রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর জীবনও মহার্ঘ
Raghu Rai

অন্তরঙ্গে ধরা ‘মানুষ’

এই অনামী মানুষরাই রঘু রাইয়ের নিজের। এই দেশ আর তার অনামী মানুষ। তাঁদের উপচানো শারীরিক ঘেঁষ আর তাঁদের নিজস্ব জীবন ও ভঙ্গিমার স্থিতি গতি থেকে কম্পোজ়িশন তৈরি হয়।

ঈপ্সিতা হালদার

শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ০৭:৫৪
Share:

খবরের সঙ্গে ছাপা হওয়া ফোটোগ্রাফ আমাদের কাছে সেই খবরের অংশ হিসেবে স্বতঃসিদ্ধ ছিল, যতক্ষণ না এক দিন আমরা ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সেই মর্মন্তুদ ছবি দেখলাম। এবড়োখেবড়ো মাটির স্তূপ থেকে কয়েক মাস বয়সের এক শিশুর খোলাচক্ষু শ্বাসরুদ্ধ হাঁ-মুখ হয়ে রয়েছে। সে অবশ্য ১৯৮৪-র বেশ কিছু পরে। কিন্তু এই ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে চারিয়ে যাওয়া অসহায় ভয় ও অবিমিশ্র করুণা একত্রে আমাদের কিশোর মন নাড়িয়ে টুকরো করে দিয়েছিল, সে শুধু ঘটনার তথ্যের জন্য নয়, সেটা এই ভাবে এই ছবির মধ্যে দিয়ে ঘটনাটিকে দেখতে পেয়ে, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। তখনই নামটা প্রথম জানতে পারি। রঘু রাই। আরও পরে, ইন্টারনেট এসে গেলে দেখতে পেয়েছি যে ওটি একমাত্র ছবি ছিল না, ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া-র লিক হওয়া গ্যাসে গণকবরে শোয়া মৃত শিশুদের একটি মুখ ছিল ওটি। এখন শিশুদের শত শত হাজার হাজার মৃত মুখ, বিক্ষত শরীর আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু আশি-নব্বইয়ের দশকে এই চিত্রের অভিঘাত ছিল ভিন্ন। তা আমাদের জাতির সংজ্ঞানে ও বিবেকে নাড়া দিয়েছিল।

কিন্তু আবারও। কতখানি দেখানো যেতে পারে মৃতের মুখ, শিশুর মৃত মুখ, নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা ও শোক নিয়ে কতখানি নৈর্ব্যক্তিক হতে পারেন এক জন চিত্রসাংবাদিক বা তথ্যচিত্রর্নিমাতা, কতখানি দেখানো বাস্তব তুলে ধরার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, আর কতটা পেরিয়ে গেলে মৃত্যু, শোক ও দারিদ্রের সম্ভ্রম ক্ষুণ্ণ করে তাকে সংবাদ নির্মাণ নামক ইন্ডাস্ট্রিতে পণ্য করে তোলে, এই এথিক্যাল দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে ভোপালের মৃত শিশুটির ভয়ানক টাইট ক্লোজ়-আপের দিকে ফিরে তাকাই। দেখি তার শিয়রে একটি বয়স্ক হাত। শিশুটির সারা শরীর মাটিতে ঢেকে দেওয়ার পরে এক মুহূর্ত স্থির। যেন শেষ বার— আর এক বার— শিশুটির মুখ দেখে নিতে চাওয়ার তীব্র শোকে আচ্ছন্ন ওই হাত, ওইটিই এই ছবিটির আত্মা। আর সেই মুহূর্তটিকে ধরেন বলেই তিনি রঘু রাই। সেখানে সংবাদ হয়েও সেই ছবি আদতে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই ডকুমেন্টারি সিরিজ় হয়ে দাঁড়ায় অতি অন্তরঙ্গে ধরা মানুষের বেদনার বয়ান। তারা জড়াজড়ি করে বসে থাকা পরিবারগুলি। ওই শারীরিক নৈকট্যের মিড ক্লোজ়-আপে মনে হয় রঘু রাই আমাদের নিয়ে গেছেন ওই মানুষগুলির যন্ত্রণা, বিশ্বাসভঙ্গের অসহায়তার খুব কাছাকাছি।

অবিভক্ত পঞ্জাবের মফস্‌সল শহর থেকে দেশভাগের পরে রাই পরিবার ভারতে এসে পৌঁছয়। প্রথমে এঞ্জিনিয়ারিং পড়লেও চিত্রসাংবাদিকতা বেছে নেন রঘু রাই। দ্য স্টেটসম্যান, হিন্দুস্থান টাইমস হয়ে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকার আলোকচিত্র ও ডিজ়াইনের দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাত্যহিক রাজনীতি ধরে যে আর্কাইভ তৈরি করে গেছেন তিনি, তা এই দেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের মূল্যবান দলিল। রঘু রাই সাদর স্বীকৃতি পেয়েছেন শুরু থেকেই। প্যারিসে এগজ়িবিশনে তাঁর তোলা ছবি দেখে ১৯৭৭-এ হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসঁ তাঁকে ‘ম্যাগনাম ফোটো’য় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। গ্রিনপিস, ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক থেকে টাইম, লাইফ, দ্য নিউ ইয়র্কার, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রকল্প তিনি করেছেন। যতই তিনি আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করুন না কেন, তাঁর দেখার ভঙ্গি ছিল থিতু, নিবিষ্ট, ঠিক পড়শির হাতে হাত রেখে বসার মতো ঘনিষ্ঠ। ঠিক যে ভাবে দেখলে পথে, নদীর ঘাটে, মন্দির-মাজারের সিঁড়িতে, বাজারে, মসজিদের পাশের গলিতে, মাঠে, ঘরের কোণে বা মহল্লার প্রান্তে, টাঁড়ে-টিলায় মানুষের তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর জীবন মহার্ঘ হয়ে দেখা দেয়।

সে জন্যই সাদা-কালো ছবির অন্য দুই ম্যাগনাম বুজ়ুর্গ কার্তিয়ের ব্রেসঁ আর সেবাস্তিয়াও সালগাদো-র থেকে রঘু রাই সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থেকে যান। তাঁর ছবির বিষয় প্রাত্যহিকী, সেখানে বহু জনের ভিড়, বহু উপাদানের ও বহু সময়ের ভিড়। আর তা থেকে কোনও কেন্দ্র-প্রান্ত আলাদা করা কম্পোজ়িশন তৈরি হয় না। সেবাস্তিয়াও সালগাদোর এপিক ফ্রেমে খনিতে খাদানে বিপুল সংখ্যক মানুষ স্থাপত্যের মর্যাদায়। তার পাশে রাখলে রঘু রাই কখনও ফোকলোরিক, কখনও বা তিনি দাস্তানগো। কখনও ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিমূর্ততার মতো মহিমময়— যে অপেক্ষায় তিনি বিসমিল্লা বা ভীমসেন যোশী বা কিশোরী আমোনকরের তদ্গত মুখ তুলে ধরেন। তাঁর পিপল বইয়ে মহাবলীপুরম বিপুল পাথরের পাশে বীণাবাদনরত এস বালচন্দর— একটু পরের পাতাতেই কেঠো চেয়ারে বসে দুই অনাম্নী বৃদ্ধ।

এই অনামী মানুষরাই রঘু রাইয়ের নিজের। এই দেশ আর তার অনামী মানুষ। তাঁদের উপচানো শারীরিক ঘেঁষ আর তাঁদের নিজস্ব জীবন ও ভঙ্গিমার স্থিতি গতি থেকে কম্পোজ়িশন তৈরি হয়। ফ্রেমের বাইরে থেকে যে মুহূর্তে ঢুকে পড়ছে কেউ, বা বেরিয়ে যাচ্ছে, বা হাই তুলছে, কেউ এক ঝলক তাকাল, হোঁচট খেল, লোকাল ট্রেন এসে থামল আর ধাবমান জনস্রোতে কেউ এক জন খবর কাগজ পড়ছে, শুধু সে স্থির। আর রঘু রাই অপেক্ষা করে যাচ্ছেন। কখন ওই মুহূর্তের ইশারা দেখা দেয়। যখন বাজারের পথে একটা নেড়িকুকুর কার্নিসের দিকে আবছা তাকায় বা গঙ্গার ধারে গাছের আবডাল থেকে মুখ বার করে দেয় গরু, বা দু’জন দু’রকম সবুজ জামা পরা লোক আর এক রকম সবুজ দরজা থেকে দু’দিকে চলে যায়, দলাই লামার মাথার পিছনে জানলায় এক খণ্ড সাদা মেঘ এসে স্থির হয়। এই মুহূর্তটা না ধরতে পারলে এই আখ্যান ভেঙে যাবে। ফ্রেম এই আখ্যানের সীমা নয়। ফ্রেমের ভিতরে খণ্ড খণ্ড ‘কেওস’, পরিসরের নানা ধাপ, স্তর ও টেক্সচার একত্রে থাকে, কোনও মূল অক্ষ ছাড়াই নাটকীয়তায় ঘুরতে থাকে।

রঘু রাই বলেছিলেন, “কোনও একটা মুহূর্ত আসে যখন ব্যক্তির ভিতরের গহিন যে আত্ম সেটি প্রকাশ পায়। নিরবচ্ছিন্ন অপেক্ষা করে থাকতে থাকতে, ক্যামেরার ভিতর দিয়ে দেখতে দেখতে সেই মুহূর্ত ধরে নিতে পারলে, ব্যক্তিটির বা পরিসরের আত্মা ধরা পড়ে।” সেই মুহূর্ত খুঁজে পাওয়া প্রায় ‘ইনস্টিঙ্কটিভ’। তাকে অনবরত দেখার শিক্ষণপ্রণালীর মধ্যে নিতে নিতে তা নিশ্চয়ই শিল্পীর স্টাইলে পরিণত হয়। তাঁর দর্শন দিদৃক্ষা। সেইখানে তাঁর ‘জীবনের সমস্ত শক্তি সংহত হয়ে আছে’। সন্ধ্যার ঘনঘটার নীচে অন্ধকারাচ্ছন্ন জামা মসজিদ, আর অল্প কাছে আলোকিত ঘরে একাকী মহিলা নমাজরত। বা জোয়ারের জল এসে গেছে বারাণসীর সিঁড়ির উপরের ধাপে মহল্লার মানুষের কাছাকাছি।

রঘু রাইয়ের তোলা ছবি ১৮টি বইয়ে সঙ্কলিত হলেও, হতেই পারে যে নিজস্ব ট্রাঙ্কে এখনও রয়েছে অপ্রকাশিত কয়েক হাজার। যশ ও পুরস্কার আসতে থাকলে শিল্পের ধার কমে ঘরোয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু পদ্মশ্রী থেকে ফোটোগ্রাফির আন্তর্জাতিক সব খেতাব এলেও রঘু রাই দশক দশক পেরিয়ে থেকে গেছেন একই রকম, জ্যামুক্ত। তাঁর ছবি একই ভাবে মানুষের দিকে অতি সংবেদনে তাকিয়ে থেকেছে। ১৯৯০ নাগাদ রঙিন ফিল্মের ব্যবহার শুরু করলে রঙের পরে রং দেখতে পাওয়ার অন্য রসায়ন বেরিয়ে এসেছে নবীন ক্যারিশমায়।

কত দিন ধরে পায়ে পায়ে হাঁটলে, কত ক্ষণ কাছে বসে অপেক্ষা করে থাকলে তবে অপরিচিত মানুষগুলি ক্যামেরার সামনে আড় ভেঙে ফেলে, এ ভাবার। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ধরা আর্ত ভীত মুখচ্ছবিগুলি মনে রাখার। তাঁদের মুখে টুঁটি-টেপা নৈঃশব্দ্য কী ভাবে ছবিতে ধরা আছে, খেয়াল করার।

যে ছবিগুলি বার বার ফিরে আসছে এখন, তাতে মাদার টেরিজ়া, ইন্দিরা গান্ধী ও দলাই লামা। প্রতিটি আইকনকে রঘু রাই অপেক্ষা করে করে সেই অমোঘ মুহূর্তে তাঁদের আইকনত্বের সীমানা পেরিয়ে ঠেলে দেন, যেখানে তাঁদের বেদির কাঠিন্য স্পষ্ট দেখা যায়, বেদি থেকে নেমে এলে তাঁদের ক্ষণভঙ্গুরতা ও একাকিত্ব ধরা দেয় ক্ষণিকে। তাই মাদার টেরিজ়া মুখ মুছছেন, বা একা একা হেঁটে যাচ্ছেন ‘ইমার্জেন্সি’র লৌহমানবী, বা দলাই লামা দুই হাত মাথার উপর তুলে নিজ অন্যমনস্কতায় ধরা পড়ছেন এক জন মাটির পৃথিবীর মানুষের মতোই।

পরের প্রজন্মের কত জনের দৃষ্টি যে স্বচ্ছ করে তুলেছেন রঘু রাই! এ এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। ক্যামেরায় ছবি তোলার মতো ছবি দেখাও আয়াসসাধ্য ও মরমি ক্রিয়া, সেও তাঁর ছবি দেখে জেনেছি। তাঁর ছবিতে এক নবীন রাষ্ট্রের ক্রমে ‘হয়ে ওঠা’র সময় দীর্ঘ পাঁচ দশকব্যাপী মানুষজনের ইতিহাস আর্কাইভ করা আছে, এটুকু বলে থেমে গেলে আদত কথাটিই বলা হবে না। সার কথা হল, যে ভারতবর্ষ মধ্যবিত্তের আত্মমগ্নতার একটুখানি পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, বাসের জানলায় মুখ বাড়াচ্ছে, উবু হয়ে বসছে, বাজারে ঠেলাগাড়ির উপর ঘুমন্ত কিশোর শ্রমিকের মতো ঠা-ঠা রোদে অপেক্ষমাণ, ট্রেনের চলন্ত দরজায় চায়ের ট্রে নিয়ে লাফিয়ে উঠেছে, যে ভারতবর্ষ সদা উপস্থিত কিন্তু কখনওই দৃষ্টিগোচর হয় না, রঘু রাইয়ের ক্যামেরা তার দিকে মমতাময় দৃষ্টি রাখে। ছবি জুড়ে এই মমতা তাঁর হৃদয়সঞ্জাত। আর তাঁর ছবির দর্শক হওয়া মানে সেই মমতায় স-হৃদয় হতে শেখা। রঘু রাই হাতে ধরে নিয়ে যান এই দেশের মানুষের দিকে, কী ভাবে আমরা আমাদের মানুষকে দেখব, কোন সংবেদনায় ভারতবর্ষ নামে একটি বিমূর্ত অবলম্বন আমাদের কাছে আমার দেশ হয়ে উঠবে। এই মানুষগুলি আমার হয়ে উঠবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন