মঞ্চশিল্পী: ডাকঘর-এর অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথের বিশাল ছায়ার সামনে দাঁড়ালে, বাংলা থিয়েটারের এক দীন কারিগর হিসেবে আমি এক জটিল ধাঁধার সামনে অসহায় বোধ করি। মনে হয়, আমাদের আধুনিক বাংলা থিয়েটারের ছড়ানো মানচিত্রে নাটককার রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা যেন এখনও এক আগন্তুকের! যেন বঙ্গরঙ্গমঞ্চের উষ্ণ নৈকট্যের আরাম এখনও পেলেন না কবি।
মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথ শুধু নাটককার ছিলেন না, ছিলেন প্রযোজক-নির্দেশক-অভিনেতা। ১৮৭৬-এ অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের এমন কর্ম আর করব না শীর্ষক প্রহসনে প্রধান চরিত্রে অভিনয় ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ছাদে প্যান্ডেল বেঁধে বাল্মীকি-প্রতিভা গীতিনাট্যের প্রযোজনার পর সারা জীবন নিয়োজিত ছিলেন থিয়েটারে। শেষ প্রযোজনা করছেন ১৯৪০-এর ৭ অগস্ট। অক্সফোর্ড থেকে প্রতিনিধিদলের শান্তিনিকেতনে আসা উপলক্ষে আয়োজিত হয় শাপমোচন-এর বিশেষ অভিনয়। অসুস্থ শরীরেও কবি নিজে এর নবনির্মাণ তত্ত্বাবধান করেন। ৬৪ বছরব্যাপী এই নাট্যজীবনে রবীন্দ্রনাথ ছোট-বড় মিলিয়ে নাটকই লিখেছেন ৪০-এর বেশি। মনে রাখতে হবে, শেক্সপিয়র ও ব্রেখট-এর নাটকসংখ্যাও ৪০-এরই মতো।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রবীন্দ্রনাথের নাট্যজীবনের বিস্তার ঘটেছে, আবার তখনই গড়ে উঠেছে বাঙালির সাধারণ রঙ্গালয়ের স্বর্ণযুগ। ১৮৭২-এ নীলদর্পণ দিয়ে পেশাদারি থিয়েটারের সূত্রপাত, তার পশ্চাৎপটে মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রথাভাঙা নাটকগুলির ঐতিহ্য। প্রায় একশো বছরের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আর এক দত্তকুলোদ্ভব নাট্যপ্রতিভা উৎপল দত্তের প্রযোজনায় নজর কেড়েছিল এই দুই নাটিকার মঞ্চায়ন। মাইকেলের পরে দীনবন্ধু গিরিশচন্দ্র দ্বিজেন্দ্রলাল অমৃতলাল ক্ষীরোদপ্রসাদ অপরেশচন্দ্র প্রমুখ অনেক শক্তিশালী নাটককার, এবং গিরিশচন্দ্র অমরেন্দ্রনাথ শিশিরকুমার-সহ বহু প্রতিভাবান প্রয়োগাচার্যের নেতৃত্বে ঝলমল করে ওঠে সাধারণ রঙ্গালয়। এর পরেও যোগেশ চৌধুরী মন্মথ রায় শচীন্দ্র সেনগুপ্তের মতো নাটককারের রচনায় আর নরেশ মিত্র অহীন্দ্র চৌধুরী নির্মলেন্দু লাহিড়ির মতো নট-নির্দেশকের নৈপুণ্যে অব্যাহত ছিল এই ধারা। চল্লিশের দশকে গণনাট্য সঙ্ঘের আবির্ভাব, কিন্তু সে এক ভিন্ন উপাখ্যান।
এরই সমান্তরালে একই সময়পর্বে নাটককার-অভিনেতা-প্রযোজক রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলছিলেন তাঁর নিজস্ব নাট্যিক পরিচয়। এ কথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ অবলম্বনে সেই সময় বাংলা মঞ্চের বহু জনপ্রিয় প্রযোজনা গড়ে ওঠে। এ-ও ঠিক যে চিরকুমার সভা বা শেষরক্ষা-র মতো কমেডি বার বার ফিরে এসেছে সেই থিয়েটারে। কিন্তু এ-ও ঠিক, রবীন্দ্রনাথ নিজে এই সাধারণ রঙ্গালয়ের ঝলমলে শোভাযাত্রার থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রিয় শিশিরের আমন্ত্রণে প্রবল জনপ্রিয়তায় ভূষিত সীতা দেখতে গিয়ে প্রযোজনা-নৈপুণ্যের প্রশংসা করেছেন, শিশিরকুমারকে এ দেশের প্রথম ‘প্রয়োগাচার্য’-র স্বীকৃতি দিয়েছেন, কিন্তু নাটকটি বিষয়ে তাঁর অপছন্দের কথাও গোপন রাখেননি। মনে রাখতে হবে, ১৯২৪-এর প্রযোজনা সীতা-কে বাংলা থিয়েটারে পালাবদলের মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। গিরিশ-যুগের অবসানে শিশিরকুমারের নেতৃত্বে সাধারণ রঙ্গালয়ের পর্বান্তরের সূচক হয়ে আছে এই প্রযোজনা। কিন্তু থিয়েটার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বোধ ও ধারণার বিপ্রতীপে কোথাও অবস্থান ছিল তাঁর সময়ের সাধারণ রঙ্গালয়ের।
কোন থিয়েটারের খোঁজে তা হলে রবীন্দ্রনাথ গড়ে নিচ্ছিলেন তাঁর নিজস্ব যাত্রাপথ— সে আলোচনায় ঢোকার আগে জরিপ করে নেওয়া দরকার রবীন্দ্র-রচিত নাটকের ভুবনটি। আমাদের মতো থিয়েটারের ছাত্রদের এখানে এক বড় অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্রনাথ রচিত নাটকগুলির মানচিত্রের বিস্তার ও জটিলতা বিষয়ে এক অসম্পূর্ণ ধারণা। মনে হয় যেন ডাকঘর, মুক্তধারা, অচলায়তন, রাজা এবং অবশ্যই রক্তকরবী, এই সব সঙ্কেতনাট্যের সঙ্গে অঙ্গীকৃত হয়ে আছে নাটককার রবীন্দ্রনাথের স্বরূপ। যেন এই সব নাটকের মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারলেই সারা হয়ে যাবে নাটককার রবীন্দ্রনাথকে বুঝে ওঠার কাজ। অথচ নাটককার রবীন্দ্রনাথ তো এর বাইরেও বহু ধরনের নাটক লিখেছেন, অভিনয় ও প্রযোজনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ কত বিশাল ও ব্যাপক এ কথা আমরা বার বার বলি। কিন্তু তিনি যে কত বিচিত্র ও জটিল সেটা ভুলে যাই।
‘হাস্যকৌতুক’-‘ব্যঙ্গকৌতুক’-এর অন্তর্গত নাট্যগুচ্ছকে রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন ‘শারাড’ বা ‘হেঁয়ালিনাট্য’। মূলত শান্তিনিকেতনে ছাত্রদের ছুটির সময়ে অভিনয়ের জন্য লেখা এই নাটিকাগুলি রঙ্গে-ব্যঙ্গে-কৌতুকে-প্রহসনে দ্যুতিময় হীরকখণ্ডের মতে আজও অম্লান। খ্যাতির বিড়ম্বনা, রোগীর বন্ধু বা বিনিপয়সার ভোজ-এর মতো কমিক-স্কেচ ক’টাই বা লেখা হয়েছে আজও! এখান থেকে পূর্ণাঙ্গ কমেডিতে চলে যাওয়া ছিল পরবর্তী পদক্ষেপের মতোই অবধারিত। বৈকুণ্ঠের খাতা, মুক্তির উপায়, গোড়ায় গলদ, শেষরক্ষা থেকে চিরকুমার সভা পর্যন্ত এই সব রচনায় যেন ইউরোপীয় ধাঁচের ‘কমেডি অব ম্যানার্স’ বা রোম্যান্টিক কমেডির এক অনবদ্য মিশ্রণ।
এরই সমান্তরাল ভাবে তাঁর নিজস্ব কবি-স্বভাব রবীন্দ্রনাথকে প্রণোদিত রেখেছিল কাব্যনাটক-চর্চায়। ‘কবিকাহিনী’ ‘ভগ্নহৃদয়’ ‘রুদ্রচণ্ড’ ‘প্রকৃতির অভিশাপ’ ‘ঋণ শোধ’ প্রমুখ প্রাথমিক রচনা থেকে পৌঁছে যান বিসর্জন, রাজা ও রানী, মালিনী-র মতো পরিণত সৃষ্টিতে। গদ্য ও কবিতার সহাবস্থানে এরাও প্রথা ভাঙার সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অন্যতর অবস্থানে। আবার এদের থেকে আলাদা ‘গান্ধারীর আবেদন’ ‘বিদায় অভিশাপ’ বা ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’ আবেগের ঘনত্ব ও বিষাদকে কবিতায় ধরে রাখে বিরল দক্ষতায়। এখনও পর্যন্ত শুধু পাঠেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে এরা, মঞ্চের সামগ্রিক বিন্যাসে নয়।
এই সব ধরনের বাইরে আর এক রকম থিয়েটারের ঐতিহ্য সৃষ্টি করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ যার কোনও উত্তরসূরি নেই, পূর্বসূরিও নেই। অভিনয়-গান-নাচের ত্রিবেণিসঙ্গমে গড়ে ওঠা এই দেশজ অপেরাগুলির প্রযোজনার কোনও সম্পন্ন শৈলী আজও গড়ে তুলতে পারেনি আমাদের থিয়েটার। মায়ার খেলা, শাপমোচন থেকে শ্যামা, চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা পর্যন্ত এই সব রচনায় সংলাপ শুধুই গানে। কালমৃগয়া বা তাসের দেশ-ও এই গোত্রের মধ্যেই পড়বে, তবে সেখানে সংলাপে গান ও গদ্য দুই-ই আছে। মঞ্জুশ্রী ও রঞ্জাবতী চাকি সরকার-এর যৌথসৃজনে ‘তোমারই মাটির কন্যা’ বা কারাবন্দিদের নিয়ে তৈরি করা অলকানন্দা রায়ের বাল্মীকি প্রতিভা-য় দু’-এক বারই মাত্র ঝলসে উঠেছে সম্ভাবনা। শারদোৎসব, ফাল্গুনী, বসন্ত— এরা কি শুধুই প্রকৃতি-বন্দনা, নাকি প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের রসায়নও খুঁজতে চায় এরা! এখনও বলা হয়নি গুরু, অচলায়তন-এর কথা। জানি না কোন শ্রেণিতে রাখব তপতী বা মুকুট-কে। বাঁশরি-র মতো বিচিত্র গদ্যনাটক বা লক্ষ্মীর পরীক্ষা-র মতো দুর্দান্ত কাব্যশারাডেরই বা গোত্রসন্ধান করে কে?
১৯৪৪-এ গণনাট্য সঙ্ঘের প্রযোজনা নবান্ন-র অভিনয়কে যদি আধুনিক বাংলা থিয়েটারের সূচনা হিসেবে ধরি, তবে মনে রাখতে হবে কয়েক বছরের মধ্যেই এর দুই মূল স্রষ্টা শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্য সঙ্ঘের আওতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে গড়ে নেন স্বতন্ত্র নাট্যদল। এঁদের মধ্যে শম্ভু মিত্র ও তাঁর দল ‘বহুরূপী’ ১৯৫২-৫৩ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত— এই ১২ বছরের মধ্যে চার অধ্যায় রক্তকরবী ডাকঘর বিসর্জন মুক্তধারা ও রাজা প্রযোজনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাট্য প্রযোজনার এক উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট ধারার প্রবর্তন করলেন। এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের নাটকের মঞ্চায়নের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনার হদিস পেল বাংলা থিয়েটার। দুঃখের কথা, বহুরূপীর পরবর্তী নাট্যচর্চায় এই ঐতিহ্যের সম্প্রসারণ আর দেখা গেল না।
পরবর্তী পঞ্চাশ-ষাট বছরে রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চায়নের অপ্রতুলতা প্রমাণ করে নাটককার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের থিয়েটারের অন্তর্নিহিত অস্বস্তি। এলটিজি-উৎপল দত্তর তপতী বা রূপকার সবিতাব্রত দত্তর অচলায়তন-এর বিক্ষিপ্ত সাফল্য ছাড়া গ্রুপ থিয়েটারের নির্দেশকরা নাটককার রবীন্দ্রনাথে আগ্রহ দেখাননি। ডাকঘর-এর দু’টি ব্যতিক্রমী প্রযোজনার কথা খুব মনে পড়ে। ‘ব্লাইন্ড অপেরা’-শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের সৃজনে দৃষ্টিহীনদের অভিনয়ে রাজা নাটক অন্তর ভেদ করে যেন বেরিয়ে আসে অন্ধকারের ও দৃষ্টিহীনতার গভীরতর তাৎপর্য। ‘রঙ্গকর্মী’-ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়ের হিন্দি চণ্ডালিকা বা ‘তৃতীয় সূত্র’-সুমন মুখোপাধ্যায়ের রক্তকরবী মনে করিয়ে দেয় গত শতকে ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-বিভাস চক্রবর্তীর রীতি-ভাঙা প্রযোজনা বিসর্জন-এর কথা। তবে এই সব বিক্ষিপ্ত ঢেউ কিন্তু কোনও ধারার জন্ম দেয় না।
নাটককার-নাট্যপ্রযোজক রবীন্দ্রনাথের দিকে ফিরে তাকালে হয়তো এই সমস্যার একটা উত্তরের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইউরোপীয় মডেল ছেড়ে কাব্যনাটক-গীতিনাট্য-সঙ্কেতনাট্যের দিকে চলে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। মঞ্চের ঘেরাটোপের বাইরে অন্য কোনও ধরনের খোঁজ তাঁকে ভিন্ন পথের পথিক করেছে। তবে কি ঔপনিবেশিক মডেলের বাইরে ভারতীয় থিয়েটারের স্বরূপ-সন্ধানের কোনও তাগিদ জন্ম নিয়েছিল তাঁর মধ্যে? এ বিষয়ে, তাঁর ভাবনার প্রকাশ্য বয়ান আমরা পাই না। নীতিনাট্য বা সঙ্কেতনাট্যগুলির প্রযোজনা-পরিবেশনায় যেন রবীন্দ্রনাথ খুঁজছেন অন্য মঞ্চশৈলী। পরের যুগে শম্ভু মিত্রের চাঁদ বণিকের পালা বা হাবিব তনভীরের ‘নয়া থিয়েটার’-এর কাজে কি এরই অনুরণন?
গিরিশচন্দ্র থেকে উৎপল দত্ত বা তারও পরের যুগের শক্তিশালী প্রযোজককে দেখেছি বিদেশি প্রসেনিয়াম থিয়েটারের চৌহদ্দির মধ্যেই গড়ে তুলেছেন তাঁদের নাট্যগোষ্ঠীর ভুবন। বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার গণ্ডি ভাঙার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেখানেও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বিশেষ কোনও অবহিতি নেই। বরং বহু বিদেশি নাটককারকে বাংলা থিয়েটারে নিয়ে আসার জন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম দেখেছি। ফলে চেনা ধাঁচের বাইরে অন্য রকম থিয়েটার গড়ে তোলার যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের নাটক, তাকে আবিষ্কারের অভিযান সহজ নয়। রবীন্দ্রনাট্যচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলার দায় তো আজও কেউ নেয়নি। কে জানে, হয়তো আধুনিক বাংলা থিয়েটারের মূলধারার বাইরে আগন্তুকের ভূমিকাতেই থেকে যাবেন রবীন্দ্রনাথ!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে