শতবর্ষ আগে ভোটে লড়া প্রথম ভারতীয় মেয়ে কমলাদেবী
Kamaladevi Chattopadhyay

সকল কাঁটা ধন্য করে

কমলাদেবীর জীবনী পড়লে যা আশ্চর্য করে, মুগ্ধ করে, তা হল ভালবাসার ক্ষমতা, ভালবাসার সাহস। স্বামীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত, প্রতারিত মেয়েদের, তাঁদের সন্তানদেরও আগলে রেখেছিলেন কমলা।

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
Share:

পুরোভাগে: রাজনীতি, সংস্কৃতিচর্চা, নারী অধিকার আন্দোলনের মুখ কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়।

মেয়েটি তখন অষ্টাদশী, আয়তনয়না, দীর্ঘকেশী সুন্দরী। ছেলেটির বয়স বাইশ, চোখ ঝলসানো তাঁর প্রতিভা। কেমব্রিজের ছাত্র সেই বাঙালি ছেলে এক কবি-বন্ধুকে গর্ব করে বলেছিল, “আমার পাশে কমলাকে হাঁটতে দেখলে দেবতাদেরও হিংসে হয়।” সেই বন্ধু, আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস উত্তর দিয়েছিলেন, “ওহে ছোকরা, দেবতাদের নিয়ে মশকরা কোরো না।” কবির কথা সত্যি হয়েছিল, বিয়েটা টেকেনি। বালবিধবা কমলাদেবীর সঙ্গে হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের প্রেম আর বিয়ে যত আলোড়ন জাগিয়েছিল, তার চাইতেও বেশি তোলপাড় হয়েছিল তাঁদের ডিভোর্স নিয়ে। স্বয়ং গান্ধী পরিচিতদের থেকে ঠাহর করার চেষ্টা করেছিলেন, ব্যাপারটা কী। ডেকে পাঠিয়েছিলেন কমলাকে। শেষ অবধি অবশ্য চিঠিতে লিখেছেন, “এই ডিভোর্স আবশ্যক।”

ডিভোর্সের মামলায় যখন ডাক এল, তখন কমলাদেবী লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দেওয়ার জন্য জেলবন্দি। প্যারোল নিয়ে ভেলোর থেকে বোম্বে এলেন। আদালতকে বললেন, যেন দর্শকশূন্য ঘরে তাঁর কথা শোনা হয়। আবেদন নাকচ হল। সবার সামনে কমলাদেবীকে জানাতে হল, স্বামী অন্য মেয়ের প্রতি অনুরক্ত। হারীন্দ্রনাথের অজস্র প্রেম অবশ্য গোপন ছিল না। পরিণত বয়সে দূরদর্শনের সাক্ষাৎকারে হাসিমুখে বলেন, ‘লেডিজ় ম্যান’ বলে তাঁর খ্যাতি মিথ্যে নয়— “আমি মেয়েদের প্রেমে পড়ে যাই, ভালবাসি। চুপিচুপি বলি, তারা সেই ভালবাসা ফিরিয়ে দেয়।”

হারীন্দ্রনাথ বললেই মনে পড়ে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা ‌ছবির সিধু জ্যাঠা, আর গুপী গাইন বাঘা বাইন ছবির জাদুকর বরফি-র কথা। হায়দরাবাদের বিখ্যাত চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সন্তান তিনি, তাঁর বড়দিদি সরোজিনী (চট্টোপাধ্যায়) নায়ডু। কবিতা, গান, নাটক, সবেতে চৌকস ছিলেন হারীন্দ্রনাথ। সাধারণ পোশাক, সহজ সংলাপ, সংযত মঞ্চসজ্জায় ভারতীয় থিয়েটার নির্মাণের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি। তাঁর আবু হাসান (১৯২৯) নাকি এমন জনপ্রিয় হয়েছিল যে মাদ্রাজের জন্য স্পেশাল ট্রেন দিতে হত।

থিয়েটারই হারীন্দ্রর প্রতি আকৃষ্ট করে কমলাদেবীকে। মেঙ্গালুরুর সারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারের কমলার (জন্ম ১৯০৩) বিয়ে হয় এগারো বছরে, বিধবা হন বারোয়। কমলার মা কিন্তু মেয়েকে বিধবার পোশাক পরতে দেননি, লেখাপড়াও ছাড়তে দেননি। ভর্তি করে দিয়েছেন নারী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মার্গারেট কাজ়িনস-এর স্কুলে। এক বার স্কুলের জন্য টাকা তুলতে মীরাবাই নাটক মঞ্চস্থ করবেন ঠিক করেন মার্গারেট। মীরা হবেন কমলা। মহানন্দে মহড়া দিচ্ছেন, বাদ সাধল সমাজ। ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবা মঞ্চে নাচ-গান করবে? নাটক বাতিল হল। সে মেয়ে যে হারীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়বে, সে আর আশ্চর্য কী? ১৯১৯ সালে তাঁদের বিয়ে হয় স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট-এ। বিয়ের পরে স্বামীর সঙ্গে নাচ, গান, অভিনয় শুরু করেন কমলা।

ভারতীয় সংস্কৃতির চর্চা যে রাজনীতির একটি মাত্রা, সে বোধ গভীর ভাবে গেঁথে গিয়েছিল কমলাদেবীর মনে। পরিণত বয়সে তিনি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা, সঙ্গীত নাটক অকাদেমি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। গান্ধীর আন্দোলনে যোগ দিয়ে চরকা কাটা, তাঁত বোনা শিখে মন গিয়েছিল ভারতের বস্ত্রশিল্পের ঐতিহ্যের দিকে। স্বাধীনতার পর তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয় অল ইন্ডিয়া হ্যান্ডিক্রাফটস বোর্ড, সেন্ট্রাল কলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ় এম্পোরিয়াম। কারিগর ও শিল্পীদের সমবায় গঠন ছিল তাঁর দেশগঠনের কাজ। তেমনই প্রত্যয় ছিল সমাজতন্ত্রে। জয়প্রকাশ নারায়ণ, রামমনোহর লোহিয়া, নরেন্দ্র দেব প্রমুখের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছেন, গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকেও গ্রহণ করেছেন। সত্যাগ্রহ বা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের কথা বলায় কমিউনিস্টরা কমলাদেবীকে পছন্দ করত না। আবার শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলায় কংগ্রেসের নেতারা সন্দেহের চোখে দেখতেন— এ মেয়ে কি ব্যক্তির সম্পদ-মালিকানার বিরোধী?

আজ থেকে একশো বছর আগে ভারতে প্রথম যে মেয়ে নির্বাচনে লড়েন, তিনি কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়। মেঙ্গালুরু থেকে মাদ্রাজ প্রভিনশিয়াল কাউন্সিলের নির্বাচনে (১৯২৬) নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন কমলা। বলেছিলেন, “আমি কোনও দল বা গোষ্ঠীর নই, মেয়েদের প্রতিনিধি।” সে সময়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে স্ত্রীর হয়ে প্রচার করেছিলেন হারীন্দ্রনাথ (তিনি নিজে প্রথম লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন নির্দল সদস্য হিসেবে)। সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে যান কমলা, কংগ্রেসের প্রার্থীর কাছে। কিন্তু দেশ-বিদেশে তাঁর নির্বাচনী লড়াই নিয়ে অনেক চর্চা হয়। পরের বছর অল ইন্ডিয়া উইমেন’স কনফারেন্স-এর প্রথম সচিব মনোনীত হন, নারী আন্দোলনে যার একটি বিশিষ্ট ভূমিকা তৈরি হয়।

ম্যাগসাইসাই, দেশিকোত্তম, পদ্মবিভূষণ, নানা সম্মানের পাশাপাশি ভারতে ‘প্রথম ডিভোর্সি’ তকমাটিও কমলাদেবীর। চট্টোপাধ্যায় পরিবার, সে সময়ের সমাজ, সবাই একে কমলারই ব্যর্থতা বলে ধরেছেন, কিন্তু এ সব দিয়ে মানুষটাকে ছোঁয়া যায় না। কমলাদেবীর জীবনী (দি আর্ট অব ফ্রিডম, নিকো স্লেট, ২০২৪) পড়লে যা আশ্চর্য করে, মুগ্ধ করে, তা হল ভালবাসার ক্ষমতা, ভালবাসার সাহস। স্বামীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত, প্রতারিত মেয়েদের, তাঁদের সন্তানদেরও আগলে রেখেছিলেন কমলা। সাদা আমেরিকান এস্থার লুয়েলা শারমান এক ভারতীয়কে বিয়ে করে নিজেকে ‘রাগিণী দেবী’ বলে পরিচয় দিতেন। ‘ভারতীয় নাচ’ দেখিয়ে বেশ নাম করেছিলেন। আমেরিকা গিয়ে রাগিণীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন হারীন্দ্রনাথ, তাঁকে নিয়ে পালিয়ে যান ইউরোপে। চটিতং স্বামীটি হারীন্দ্রর বিরুদ্ধে চিঠি পাঠান পুলিশে। ধরা পড়ার ভয়ে দু’জনে আলাদা জাহাজে কলম্বোয় আসেন, কিন্তু রাগিণীকে পুলিশ নামতে দেয় না। ভারতে পৌঁছনোর আগে জাহাজেই এক শিশুকন্যার জন্ম দেন রাগিণী।

জেলে বসেই নিঃসহায় রাগিণীর কথা জানতে পারেন কমলাদেবী। সেই শিশুকন্যা ইন্দ্রাণীর মেয়ে, রাগিণীর নাতনি সুকন্যা রহমান কমলাদেবী সম্পর্কে লিখেছেন, “হয়তো শিল্পী রাগিণীর প্রতি শ্রদ্ধা থেকে, বা হয়তো নিজের নারীবাদের আদর্শ থেকে, এই অসামান্য মহিলা কোনও বিরূপতা, অসূয়ার ঊর্ধ্বে উঠে জেলের সেল থেকে নিজের বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী, অ্যানি বেসান্তের মতো থিয়োসফিস্টদের চালনা করেন রাগিণী ও তাঁর শিশুসন্তানকে সব রকম সাহায্য করতে।”

এর বছর দুয়েক পরে বিচ্ছেদের মামলা করলেন কমলা, যখন জানলেন যে পুত্রের পরিচারিকা সীতার সঙ্গে একত্রবাস করছেন হারীন্দ্রনাথ। আদালতে বক্তব্য পেশ করে কমলাদেবী আবার ফিরে গেলেন জেলের কুঠুরিতে, ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’-এ। বছর দশেকের সন্তানের সঙ্গে তখন মায়ের দেখা হয় কখনও আদালতে, কখনও এক জেল থেকে আর এক জেলে বদলি হওয়ার সময়ে রেল স্টেশনে। চিঠিতে লিখেছেন, এ যেন নিজের হাত-পা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো যন্ত্রণা।

অথচ, কমলাদেবীকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি তা নাকচ করে দিলেন। কারণ শর্ত ছিল, তাঁকে মুচলেকা দিতে হবে তিনি ‘ভাল আচরণ’ করবেন। কমলাদেবীর সঙ্গেই গ্রেফতার হওয়া আর এক (পুরুষ) নেতা সই করে বেরিয়ে গেলেন, কমলাদেবী রাজি হলেন না। তিনি তো অন্যায় করেননি! দেশের যে কোনও জায়গায় যাওয়া, দেশের মানুষ— বিশেষত মেয়েদের— সংগঠিত করা, এ তো তাঁর অধিকার। তাকে কেন ‘মন্দ কাজ’ বলে স্বীকার করতে হবে? দেশের মানুষের স্বাধীনতা না থাকলে দেশের স্বাধীনতা নিরর্থক। ছেলের উপর হারীন্দ্রর মতো অস্থিরমতি লোকের কী প্রভাব পড়বে, সে আশঙ্কা বুকে নিয়ে দিন কাটিয়েছেন, তবু দেশবাসীর অধিকারকে খর্ব হতে দেননি।

কী শক্তি এই প্রেমের! কমলাই হারীন্দ্রকে বলেছিলেন, সীতাকে বিয়ে করা উচিত তাঁর। কমলার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পরে সীতাকে বিয়ে করেন হারীন্দ্রনাথ, সে বিয়েও টেকেনি। প্রবীণ কমলাদেবী যখন দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে দিল্লি ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে সংসার পাতছেন, সেখানে রয়েছেন সীতাও। রামকৃষ্ণ তাঁর স্ত্রী ডরিসকে ডিভোর্স করলেন, ডরিস কমলার নিকটজন হয়ে রয়ে গেলেন। কমলাদেবীর বার্ধক্যের ছবিতে দেখা যায় রঙিন শাড়ি, সুরুচিপূর্ণ গয়না, মাথায় ফুল— দামি নয়, শিল্পগুণে মহার্ঘ। সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল বোধ হয় এমন করেই ফোটে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন