অর্থব্যবস্থা দ্রুত বাড়ছে, অথচ দেশের পুঁজি চলে যাচ্ছে বিদেশে
Indian Economy

ভারতে বিনিয়োগের ধাঁধা

অতিমারির পর ভারতের কর্পোরেট খাতে রেকর্ড মুনাফা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে ভারতীয় সংস্থাগুলির মুনাফা দেশের জিডিপি বৃদ্ধির তুলনায় তিন গুণ দ্রুত হারে বেড়েছে। শক্তিশালী ব্যালান্স শিট তাদের বাজার থেকে আরও পুঁজি তোলার সুযোগও দিয়েছে।

বিশ্বজিৎ ধর

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪৯
Share:

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) বা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘোষণা করেছে। ডিপার্টমেন্ট ফর প্রোমোশন অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড (ডিপিআইআইটি) বা শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য উন্নয়ন দফতর ২০২০ সালের ১৭ এপ্রিল জারি হওয়া প্রেস নোট ৩ (পিএন৩)-তে সংশোধন করেছে— ফলে ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে, এমন দেশগুলির প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নিকারীদের জন্য ভারতে চালু থাকা নিয়মকাঠামো পরিবর্তিত হল। ২০২০ সালে পিএন৩ জারি হওয়ার আগে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিক, বা ওই দেশগুলিতে নিবন্ধিত এমন সংস্থা, কেবলমাত্র সরকারি অনুমোদনের পথেই ভারতে বিনিয়োগ করতে পারত। এমনিতে যে ক্ষেত্রগুলিতে বিদেশি বিনিয়োগ নিষিদ্ধ, তার বাইরেও পাকিস্তানের নাগরিক বা সংস্থাগুলির জন্য প্রতিরক্ষা, মহাকাশপ্রযুক্তি ও পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ ছিল।

পিএন৩ সেই বিধিনিষেধকে আরও বিস্তৃত করে। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত ভাগ করে এমন সব দেশ, বা যে দেশ ভারতে কোনও বিনিয়োগের ‘বেনিফিশিয়াল ওনার’ বা লাভের প্রকৃত অধিকারী, অথবা এমন ‘বেনিফিশিয়াল ওনার’ যে দেশের নাগরিক— সবের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হয়। অর্থাৎ, এই দেশগুলি থেকে আসা এফডিআই-এর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাস্তবে এই নীতির লক্ষ্য ছিল চিন— কারণ, সীমান্তবর্তী দেশগুলির মধ্যে শুধুচিনেরই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে। লাদাখে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ভারত-চিন সম্পর্কের অবনতি ঘটে; গলওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনার সংঘর্ষের পর সেই সম্পর্ক কার্যত অচল হয়ে যায়। চিনা বিনিয়োগের উপরে এই কড়াকড়ি সেই প্রেক্ষাপটেইআরোপিত হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সংশোধনগুলি এই সীমান্তবর্তী দেশগুলির বিনিয়োগকারীদের জন্য দু’ভাবে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করেছে। প্রথমত, এই দেশগুলির বাসিন্দা যে বিনিয়োগকারীদের ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ’ নিয়ন্ত্রণমূলক নয়, এবং সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ— তাঁদের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের পথে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে, যে খাতে সেই লগ্নি আসবে তার জন্য প্রযোজ্য বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা, বিনিয়োগের পথ এবং শর্তাবলি বজায় থাকবে। দ্বিতীয়ত, মূলধনি পণ্যের নির্মাণক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে, এবং বৈদ্যুতিন মূলধনি পণ্য, বৈদ্যুতিন উপাদান, পলিসিলিকন এবং ইনগট-ওয়েফার উৎপাদনের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনিয়োগ প্রস্তাব দ্রুত, ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই খাতগুলির নির্বাচন স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী— সরকার কার্যত চিনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি সমঝোতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের যে ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটছে, তার সঙ্গেও এই পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের প্রত্যাশা, এই নতুন নির্দেশিকা বিনিয়োগকারীদের কাছে নীতিগত স্পষ্টতা আনবে, ব্যবসা করার প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে, এবং এমন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে যাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ে, নতুন প্রযুক্তি ভারতে আসে, দেশের বাজারে মূল্য সংযোজন ঘটে, দেশীয় শিল্পের সম্প্রসারণ হয়, এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযুক্তি দৃঢ়তর হয়।

তবে, এই নতুন প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নীতিটি এখনই কেন গৃহীত হল, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, সরকারের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, তারা ভারতে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়, এবং তার মধ্যে চিন থেকেও বিনিয়োগ আহ্বানের ইঙ্গিত রয়েছে। লক্ষণীয়, গত বছর থেকে ভারত-চিন সম্পর্ক নতুন ভাবে তৈরি করার একটি উদ্যোগ দেখা গিয়েছে। ২০২৫-এর অগস্টে শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজ়েশনের বৈঠকে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর তিয়ানজিন সফর— সাত বছরে তাঁর প্রথম চিন সফর— এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে, এই নীতি এখনই প্রবর্তিত হওয়ার একটি গূঢ়তর কারণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে— যে ভাবে ভারতে ধারাবাহিক ভাবে নেট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে যা আরও কমার আশঙ্কা, এই নীতিগত পরিবর্তন তারই প্রতিক্রিয়া।

ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নেট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ হল মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহার এবং ভারতীয় সংস্থাগুলির বিদেশে বিনিয়োগ বাদ দেওয়ার পরে অবশিষ্ট পরিমাণ। গত দু’বছর ধরে এই নেট প্রবাহ বিপজ্জনক ভাবে কমেছে। অতিমারির আগে এই পরিমাণ ৪,০০০ কোটি ডলারের অনেক উপরে ছিল, কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা নেমে দাঁড়ায় একশো কোটি ডলারেরও নীচে— এই শতকে ভারতে নেট এফডিআই-এর পরিমাণ কখনও এত কম হয়নি। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ন’মাসে এই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে দাঁড়ালেও উদ্বেগ সম্পূর্ণ কমেনি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। ভারতে বছরে মোট এফডিআই প্রবাহ এখনও ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ কোটি ডলারের মধ্যে রয়েছে— যাকে কোনও অর্থেই খুব কম বলা চলে না। কিন্তু নেট প্রবাহ দ্রুত হ্রাস পেয়েছে, কারণ এক দিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় মাত্রায় লগ্নি প্রত্যাহার করেছেন, এবং অন্য দিকে ভারতীয় সংস্থাগুলি বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজি প্রত্যাহারের পরিমাণ ৫,১৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে— ২০২০-২১ সালে যা ছিল ২,৭০০ কোটি ডলার এবং ২০১৫-১৬ সালে ১,১০০ কোটি ডলার। এই প্রত্যাহার ২০২৪-২৫ সালে মোট এফডিআই প্রবাহের প্রায় ৬৪ শতাংশ, এবং চলতি অর্থবর্ষেও তা ৬০ শতাংশের উপরে— যা অতিমারির আগে ২৫ শতাংশের আশেপাশে ছিল। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি হিসাবে বিবেচিত হয়। কিন্তু যখন এই বিনিয়োগ এত সহজে বেরিয়ে যেতে থাকে, তখন তা নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া স্বাভাবিক।

একই সঙ্গে ভারতের বিদেশমুখী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (ওএফডিআই)-ও দ্রুত বেড়েছে। ২০২০-২১ সালে যা ছিল প্রায় ১,১০০ কোটি ডলার, তা ২০২৪-২৫ সালে ২,৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের প্রথম ন’মাসেই এই পরিমাণ প্রায় ২,৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে— আগের বছরের তুলনায় ৬০০ কোটি ডলার বেশি। এই প্রবণতা বিস্ময়কর, এবং যথেষ্ট যুক্তগ্রাহ্য নয়। যখন ভারতের অর্থব্যবস্থা বিশ্বের প্রধান অর্থব্যবস্থাগুলির মধ্যে দ্রুততম হারেবৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন দেশীয় বিনিয়োগকারীদের দেশের ভিতরেই বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজার কথা,বিদেশে নয়।

এখানে আরও একটি তথ্য প্রাসঙ্গিক। অতিমারির পর ভারতের কর্পোরেট খাতে রেকর্ড মুনাফা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে ভারতীয় সংস্থাগুলির মুনাফা দেশের জিডিপি বৃদ্ধির তুলনায় তিন গুণ দ্রুত হারে বেড়েছে। শক্তিশালী ব্যালান্স শিট তাদের বাজার থেকে আরও পুঁজি তোলার সুযোগও দিয়েছে। তবু, এই অনুকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ভারতে বেসরকারি বিনিয়োগ মন্থরই রয়ে গেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ মোট বিনিয়োগে এর অংশ অতিমারির আগে ছিল ৩৭ শতাংশ; ২০২৪-২৫ সালে তা কমে ৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকারকে নিজস্ব মূলধনি ব্যয় বাড়াতে হয়েছে, যা গত কয়েক বছর ধরে জিডিপির ৪ শতাংশের বেশি।

ফলে এক অদ্ভুত ধাঁধা তৈরি হয়েছে। এক দিকে ভারতীয় লগ্নিকারীরা দেশ থেকে পুঁজি বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, অন্য দিকে সরকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ভারতের বাজারে বিদেশি সংস্থার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা এবং অন্যান্য ছাড় দিয়ে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের চেষ্টা করছে।

এই ধাঁধার উত্তর সরকারের কাছে আছে কি?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন