Women

মহাশ্বেতার মেয়েরাই লড়ছেন

‘সালগিরার ডাকে’, ‘মূর্তি’, ‘নৈর্ঋতে মেঘ’, ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অগ্নিগর্ভা’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘রুদালী’, ‘স্তনদায়িনী’, ‘চোট্টি মুন্ডা এবং...’-এ পিতৃতন্ত্র অস্বীকারের, নারীশরীরের পণ্যায়নের প্রতিবাদের, স্থিতিস্থাপকতার গল্প।

দেবদত্তা চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ০৮:০২
Share:

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ত্রিশ-ছোঁয়া মহাশ্বেতা লিখলেন ঝাঁসির রানির জীবনী (১৯৫৬)। অধিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে নির্ভরতা নয়, খুঁজলেন স্থানীয় ইতিহাস। ঘুরে দেখলেন ঝাঁসি, সংগ্রহ করলেন লোকগাথা। পাশাপাশি বেগবতী হল মহাশ্বেতার জনজাতীয়, বনজীবী, সাধারণের, বিশেষত মহিলাদের, জীবন নথিবদ্ধকরণ। লিখলেন লোধা, শবরদের মতো চূড়ান্ত প্রান্তিকদের কথা; মহিলাদের জীবনের বাস্তবতা, যা নবভারতের ‘সমতা’, ‘সাম্যের’ জোড়া কাঠামোয় পরিভাষামাত্র, গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্ব পায়নি।

১৯৭৪-এ ভারত স্বমূল্যায়নে প্রকাশ করল টুওয়ার্ডস ইকুয়ালিটি রিপোর্ট, নারীবাদী কর্মীদের তৈরি। চোখে কাঁটা বিঁধল সমাজগঠকদের। ১৯৭২-এ ঘটে গিয়েছে স্বাধীন ভারতের অন্যতম উদ্বেগজনক ঘটনা মথুরার কারা-ধর্ষণ। পরের দু’দশক ভারতে নারীবাদী রাজনীতির নতুন অধ্যায় বলল মহিলাদের ঘরে-বাইরে শ্রম, নিম্নবর্গের সামাজিক বৈষম্যের কথা, সংস্কার থেকে নজর ঘুরিয়ে পিতৃতন্ত্রকে সোজাসুজি চ্যালেঞ্জ জানাল। তৃণমূল স্তরে সক্রিয় রাজনীতির হাত ধরে বলল ধর্ষণ, পণপ্রথা, অর্থনৈতিক বঞ্চনার কথা। লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হল হিংসা; হিংসা-বৈষম্যের যে সম্প্রদায়, বর্গ-বিশেষে আলাদা রূপ— প্রথম শুনল মানুষ। পুনঃসংজ্ঞায়িত হল ‘গার্হস্থ’, ‘ব্যক্তিগত’, ‘সম্মতি’।

মহাশ্বেতার লেখায় প্রতিফলিত এই প্রশ্নগুলিই। ‘সালগিরার ডাকে’, ‘মূর্তি’, ‘নৈর্ঋতে মেঘ’, ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অগ্নিগর্ভা’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘রুদালী’, ‘স্তনদায়িনী’, ‘চোট্টি মুন্ডা এবং...’-এ পিতৃতন্ত্র অস্বীকারের, নারীশরীরের পণ্যায়নের প্রতিবাদের, স্থিতিস্থাপকতার গল্প। ১৯৭৮-এর ‘দোপ্দি‌’ মথুরারই আত্মস্বরূপ হয়ে প্রতিবাদের বাণ হানল, যা জনজাতীয় কিশোরী মথুরার অজানা।

সত্তর-আশির নারীবাদী রাজনীতির অন্যতম দাবি সামাজিক ন্যায়ের প্রতি রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলিকে দায়বদ্ধ করা— প্রান্তিক জীবনের উপস্থিতি ও অবদানকে স্বীকৃতি, প্রতিনিধিত্ব দিয়ে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হল রাষ্ট্র ও পিতৃতন্ত্রের মঞ্চ হিসাবে নারী শরীরের ব্যবহার— দৈহিক হিংসার মাধ্যমেই নয়, বিশেষ কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, শ্রম-ভিত্তিক ও যৌন সংজ্ঞায় দাগিয়ে। মহাশ্বেতা জাত, বর্ণ, বর্গের সূচকে দেখাচ্ছেন সমাজের কোন ফাটলগুলিতে নিষ্কাশিত সামাজিক ন্যায়ের সম্ভাবনা। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উত্তাল বিতর্কের ছায়ায় গড়া চরিত্রদের মাধ্যমে জোগাচ্ছেন প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের পাঠ। দেখাচ্ছেন সমাজ-সম্প্রদায়ের ভার বইতে গিয়ে মানবাধিকারের স্বপ্ন থেকে যাচ্ছে অলীক। শোনাচ্ছেন উচ্চবর্ণ প্রভুর প্রতারণায় বেশ্যাবৃত্তিতে বাধ্য ধৌলি, সমাজচ্যুত শনিচরীর গল্প; চিন্তা এবং যষ্মীনার শরীরেও নথিবদ্ধ শোষণ, শাসনের ইতিহাস; মেরি ওরাওঁ-রা ঘুরে আঘাত হানছে শোষকদের। সত্তরের আত্মনির্ধারণের দর্শনের মূর্ত চরিত্রাভিনয় শনিচরী, চিন্তা, মেরি, গিরিবালাদের। শাসকদের গাঁথা বা বড় ঘটনাই নয়, নিম্নবর্গের মহিলারাও যে ইতিহাস রচনার রসদ— মহাশ্বেতা বুঝেছিলেন। সাহিত্য সমাজের প্রতিফলন হলে, মহাশ্বেতার ‘কাল্পনিক’ চরিত্ররা যতটা দেশ গঠনের ইতিহাস, ততটাই ব্যর্থতার সাক্ষ্যও।

আশির শেষে ‘মহিলা সমাখ্যা’ মহিলা প্রশিক্ষণ নীতির অন্তর্গত নারী আদালত প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক মহিলাদের গার্হস্থ হিংসার অভিযোগ শুনে আইনি পরামর্শের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আইনজীবীদের প্রশিক্ষণে আদালতগুলির পরিচালক স্থানীয় মহিলারাই (ন্যায় সখী)। এই আদালত নিয়ে কাজের সূত্রেই ২০২০ থেকে আমার নতুন করে আলাপ হল দোপ্দি, যশোদাদের সঙ্গে। তাঁরা যেন দেশ জুড়ে ‘ক্ষেত্রসমীক্ষার চরিত্রদের মধ্যে প্রতিফলিত’!

নারী আদালতে হল পরিচয় অত্যাচারী স্বামী, উচ্চবর্ণের জমিদার, লোভী ব্যবসায়ী, পুলিশ, মোড়লদের সঙ্গে। আলাপ হল সেই মেয়েটির সঙ্গেও, যে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে পথেঘাটের রোজকার হেনস্থা লুকোয় বাড়িতে; তিন-দশক-বিবাহিতা যে এখন শিখেছে, হিংসা অপরাধ; ভিল মেয়েরা যারা ঘরে-বাইরে হিংসার বিরুদ্ধে একজোটে গান বাঁধে; যে খাপ পঞ্চায়েতের সালিশিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ন্যায় সখীর কাছে আসে।

এই দ্বিতীয় পরিচয়ের সময়েই ভারতে প্রগতিশীল মতাদর্শ নিত্য লড়ে পশ্চাদ্‌গামী রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে, প্রান্তিক কণ্ঠ আরও রুদ্ধ, অধিকার প্রহসন; যখন লিঙ্গসাম্যে-বিশ্বাসী শহুরে পরিবারের নিরাপত্তা ছেড়ে আমি পা রেখেছি অজানা, অবিশ্বাস্য-অসম সমাজে। যুবাবস্থায় অচেনা মহিলারাই এখন বিষয়, আর বিস্ময়। মাঠেঘাটের কমলা দেবী, মধু বেন, হানিফারা চ্যালেঞ্জ ছোড়ে রাষ্ট্রকে, আইনকে, পিতৃতন্ত্রকে; গল্প করছে এবং গল্প বলছে নিজের শরীর নিয়ে, শরীর দিয়ে। বলছে তারা নারী, তবে মানুষ আগে। দ্বিতীয় নয়, বৈধ প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসাবে চাইছে স্বীকৃতি, সামাজিক ন্যায়, মানবাধিকার, সাংবিধানিক নীতির বাস্তবায়ন। মহাশ্বেতার মহিলাদের মতো।

এখনও রাষ্ট্র, পিতৃতন্ত্র, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-ত্রয়ীর নির্দেশনায় নারীশরীরে মঞ্চস্থ হচ্ছে সেই নাটক। মহাশ্বেতার দোপ্দি‌, যশোদা, মেরি ওরাওঁ, ধৌলিদের প্রান্তিকতা; তজ্জনিত নিপীড়ন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার পাঠ আমার হানিফা, অরুণারা নিচ্ছে— না জেনেই। হয়তো তাদের থেকেই তৈরি শনিচরী, চিন্তা, দোপ্দির মতো মহাশ্বেতার মহিলারা। মহাশ্বেতার মহিলারা তাই সেই রূপরেখা, যার ধাঁচে চিনতে শিখছি আমার গল্পের চরিত্রদের।

সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ়

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন