যুযুধান: জমির অধিকার নিয়ে মুখোমুখি সশস্ত্র দুই গোষ্ঠীর মানুষ, পশ্চিম কার্বি আংলং, অসম, ২৩ ডিসেম্বর। ছবি: পিটিআই।
অসম রাজ্যে এখন ‘বহিরাগত’দের বিরুদ্ধে ‘স্থানীয়’দের বিদ্বেষ, ক্রোধ, হিংসা ও হিংস্রতা প্রবহমান। এ বারের পটভূমি মধ্য অসমের পশ্চিম কার্বি আংলং জেলার খেরোনি নামের এক অজ্ঞাত ও অশ্রুত জনবসতি। এখানেই রয়েছে প্রফেশনাল গ্রেজিং রিজ়ার্ভ (পিজিআর) ও ভিলেজ গ্রেজিং রিজ়ার্ভ (ভিজিআর)। সহজ করে বললে, দুটোই সংরক্ষিত তৃণভূমি যেখানে গরু, ছাগল, মোষ ও অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী বিনা বাধায় চরতে পারে, খেতে পারে। পাহাড়ি কিংবা সমতলবাসী কেউ-ই এ সব সংরক্ষিত এলাকায় ঘরবাড়ি তৈরি করতে পারেন না। সংবিধানের ২৪৪(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক অসমে ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে তিনটি ট্রাইবাল এলাকা রয়েছে। সেই অনুসারে বড়োটেরিটোরিয়াল কাউন্সিল, ডিমা হাসাও অটোনমাস কাউন্সিল ও কার্বি আংলং অটোনমাস কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। সংবিধান ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় এলাকাগুলিতে বসবাসরত ট্রাইবালদের স্থানীয় স্তরে স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি নানাবিধ রক্ষাকবচের সংস্থান করে দিয়েছে। তার মধ্যে উল্লিখিত সংরক্ষিত তৃণভূমিও রয়েছে।
পশ্চিম কার্বি আংলঙের জাতি-বিরোধী হিংসার উৎপত্তিস্থল সেই পিজিআর ও ভিজিআর। স্থানীয় কার্বি সংগঠনগুলির অভিযোগ, এক বিশাল সংখ্যায় বিহারিরা নাকি ওই সব সংরক্ষিত তৃণাঞ্চলে রীতিমতো ইট-কাঠ-কংক্রিটের বাড়িঘর বানিয়ে বিনা বাধায় বসবাস করছেন। তাই সরকারের কাছে তাদের দাবি হচ্ছে, অবিলম্বে এই ‘অনুপ্রবেশকারী’দের সংরক্ষিত তৃণভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। অসমে ‘আদি বাসিন্দা’দের এমন দাবি এখন সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেন। বিশেষত সরকারি জমির বাসিন্দারা যদি অভিবাসী বাংলা-ভাষী মুসলমান হন, তা হলে তো আর কথাই নেই। নির্বিচারে চলবে বুলডোজ়ার। ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে শুনতে হবে ‘বাংলাদেশি’ গালাগাল। গণদেবতা যখন সঙ্গেই আছেন, তখন আইন, আদালত, সহমর্মিতা ও মানবিকতার তোয়াক্কা কে করে।
রাজ্যে কয়েক পুরুষ ধরে আছেন যে অভিবাসীরা তাঁদের তাচ্ছিল্য করে বলা হয় ‘মিয়া’। এ নিয়ে ডান-বাম-মধ্য রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ লোকজন, কারও কোনও সমস্যা নেই। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে এটাই যে, যাঁরা প্রতিনিয়ত সামাজিক ও সরকারি অপমান ও নিগ্রহের শিকার হয়ে আসছেন সেই অভিবাসী মুসলমানদেরও বিষয়টি এখন গা-সহা হয়ে গেছে। কিন্তু এ বার তো ‘বেআইনি জমি দখলকারীরা’ মুসলমান নন, মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় ‘অচিনাকি’ (অপরিচিত)-ও নন। এঁরা মূলত বিহারি এবং এঁদের স্লোগান তো ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘ভারতমাতা কি জয়’। এঁরা কী ভাবে শাসকদের কাছে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘অপরিচিত’ হবেন! কার্বি আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির এক নেতা তো সংবাদমাধ্যমের সামনে খোলাখুলি বলেই দিয়েছেন যে, বিজেপির প্রকট ও প্রচ্ছন্ন সমর্থনে বলীয়ান হয়েই বিহারি জবরদখলকারীরা চিৎকার করে ‘কার্বি গো ব্যাক’ বলার মতো দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে। তিওয়া (রাজ্যের একটি আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠী) সংগঠনগুলির প্রতিবাদী সমাবেশ থেকেও একই আওয়াজ উঠে এসেছে। গুয়াহাটিতে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রদত্ত বিবৃতিতে ‘আদি বাসিন্দা’দের সংগঠন বলেছে যে, রাজ্যের সংরক্ষিত এলাকায় ‘ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকজনদের উপস্থিতি কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না’।
এত দিন শত্রু ছিল বাঙালিরা, বিশেষত বাঙালি মুসলমানেরা যাঁদের সহজেই ‘বাংলাদেশি’ বলে দেগে দিয়ে ভিটেছাড়া করা যায়। কিন্তু এ বার সরাসরি ‘ভারতীয় বংশোদ্ভূত’-মাত্রেই অসমে জাতি বৈরিতার প্রশ্নে ‘অপর’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এর পিছনে রয়ে গেছে এক ঘটনা। ২০২৪-এর জানুয়ারিতে পশ্চিম কার্বি আংলং জেলার বিহারি সংগঠন ‘রচনাত্মক নোনিয়া সংযুক্ত সঙ্ঘ’ রাষ্ট্রপতির কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়। দ্রৌপদী মুর্মু তখন ছিলেন শিলঙে। তাঁর কাছে দাবি জানানো হয় ২০১১ থেকে পিজিআর ও ভিজিআরে বসবাসরত বিহারি পরিবারগুলিকে জমিতে চিরস্থায়ী মালিকানার অধিকার দিতে হবে। এতেই আঁতে ঘা পড়ে কার্বিদের। তাঁরা শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। পাছে না তাঁরা নিজভূমে পরবাসী হয়ে যান। ফলে ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতেই কার্বি আংলং স্বশাসিত পর্ষদ সংরক্ষিত তৃণভূমিতে বসবাসরত সবার হাতে উচ্ছেদের নোটিস ধরিয়ে দেয়। এই সরকারি ফরমানের বিরোধিতা করে গুয়াহাটি উচ্চ ন্যায়ালয়ে মামলা করেন তৃণভূমির একাংশের বাসিন্দারা। এঁরা মূলত বিহারি এবং কিছু সংখ্যক বাঙালি হিন্দু। আদালত স্বশাসিত পর্ষদের উচ্ছেদ নোটিসের উপর স্থগিতাদেশ জারি করে। এর ফলে উচ্ছেদের উদ্যোগ সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। এতে কার্বি সংগঠনগুলি রাজ্য সরকার এবং স্বশাসিত পর্ষদের উপর মারাত্মক খেপে যায়।
ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন কার্বি জাতীয়তাবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা জমির অধিকারের প্রশ্নে এবং ‘বহিরাগত’দের তাড়ানোর দাবিতে শুরু করেন আমরণ অনশন। পনেরো দিন পেরিয়ে গেলে, ডিসেম্বরের ২২ তারিখ গভীর রাতে, পুলিশ অনশনকারীদের নিয়ে চলে যায় গুয়াহাটিতে। এতে আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, তারা বাধ্য হয়েই অনশনকারীদের ধর্নাস্থল থেকে বার করে নিয়ে আসেন। কারণ সবারই শারীরিক অবস্থা বেশ জটিল ছিল। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনেই অনশন-ক্লিষ্টদের গুয়াহাটির হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু আন্দোলনকারীরা পুলিশের এই বয়ান বিশ্বাস করেননি। পরের দিন, অর্থাৎ ২৩ তারিখ, কার্বি বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে ওঠেন। খেরোনিতে বিহারি ও বাঙালিদের ঘরদোর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এতে সৌরভ দাস নামের বিশেষভাবে সক্ষম এক ব্যক্তি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। জতুগৃহে জীবন্ত পুড়ে মরেন। পুলিশের গুলিতে এক কার্বি বিক্ষোভকারীরও মৃত্যু হয়। পুলিশ ও বিক্ষোভকারী মিলিয়ে প্রায় দু’শো জন আহত হন। রাজ্য পুলিশের শীর্ষ অধিকর্তাও আঘাত পান।
এ বার উল্টো দিক থেকে দেখা যাক। অসমের জল-জঙ্গল-জমির পরিমাণ হচ্ছে ৭৮,৪৩৮ বর্গ কিলোমিটার। আর কার্বি আংলং জেলার আয়তন হল গিয়ে ১০,৪৩৪ বর্গ কিলোমিটার। অর্থাৎ, রাজ্যের ১৩ শতাংশেরও বেশি পড়েছে রাজ্যের বৃহত্তম জেলা কার্বি আংলঙে। জনঘনত্বের দিক থেকেও এই জেলা ভাল জায়গায় রয়েছে। রাজ্যে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বসবাস করেন ৩৯৮ জন। অথচ কার্বি আংলঙে সংখ্যাটা ৬৩। উত্তর কাছাড় পাহাড়ি জেলা, বর্তমানে ডিমা হাছাও জেলা, হচ্ছে জনঘনত্বের দিক থেকে রাজ্যের তালিকার একদম তলায় (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৪৪ জন)। তার ঠিক উপরেই অবস্থান কার্বি আংলঙের।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, জমির উপর জনসংখ্যার চাপ যেখানে মোটেই নেই, সেখানে জমি দখলের প্রশ্নে আমরা-ওরা বাইনারি এত হিংসাত্মক হয় কী ভাবে? জবাবটা হয়তো লুকিয়ে আছে এক অসমিয়া ভদ্রলোকের সমাজমাধ্যমের পোস্টে। অসম সাহিত্য সভার ভূতপূর্ব সভাপতি রংবং তেরঙের জনপ্রিয় উপন্যাস রংমিলির হাঁহি (রংমিলির হাসি)-র প্রসঙ্গ টেনে পোস্টে লেখা হয়েছে যে, আর্যাবর্তের বিজেপি-আশ্রিত হিন্দুত্বের বাড়বাড়ন্তই উত্তর-পূর্বের আদিম অধিবাসীদের জন্য আসল বিপদ। এমনিতেই নিয়মিত অভিযোগ উঠছে যে, উন্নয়নের নামে সর্দারদের হাতে প্রায় বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের জমি। জুবিন গর্গের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর গণআবেগ ও সরকার-বিরোধী উষ্মা গ্রাস করে অসমকে। মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারও জমি দখলের অভিযোগে সামাজিক ভর্ৎসনার সম্মুখীন হন।
এই সমস্ত অভিযোগ হয়তো সত্যি নয়। কিন্তু ‘রাজ্যের শাসক দলের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে কর্পোরেট মহাবলীরা অসমের জল-জঙ্গল-জমি দখল করে নিচ্ছে’ এই প্রচার অসমিয়া মধ্যবিত্তের এক বড় অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। রাজ্যে বসবাসরত হিন্দিভাষী ও বাঙালি হিন্দুরা প্রস্তর যুগ থেকেই আরএসএস-বিজেপির অন্ধ সমর্থক। বাঙালি মুসলমানেরা তো বৈচিত্রের অসমে দুয়োরানি ছিলেনই, এ বার পশ্চিম কার্বি আংলঙের সহিংসতার পর দেখা যাচ্ছে মূল ভারতের সবাই রাজ্যের ‘আদি বাসিন্দা’দের চোখের বালি হয়ে গেলেন। তবে কি অসমে রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাওয়ার অস্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা দিচ্ছে? ‘তোমাকে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’।
অর্থনীতি বিভাগ। কাছাড় কলেজ, শিলচর
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে