ইদানীং থেকে থেকেই অপুর সংসার ছবির একটা দৃশ্য খুব মনে পড়ছে। অপুর কাছে তাগাদা করতে এসে বাড়িওয়ালা বলছেন, “আপনাকে কয়েকটা সিধেপ্রশ্ন করছি, আপনি সিধে উত্তর দিন।” তার পর ‘সিধে কথা’ বলে চলে গেলেন যে, তিনি আর ভাড়া বাকি রাখতে নারাজ। এ বার ভোটের বাজারে এই ‘সিধে কথা’র ব্যাপারটা খুব চলছে। সবাই সিধে কথা বলছেন। কোনও আড়াল-আবডাল আর দরকার হচ্ছে না। শুধুই স্ট্রেট টক।
নির্বাচন কমিশনের কথাই ধরা যাক না কেন। খাতায়কলমে তারা তো সাংবিধানিক সংস্থা। সে দিক থেকে কোনও রাজনৈতিক দলেরই শত্রু বা বন্ধু তাদের হওয়ার কথা নয়। এমনকি এখনও নথিতে পদ্মছাপ পাওয়া গেলে, তারা জিভ কেটে বলে, ‘মিসটেক মিসটেক’। অথচ সেই তারাই একটি দলকে একেবারে নাম করে শাসানি দিচ্ছে— ‘আল্টিমেটাম’, ‘স্ট্রেট টক’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করছে। এটা তাদের আচরণবিধির মধ্যে পড়ে কি? কমিশনের সিধে কথা, এ বারের ভোটে কোনও রকম বেগড়বাই তারা বরদাস্ত করবে না। ভোট হবে ভয়মুক্ত, হিংসামুক্ত, হুমকিমুক্ত ইত্যাদি।
ভয়মুক্ত-হিংসামুক্ত-হুমকিমুক্ত ভোট কে না চায়? কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে ভীতিপ্রদ যদি কেউ হয়ে থাকে, সেটি নির্বাচন কমিশন-ই। বাঙালির অস্তিত্বের শিকড় ধরে টান মারা এমন আতঙ্ক, অসম্মান আর অনিশ্চিতির ভোট কখনও আসেনি বুঝি আগে। সিধে কথার কারবারিরা সেই আতঙ্কের ধুনি আরও কী কী ভাবে জ্বালিয়ে রাখা যায়, তার জন্য তৎপরতার কসুর করছেন না। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে বলে যাচ্ছেন, এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের দেশ থেকে বার করে দেওয়া হবে। একেবারে চাঁছাছোলা সিধে কথা। আগে তাও একটু ঘুরিয়ে বলতেন, অনু্প্রবেশকারীরা তো উইপোকা। উইপোকা তাড়ানো হবে। কী কী প্রকারে কোন কোন ধাপে তাড়ানো হবে, তার একটা ক্রোনোলজি-ও সমঝে দিয়েছিলেন। তার পর সম্ভবত শাসককুলের মনে হল, অত বাজি-বাজনার দরকার কী? এসআইআর-এর মতো একটা আপাতনিরীহ কর্মকাণ্ডকে হাতিয়ার করলেই তো হয়!
কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। কিন্তু জলে নেমে দেখা গেল, কাজটা অত সহজ নয়। শুধু ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নাম বাদ দিলেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। ‘দেড় কোটি রোহিঙ্গা’র বেলুন ফোলানো হয়ে গিয়েছে। তার ধারেকাছে অন্তত পৌঁছনো চাই। অতএব আসুক ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’, যেটা সুপ্রিম কোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী এক ‘উদ্ভট ছাঁকনি’। সেই ছাঁকনি চড়েই বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়ার শখ। প্রধানমন্ত্রী বলছেন ‘চুন চুনকে’ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও সূচিমুখ, কারণ তাঁর মতে ‘চুন চুনকে’ উইপোকা বার করার কাজটা এসআইআর-ই করে দিয়েছে। অতএব তিনি রাখঢাক না করে বলছেন, যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের দেশ থেকে বার করে দেওয়া হবে। এই বার করে দেওয়ার ব্যাপারটাও ইদানীং খুব সোজাসাপটা। পে-লোডারে তুলে ও-পারে নিয়ে গিয়ে ফেললেই হল— যেন ধাপার মাঠে জঞ্জাল ফেলা। রাষ্ট্রের বহু করাল মুখের মধ্যে এই মুখটিও দেখতে বাকি নেই আমাদের।
সিধে কথার আরও গেরামভারি নমুনা চাই? সুবক্তা-সুলেখক বলে পরিচিত এক জন এই পোড়া বাংলায় প্রার্থী হয়েছেন এই বার। তাঁকে বলতে শোনা গেল, বাংলাকে আবার ভারতের মধ্যে নতুন করে অঙ্গীভূত করা দরকার। ‘রি-ইন্টিগ্রেট’ করতে হবে। মানে কী কথাটার? কোন ভারত? কে সেখানে কাকে ঢোকাবে? কে-ই বা সাব্যস্ত করে নিল যে, বাংলা ছিটকে মানচিত্রের বাইরে চলে গিয়েছে? গোবলয়ের জো-হুজুরি এখনও পুরোপুরি করে না বাংলা, এইটেই সমস্যা? গোবলয়কে মূলধারা বলে মান্য করে বাংলাকে তার সঙ্গে জুড়তে হবে— এটাই প্রকল্প?
ওঁরা আলবাত হাঁ হাঁ করে বলবেন, এ তো অর্থনীতির কথা হচ্ছে! তা বেশ। কেন্দ্রে ওঁরা অনেক বছর আছেন। বাংলার অর্থনীতির প্রতি এত দরদের ছাপ কাজে খুব একটা পড়তে দেখিনি। ২০১৪ সালের ভোটপ্রচারে এসে হবু প্রধানমন্ত্রী বলে গিয়েছিলেন, কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে বাংলার দু’হাতই নাকি লাড্ডুতে ভরে যাবে। সে আশ্বাস পূরণ হয়েছে কি? যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ডাবল ইঞ্জিন সরকার উন্নয়নের পূর্বশর্ত হওয়ার কথা নয় কিন্তু। গত বছর বিহারে ভোট ছিল। বাজেটে ঝুলি উপুড় করে দেওয়া হয়েছিল। এ বছর তেমন কিছু চোখে পড়েনি বাংলার জন্য। কেন্দ্রের শাসকেরা বোধ হয় ধরেই নিয়েছেন, ঘুসপেটিয়া-মুক্ত বাংলা উপহার দেওয়াটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ। শুধু তার জন্যই বাঙালি তাঁদের সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করবে।
কিছু বছর আগে হলেও বুক ঠুকে বলা যেত, বাঙালি আর যা-ই করুক, এই ভুলটা করবে না। সে ভরসা আজকাল আগের মতো মজবুত নেই। বাংলা কেন গুজরাত হল না আর কলকাতা কেন বেঙ্গালুরু হল না, এই চমকপ্রদ আক্ষেপ এখন শহুরে বাঙালির বড় অংশের অন্যতম বীজমন্ত্র হয়েছে। শিল্পের অভাব বা কর্মসংস্থানের সমস্যা অবশ্যই খুব বড় সমস্যা। কিন্তু তার জন্য যদি বাঙালি তার অহংকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে রাজি থাকে, সেটাকে ব্যাধি বলেই মানতে হবে। অহংয়ের প্রশ্ন এখানে উঠছে কিসে? উত্তরটা সহজ। এ দেশে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে। সেখানে ভোটের প্রচারে গিয়ে কেউ কি বলতে পারবেন যে, উত্তরপ্রদেশ-বিহারকে ভারতের মধ্যে নতুন করে ঢুকিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন আছে? সবচেয়ে বেশি মানুষ ভিনদেশে যান কেরল আর পঞ্জাব থেকে। তার জন্য মালয়ালি বা পঞ্জাবিদের আত্মধিক্কারে নিমজ্জিত হতে দেখা যায়? বিদেশে সাদা কলারের চাকরিতে ভারতের কোন রাজ্যের মানুষ সবচেয়ে বেশি? তামিলনাড়ু এবং কর্নাটক। ওই দুই রাজ্যে কি কর্মসংস্থানের ভয়ানক ঘাটতি আছে? না কি ওই দুই রাজ্যের মানুষ বাইরে যেতে হচ্ছে বলে হায় হায় করেন?
বাঙালির মধ্যে তথাকথিত ভদ্রসমাজের সমস্যাটা শুধুমাত্র শিল্প বা কর্মসংস্থানের নয় আসলে। কারণ এর কোনওটাই খুব নতুন, খুব হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সমস্যা নয়। যেটা বরং নতুন ঠেকে, সেটা আত্মপরিচয়ের সঙ্কট। শত অনটনেও দীর্ঘ দিন অবধি বাঙালির কাছে উৎকর্ষের একটা মর্যাদা ছিল, মধ্যবিত্ত পাড়ায় পয়সাওয়ালা লোকের চেয়ে বিদ্বান মানুষের সামাজিক মর্যাদা বেশি ছিল। এই স্বভাবটি গতাসু হল কী করে? ‘হতে পারি দীন তবু নহি মোরা হীন’-এর তেজটা গেল কোথায়? যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাঙালির অন্যতম অভিজ্ঞান, ভাষা আর সংস্কৃতির প্রতি তার যে অহমিকা, সেটা এতখানি ভগ্নপ্রায় হল কী করে? আত্মপরিচয়ের শিকড় উত্তরোত্তর আলগা হচ্ছে বলেই কিন্তু আজ ‘দেড় কোটি রোহিঙ্গা’র গল্প সোনামুখ করে হজম করতে বাঙালির অনেক দূর অবধি অসুবিধা হয়নি। একের পর এক রাজ্যে বাঙালিরা মার খাচ্ছেন, প্রাণ দিচ্ছেন, পুশব্যাকের শিকার হচ্ছেন দেখেও নাগরিক সমাজকে সে ভাবে ক্রুদ্ধ হতে দেখা যায়নি। এসআইআর-জনিত চাপে যাঁদের মৃত্যু হল, কোন গণতন্ত্রের শহিদ তাঁরা? এই প্রশ্ন বহু ক্ষণ পর্যন্ত বাংলার আকাশ বিদীর্ণ করে দেয়নি। আতঙ্ক আর উদ্বেগ সর্বত্রগামী হওয়ার পরে কিছুটা টনক নড়ল।
আতঙ্ক আর উদ্বেগ। এসআইআর-কে কেন্দ্র করে অস্তিত্বের মূলে টান পড়ার পরে বাঙালি খানিকটা নড়ে বসেছে। কিন্তু এসআইআর-এ দুর্গত হোন বা না হোন, যে ভাবে এই পুরো কর্মকাণ্ডটি চালিত হল, তাতে সার্বিক ভাবে বাঙালির আঁতে আঘাত লাগার কথা ছিল সর্বাগ্রে। দেশের কোণে কোণে বাংলাভাষীকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার হিড়িক সমগ্র বাঙালির অবমাননা বলে চিহ্নিত হওয়ার কথা ছিল।
দেরি অবশ্যই হয়ে গিয়েছে অনেক। তবে হাত থেকে সব তির বেরিয়ে যায়নি। ভোট একটা সুযোগ। সিধে কথার সিধে উত্তর দেওয়ার সুযোগ। যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান— এটাই সেই উত্তর।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে