হয় মানুষের কর্মভার। কৃত্রিম মেধাও তো আর একটা প্রযুক্তি। এই সোনার কাঠির ছোঁয়ায় কি আমূল পরিবর্তন ঘটবে কর্মসংস্কৃতিতে? অবশ্য অন্যান্য প্রযুক্তির তুলনায় কৃত্রিম মেধা খানিক আলাদা— সভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথম প্রযুক্তির ডানার ঝাপটায় কাজ হারাচ্ছেন কলেজ-শিক্ষিতরাও। এআই দানবের দাপটে কি মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণীর মাত্রায় মৌলিক ভাবে পরিবর্তিত হবে পুরোটা?
এআই সব কাজ করে দিলে দুনিয়াটাই বা কেমন হবে? খুব ভাল কিছু নয়, সেটা নিশ্চিত। কর্মহীন দুনিয়া বোধ হয় কোনও ‘ইউটোপিয়া’ নয়, বরং তা এক ‘ডিসটোপিয়া’ বা দুঃস্বপ্নের জগৎ হওয়াই সম্ভব। কর্মব্যস্ত জীবনে অবসর অবশ্যই উপভোগ্য, কিন্তু অনন্ত অবসরের ক্লান্তিকর একঘেয়েমির আবর্তে মানব-সভ্যতার অস্তিত্বই হয়তো বিপন্ন হয়ে পড়বে।
মাস্ক-বর্ণিত এই স্বয়ংক্রিয় ও ঐচ্ছিক কর্মজীবন-সম্বলিত ভবিষ্যৎ দুনিয়ার অনুপ্রেরণা সম্ভবত ১৯৮৭-২০১২ সময়সীমায় রচিত স্কটিশ লেখক ইয়ান এম ব্যাঙ্কস-এর বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনির ‘কালচার’ সিরিজ়। স্বঘোষিত সমাজতান্ত্রিক এই লেখক কল্পনা করেছিলেন এক ‘অভাবমুক্ত’ সমাজের, যেখানে মানুষের শ্রম সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক, এআই নিশ্চিত করে প্রাচুর্য, এবং মানুষ-প্রতিম ভিন গ্রহের প্রাণী আর উন্নত ও অতি-বুদ্ধিমান এআই ছড়িয়ে থাকে পুরো ছায়াপথে। সম্ভবত ছাত্রজীবন থেকেই ব্যাঙ্কসের কল্পনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন ইলন মাস্ক। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, এআই-ই শেষ পর্যন্ত আমাদের নেবে ব্যাঙ্কস-কল্পিত সেই ‘মহাকাশ সমাজতন্ত্র’-র দিকে। ব্যাঙ্কস-এর বইতে টাকাপয়সার কোনও অস্তিত্বও নেই। বস্তুত, ‘কালচার’ সিরিজ়ের মহাবিশ্বটি বেশ আকর্ষণীয়এবং আবেগগত ভাবে বিশ্বাসযোগ্য— যদিও কল্পিত সেই অগ্রগতিতে হয়তো লাগতে পারে কয়েক শতাব্দী বা সহস্রাব্দও।
মাস্কের মতে, যে-হেতু প্রত্যেকেরই নাগালে থাকবে এআই নামক ‘জাদুপ্রদীপ’টি, তা কাজ করবে সমতা-বিধানকারী শক্তি হিসাবে। অবশ্য এই ইলন মাস্কই ২০২২-এর নভেম্বরে টুইটার অধিগ্রহণের টালমাটাল দিনগুলোতে কর্মীদের সপ্তাহে ৮০ ঘণ্টা কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। আবার টেসলা মাস্কের জন্য এক লক্ষ কোটি ডলারের পে-প্যাকেজের কথাও ভেবেছে। সর্বোপরি, সত্য-সুন্দরের অনুগামী এআই তৈরি করা কতটা সম্ভব? তা ছাড়া, এআই সস্তা হলেও রোবোটিক্সের খরচ বাড়ছে। তাই তার ব্যবহারিক বিস্তার ঘটানো বেশ কঠিন।
বস্তুত এআই-এর প্রভাবে কর্ম-পরিবেশের বদল নিয়ে মাস্কের পূর্বাভাসের সঙ্গে একমত নন অনেক বিশেষজ্ঞই। এক সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া-র কনরাড কর্ডিং এবং আইওনা মেরিনেস্কু উপস্থাপন করেছেন এআই এবং কাজের ভবিষ্যতের মূল্যায়নের এক অভিনব রূপরেখা। তাঁরা বলছেন, এআই-এর মাধ্যমে যে রূপান্তর ঘটবে, তা সুদূরপ্রসারী হলেও সীমাবদ্ধ— কখনওই অসীম নয়। আবার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণ নিয়ে মাস্কের বক্তব্য হয়তোআংশিক ভাবে ভবিষ্যতেরই প্রতিচ্ছবি— কিন্তু প্রযুক্তি-খাতে সাম্প্রতিক ব্যাপক ছাঁটাই সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার এখনও এগোচ্ছে না প্রত্যাশিত দ্রুততায়।
ব্লেচলি পার্কে মাস্কের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ এআই গবেষক এবং ‘ডিপমাইন্ড’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা সুলেমান ২০২৩-এ বলেছিলেন, আগামী ৫০ বছরের প্রেক্ষাপট ভাবলে আমাদের কিছুটা চিন্তিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, অন্তত অদূর ভবিষ্যতেই সব পাল্টে যাবে, এমন উদ্বেগের কারণ তিনি দেখেননি। সুলেমান যদিও স্বীকার করেছিলেন, জেনারেটিভ এআই নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত।
মানব-শ্রমের ভবিষ্যৎ তা হলে কী? ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকনমিক রিসার্চ-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক ওয়ার্কিং পেপার ‘উই ওন্ট বি মিসড্: ওয়ার্ক অ্যান্ড গ্রোথ ইন দি এজিআই ওয়ার্ল্ড’-এ অটোমেশন এবং শ্রম-বাজারের বিশেষজ্ঞ ইয়েল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ পাসকুয়াল রেস্ত্রেপো দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি এবং শ্রম-বাজারের উপরে ‘এজিআই’-এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে এক ভিন্নতর আলোকপাত করেছেন। আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা ‘এজিআই’ হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি তাত্ত্বিক ও উন্নততর রূপ, যা মানবীয় বা অতিমানবীয় বিবিধ কাজ বুঝতে, শিখতে এবং প্রয়োগ করতে পারবে। এজিআই তৈরির চেষ্টা এখন চলেছে জোরকদমে। রেস্ত্রেপো এমন একটি বিশ্বের রূপরেখা দিয়েছেন যেখানে প্রায় সব কাজই করা যাবে অতি দক্ষ এআই-এর সাহায্যে।
রেস্ত্রেপো ধরে নিয়েছেন, এজিআই আমাদের অর্থনীতির সমস্ত দরকারি কাজ করবে ‘কম্পিউট’ বা গণনা ক্ষমতা ব্যবহার করে। অন্য কিছু নয়, এই কম্পিউটিং ক্ষমতাই হবে দুষ্প্রাপ্য— কারণ অর্থনীতিতে মোট গণনা ক্ষমতার থাকবে একটা ঊর্ধ্বসীমা। তিনি পার্থক্য করেছেন ‘বটল্নেক’ বা ‘প্রতিবন্ধকতামূলক’ এবং ‘সাপ্লিমেন্টারি’ বা ‘সম্পূরক’ শ্রমের মধ্যে। ‘বটল্নেক’ কাজ হল সেগুলি, যা অর্থব্যবস্থার বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। রেস্ত্রেপো এর উদাহরণ দিয়েছেন অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের ঢঙে— সভ্যতার অস্তিত্বের ঝুঁকি কমানো, গ্রহাণু থেকে প্রতিরক্ষা, বা ফিউশন শক্তিতে দক্ষতা অর্জন, ইত্যাদি। ভবিষ্যতে এ সব কাজ করবে এজিআই— এমনটাই বলছেন রেস্ত্রেপো। অন্য দিকে, ‘সাপ্লিমেন্টারি’ কাজের মধ্যে এমন সব কিছু অন্তর্ভুক্ত, যা অর্থনীতির প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয় হবে না— যেমন গ্রাহক পরিষেবা, আতিথেয়তা, নকশা তৈরি, চারু ও কারুকলা, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা। এমন কিছু ‘সম্পূরক’ কাজ হয়তো থেকে যাবে মানুষের জন্যই, বলেছেন তিনি। রেস্ত্রেপোর মডেলে শ্রমের গুরুত্ব অত্যন্ত কম। জিডিপি-তে শ্রমের মোট অবদান শূন্যের কাছে পৌঁছবে বলে মনে করেছেন তিনি।
মজার ব্যাপার হল, এই গবেষণালব্ধ ফল মানুষের কাজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একযোগে আমাদের আশাবাদী এবং নিরাশ করে তোলে। এজিআই-এর যুগে এটা অন্তত স্বস্তির যে, মানুষের অধিকাংশ কাজই অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় হবে না। কারণ এই নয় যে, এজিআই সে সব করতে পারবে না— বরং কারণ হল, মানুষের অধিকাংশ কাজই প্রতিস্থাপনের পক্ষে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করবে না এজিআই। এই বিষয়টা তাই মানুষের জন্য খুব স্বস্তিরও নয়।
আপাতত সবই অবশ্য তত্ত্ব। কিছুটা বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানলব্ধ বিশ্বাস, কিছু কল্পবিজ্ঞানের অনুসরণ— খানিক আবার অর্থনীতির অঙ্ক কষা, তাও অনেক কিছু অনুমান করে নিয়ে। প্রযুক্তি মানুষের সভ্যতা আর তার কাজের সংস্কৃতিকে সত্যিই কোথায় নিয়ে যাবে— মাস্কের মহাকাশ সমাজতন্ত্রের কর্মহীন জগতে, না কি রেস্ত্রেপো-বর্ণিত ‘ওরা গুরুত্বহীন কাজ করে’র দুনিয়ায়, না কি অন্য কোনও অজানা ভবিষ্যতের দিশায়— এবং কত দিন পরে, এই চিন্তার আবর্তে আমরা ক্রমেই খরগোশের গর্ত গলে ঢুকে পড়তে থাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অজানা ওয়ান্ডারল্যান্ডের আরও গভীরে।
রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে