‘আপন’: জনপ্রিয় গায়িকা টেলর সুইফটকে ঘিরে ভক্তদের উল্লাস। ছবি: গেটি ইমেজেস।
বিখ্যাত ঔপন্যাসিক পল শেলডন লেখেন ভিক্টোরিয়ান কায়দার রোম্যান্টিক উপন্যাস। সে বার কলোরাডো থেকে নিউ ইয়র্ক সিটির যাত্রাপথে তুষারঝড়ে গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলেন শেলডন। এক প্রাক্তন নার্স অ্যানি উইলকস তাঁকে উদ্ধার করলেন, কিন্তু বন্দি করে রাখলেন নির্জন খামারবাড়িতে। অ্যানি অবশ্য নিজেকে দাবি করেন শেলডনের ‘এক নম্বর ভক্ত’ হিসাবে।
‘পল শেলডন’ নামক ঔপন্যাসিক সম্বন্ধে কোনও তথ্যই চট করে মাথায় না-এলে চিন্তার কোনও কারণ নেই— তিনি বাস্তব চরিত্র নন। ‘হরর’ ঘরানার তুমুল জনপ্রিয় আমেরিকান লেখক স্টিফেন কিং-এর একটি উপন্যাসের চরিত্র তিনি— ১৯৮৭ সালের উপন্যাস মিজ়ারি। সেই উপন্যাসের ভিত্তিতে সদ্য-প্রয়াত রব রেনার ১৯৯০ সালে পরিচালনা করেছিলেন একই নামের একটি মনস্তাত্ত্বিক হরর থ্রিলার সিনেমা। অ্যানির ভূমিকায় অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রীর অস্কার পেয়েছিলেন ক্যাথি বেটস। অন্ধকারাচ্ছন্ন তীব্র ‘প্যারাসোশ্যাল’ সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস সম্ভবত এই মিজ়ারি।
কেমব্রিজ ডিকশনারি ২০২৫ সালের বর্ষসেরা শব্দ হিসাবে বেছে নিয়েছিল ‘প্যারাসোশ্যাল’-কে। শব্দটি বোঝায় একতরফা মানসিক বন্ধনকে, যা মানুষ গড়ে তোলে সেলেব্রিটি, কাল্পনিক চরিত্র, ইনফ্লুয়েন্সার বা এমনকি হালে এআই চ্যাটবটের সঙ্গেও। এমন একটি সম্পর্ক, যার বিপরীত প্রান্তে থাকা মানুষ (অথবা, কৃত্রিম মেধাচালিত চ্যাটবট) সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র অবহিত নন, হওয়া সম্ভবও নয়। সে সম্পর্ক সর্বদাই যে প্রেমের, তেমনটা নয়। কিন্তু, নিঃসন্দেহে অধিকারবোধের।
আজ ক্রিকেটার স্মৃতি মন্ধানার বিয়ে ভাঙা নিয়ে একটু বেশিই ঝড় ওঠে সমাজে। টেলর সুইফট-ট্রাভিস কেলস-এর বাগদানের খবরে কিংবা সামান্থা রুথ প্রভু ও রাজ নিদিমোরুর বিয়ের সংবাদেও প্রবল প্রতিক্রিয়া ঘটে অনলাইন দুনিয়ায়, এমনকি সমাজেও। এই আবেগ কিন্তু অনেক সময়ই বিস্তৃত হয় আনন্দ ও সুরক্ষাবোধ থেকে হতাশা আর উদ্বেগের বিপজ্জনক সীমানা পর্যন্ত। বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হবে, এই মুহূর্তগুলো যেন তাদের পরিচিত কারও জীবনের ঘটনা। এই তীব্র পরিচিতিবোধকেই বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করেছে ‘প্যারাসোশ্যাল’ শব্দটি।
১৯৫৬ সালে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানীদ্বয় ডোনাল্ড হর্টন এবং আর রিচার্ড ওহল ব্যবহার করেন ‘প্যারাসোশ্যাল’ শব্দটি। সে সময় টেলিভিশনের বিস্তৃতি ঘটছে— টিভির দর্শকরা ‘মায়াময় ঘনিষ্ঠতা’ তৈরি করতে শুরু করেছে পর্দার চরিত্রগুলির সঙ্গে। আর আজ যে দৈনন্দিন শব্দভান্ডারে হঠাৎই ঢুকে পড়েছে শব্দটি, তার পিছনে অবশ্যই রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার জাদুতে পরিচিত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ভাসা-ভাসা সংযোগের সুযোগ, এবং সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান দখলদারি। ২০২৪-এর জুনে স্ট্রিমার আইশোস্পিড এক জন আচ্ছন্ন ভক্তকে ব্লক করে দেন, তাঁকে ‘এক নম্বর প্যারাসোশ্যাল’ হিসাবে দাগিয়ে দিয়ে। ফলে অভিধানে এই শব্দটি খোঁজার তাগিদ বাড়ে হঠাৎই। আবার গায়িকা চ্যাপেল রোয়ান যখন কিছু ভক্তের ‘ভয়ঙ্কর আচরণ’-এর সমালোচনা করেছিলেন ২০২৪ সালে, মনোবিজ্ঞানীরা তার মধ্যে লক্ষ করেন প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের পুনরুত্থান।
কিন্তু মানুষ কেন ঢুকে পড়ে প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের আবর্তে? নানা কারণ থাকতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক তাকে বলে সামাজিক হতে। আর অনলাইন জগতে ঘোরাফেরার জন্য কিংবা টিভি বা সিনেমার দুনিয়ায় অনেকটা সময় কাটানোর ফলে যাঁদের আমরা বার বার দেখি, তাঁদের প্রতি গড়ে ওঠে উষ্ণ অনুভূতি। এ ছাড়া একাকিত্বও প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক দানা বাঁধার একটা সম্ভাব্য কারণ।
তবে প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের রসায়ন বা তার প্রকাশ তো আর আজকের নয়। প্রিন্সেস ডায়ানা, জন লেনন কিংবা মারাদোনার মৃত্যুর পর বস্টন থেকে বুসান পর্যন্ত প্রবল শোকের যে অনুরণন উঠেছিল, তার মধ্যেও কোথাও প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের রেশ ঢুকে পড়েছিল নিশ্চয়ই। হলিউডের প্রথম যুগের ম্যাটিনি আইডলরাও প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। ক্যালিফোর্নিয়ার ফিল্ডিং গ্র্যাজুয়েট ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ববিদ ক্যারেন ডিল-শ্যাকেলফোর্ড আবার মঞ্চাভিনেতা কিংবা বিখ্যাত বক্তাদের প্রতি ‘সেলেব্রিটি ক্রাশ’-এর উদাহরণ দেখিয়েছেন এমনকি প্রাচীন রোমেও। তাই প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের যে অস্তিত্বের রেশ রয়েছে কয়েক হাজার বছর ধরেই— যে শব্দটা নেহাতই একটা অ্যাকাডেমিক শব্দ হয়ে পড়ে ছিল গত সাত দশক— তা যেন হঠাৎই হয়ে পড়েছে মূলধারার একটি শব্দ। এবং এই বিচিত্র, ‘একপেশে’ সম্পর্ক ক্ষেত্রবিশেষে হয়ে উঠছে বেশ খানিকটা সমস্যারও।
কিন্তু এ কি নেহাতই একতরফা সম্পর্ক? কিংবা কৃত্রিম মেধার যুগে ক্ষেত্রবিশেষে এই একতরফা প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের কি খানিক উত্তরণ ঘটেছে? তেমনটাই বলেছে কম্পিউটারস ইন হিউম্যান বিহেভিয়র রিপোর্টস জার্নালের ২০২১-এর একটি গবেষণাপত্র। লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে অনলাইন মিডিয়ার ‘মাইক্রোসেলেব্রিটি’দের প্রসারের ফলে প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের প্রকৃতি ক্লাসিক একতরফা থেকে সরে এসে একটি ‘দেড়-তরফা’ সম্পর্কের দিকে মোড় নিয়েছে, যার পারস্পরিক যোগাযোগের সম্ভাবনা, শক্তিশালী গোষ্ঠীগত সম্পর্ক, ‘ফ্যানডম’ সংস্কৃতি, আকাঙ্ক্ষিত আত্মপরিচয়, উচ্চ মানসিক সম্পৃক্ততা ও বর্ধিত উপস্থিতির মতো বৈশিষ্ট্য আছে।
তবে কোনও সেলেব্রিটির ভক্ত বা ফ্যান হওয়া আর প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক থাকা নিশ্চয়ই এক নয়, যদিও এদের সীমারেখা বিস্তীর্ণ, ধূসর আবছায়ায় ঢাকা। তাই সেলেব্রিটিদেরও মাঝেমধ্যে মুখ খুলতে হয় প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কে রাশ টানার আবেদন নিয়ে। টেলর সুইফটকে ভক্তদের বলতে হয় তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক জন মেয়ারকে সাইবার বুলিং না-করার জন্য। সেলেনা গোমেজ এবং হেলি বিবার উভয়ই একে অপরকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ভক্তদের কাছে অনুরোধ করেন। কিন্তু প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক কি একবিংশ শতাব্দীর পপ-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ? অনেকে মনে করেন, আজ পডকাস্ট উপস্থাপকদের স্বীকারোক্তিমূলক স্বভাব বাস্তব বন্ধুদের জায়গা নিচ্ছে। উৎসাহিত করছে প্যারাসোশ্যাল মনোবৃত্তি। এবং ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, সোশ্যাল মিডিয়ার ডিএনএ-র মধ্যেই সম্ভবত রয়েছে প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের অঙ্কুর। আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে মানুষের সভ্যতা, অনেক মানুষই চ্যাটজিপিটি-র মতো চ্যাটবটগুলিকে ‘বন্ধু’ হিসাবে বিবেচনা করছে, গড়ে তুলছে যন্ত্রের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক। ফলে প্যারাসোশ্যাল প্রবণতাগুলি যেন পৌঁছচ্ছে এক নতুন মাত্রায়, যার হিসাব ছিল না ৭০ বছর আগে। এ যেন স্পাইক জোঞ্জ পরিচালিত ২০১৩-র হলিউড ছবি হার-এর বাস্তব প্রতিরূপ, যেখানে সামান্থা নামের এক মহিলা-কণ্ঠের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন অপারেটিং সিস্টেমের প্রেমে পড়ে জোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত চরিত্র থিয়ডর। ছবিতে সামান্থার কণ্ঠ দিয়েছিলেন স্কারলেট জোহানসন।
আজকের দিনে কতটা ব্যাপ্ত এই প্যারাসোশ্যাল গোলকধাঁধা? আমেরিকার ক্ষেত্রে একটা হিসাব চোখে পড়ল— যদিও মাত্র ১৬% আমেরিকান নিজমুখে স্বীকার করেন, বাস্তবে নাকি কোনও না কোনও প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক রয়েছে ৫১% আমেরিকান মানুুষের। ২০০২-এ মনোবিজ্ঞানী লিন ম্যাককাচেন তৈরি করেছেন ‘সেলেব্রিটি অ্যাটিটিউড স্কেল’— প্রিয় তারকার প্রতি মুগ্ধতার পরিমাপের জন্য। সেলেব্রিটি-পূজার মোটামুটি তিনটি স্তর, যার প্রথমটি হল এন্টারটেনমেন্ট-সোশ্যাল, যা প্রযোজ্য ‘অধিকাংশ’ মানুষের ক্ষেত্রে। এই ভক্তরা প্রশংসা করেন তাঁদের প্রিয় সেলেব্রিটির দক্ষতার, এবং পছন্দ করেন অন্যদের সঙ্গে সেই আবেগ ভাগ করে নিতে। পরবর্তী স্তরটি হল ইনটেন্স-পার্সোনাল, যা ঘটে মানুষ তাদের প্রিয় সেলেব্রিটির মূল্যবোধকে আত্মস্থ করতে শুরু করলে এবং আন্তরিক ভাবে তাঁদের ‘আত্মার সঙ্গী’ বলে মনে করলে। এটা অবশ্য খুব অল্প সংখ্যক মানুষের কথা। এর চূড়ান্ত স্তরটি হল বর্ডারলাইন-প্যাথোলজিক্যাল, যারা প্রিয় সেলেব্রিটির জন্য করতে পারে যে কোনও কিছু, এমনকি অবৈধ কার্যকলাপও। প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কে থাকা প্রায় ৩-৫% মানুষ পড়ে সেলেব্রিটি পূজার এই বিভাগে। সেলেব্রিটি অ্যাটিটিউড স্কেলে স্কোর সাধারণত বৃদ্ধি পায় কৈশোরের আগে, কৈশোরে আর প্রাথমিক যৌবনকালে। তার পর প্রাপ্তবয়স্ক জীবন জুড়ে তা থাকে মোটামুটি স্থিতিশীল, অথবা তা হ্রাস পায় সামান্য। টাইম ম্যাগাজ়িন-এর ২০২৩-এর এক প্রতিবেদন অনুসারে, সম্প্রতি সামগ্রিক ভাবে সামান্য বাড়তে শুরু করেছে এই স্কোর, অর্থাৎ মানুষের মধ্যে বাড়ছে এক অস্বাস্থ্যকর আসক্তি।
তা হলে কি ভবিষ্যৎ এই প্যারাসোশ্যাল দুনিয়ার? ফিরে আসা যাক রব রেনারের মিজ়ারি-র শেষ পর্বে। গল্প শুরুর আঠারো মাস পরের সময়কাল সেটা। মুক্ত পল শেলডন তখন হাঁটেন লাঠির সাহায্যে। নিউ ইয়র্ক সিটির এক রেস্তরাঁয় সাহিত্য এজেন্টের সঙ্গে মিটিং চলছে তাঁর। এক জন ওয়েট্রেস এগিয়ে আসেন তাঁর দিকে, এবং মুহূর্তের জন্য পলের বিভ্রম হয়— এই নারীই বোধ হয় অ্যানি উইলকস। এর পর মেয়েটি বলেন যে, তিনি শেলডনের ‘এক নম্বর ভক্ত’। জবাবে শেলডন বিনীত ভাবে বলেন, ‘তোমার কথাটা ভারী মিষ্টি’। বেচারা পল শেলডন! আর আমরাও যেন ঘুরপাক খেতে থাকি এক প্যারাসোশ্যাল দুনিয়ার গোলকধাঁধায়।
রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে