সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কর্মরত মেয়েরা সমাজ পরিবর্তনের সূচক
Women Empowerment

আরতি, অদিতি, কণা

মহানগর-এ মধ্যবিত্ত গৃহবধূ আরতি আর্থিক ভাবে অসচ্ছল পরিবারকে সাহায্য করার জন্য ‘সেলস গার্ল’-এর চাকরি নেয়। সত্যজিৎ তার এই চাকরিকে কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসাবে নয়, বরং আত্ম-আবিষ্কার এবং ক্ষমতায়নের একটি প্রক্রিয়া হিসাবে চিত্রিত করেন।

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০১ মে ২০২৬ ০৭:৩৮
Share:

সমান: সত্যজিৎ রায়ের নায়ক (১৯৬৬) ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর ও উত্তমকুমার।

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় কর্মরতা মহিলা চরিত্রের প্রসঙ্গ উঠলেই ভেসে ওঠে মহানগর (১৯৬৩)-এ মাধবী মুখোপাধ্যায়ের ছবিটি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, সংশয় নেই— কিন্তু একমাত্র ছবি নয়। নায়ক (১৯৬৬), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০) এবং জন-অরণ্য (১৯৭৬)-র মতো একাধিক ছবিতে কর্মরতা মহিলাদের চরিত্রচিত্রণের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনোত্তর ভারতে নারীশ্রম ও স্বাধীনতার উপর সত্যজিতের শক্তিশালী ভাষ্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এই চরিত্রগুলি ব্যবহার করে সত্যজিৎ সরাসরি বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পটপরিবর্তন দেখান। কী ভাবে বিশ শতকে মেয়েদের জনজীবন ও পেশাগত জগতে প্রবেশ প্রচলিত লিঙ্গভেদের নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে, পারিবারিক সমীকরণ বদলে দেয় এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বৈপরীত্যগুলিকে উন্মোচিত করে, তাও ফুটিয়ে তোলেন।

মহানগর-এ মধ্যবিত্ত গৃহবধূ আরতি আর্থিক ভাবে অসচ্ছল পরিবারকে সাহায্য করার জন্য ‘সেলস গার্ল’-এর চাকরি নেয়। সত্যজিৎ তার এই চাকরিকে কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসাবে নয়, বরং আত্ম-আবিষ্কার এবং ক্ষমতায়নের একটি প্রক্রিয়া হিসাবে চিত্রিত করেন। আরতির চাকরি করার সিদ্ধান্ত তার পরিবারের রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিচলিত করে— ছবিটি মেয়েদের ঘরের চৌহদ্দির বাইরে পা রাখাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক নানা টানাপড়েনকে তুলে ধরে। একই সঙ্গে দেখায়, কী ভাবে বেতনযুক্ত চাকরি ধীরে ধীরে আরতিকে আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং নৈতিক স্বাধীনতা এনে দেয়।

আরতির ‘মুক্তি’-কে রোম্যান্টিক রূপে দেখানো হয়নি ছবিতে। তার ক্ষমতায়ন আসে মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। তাকে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন সহ্য করতে হয়, মেনে নিতে হয় পরিবারের সমালোচনা; ঘরোয়া ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে রণক্লান্ত হতে হয়। তবুও ছবির শেষে, যখন সে কর্মক্ষেত্রে অন্যায় এবং অবিচারের প্রতিবাদে পদত্যাগ করে, আরতি চরিত্রটি কেবল অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই নয়, নৈতিক স্বাধিকারও প্রদর্শন করে। সে তার আশপাশের মানুষদের চেয়ে নৈতিক ভাবে শক্তিশালী হিসাবে আবির্ভূত হয়। কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশ কেবল অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়— মর্যাদা, স্বায়ত্তশাসন এবং নিজের কথা বলার অধিকার অর্জনের লড়াই।

নায়ক-এ অদিতি সেনগুপ্তর মাধ্যমে কর্মরতা নারীর এক অত্যন্ত শহুরে ও আধুনিক চিত্র তুলে ধরেন সত্যজিৎ। তরুণী অদিতি ‘আধুনিকা’ নামে একটি মেয়েদের পত্রিকার সম্পাদক; শিক্ষিতা স্পষ্টভাষী, স্মার্ট, আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী এবং আত্মবিশ্বাসী। সে স্বাধীনোত্তর ভারতে শহুরে পেশাজীবী এক নতুন শ্রেণির নারীর প্রতিনিধিত্ব করে। ‘নায়ক’-এর এক জন নিষ্ক্রিয় প্রশংসাকারী হওয়ার পরিবর্তে অদিতি হয়ে ওঠে তার পর্যবেক্ষক এবং তীব্র সমালোচক। সে অরিন্দমের নৈতিকতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তাহীনতা এবং আপস নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যার ফলে প্রচলিত লিঙ্গভেদের নিয়ম— যা পুরুষদের পর্যবেক্ষণ করতে শেখায় এবং নারীদের পর্যবেক্ষিত হতে— উল্টে যায়। ছবিতে অদিতি এক জন সংশয়ী ও স্বাধীন সাংবাদিক হিসাবে চিত্রিত হয়, যে তাদের দীর্ঘ কথোপকথনের পুরোটা জুড়ে অরিন্দমের নিজস্ব ধারণা ও দর্শনকে চ্যালেঞ্জ করে।

অদিতি চরিত্রটিকে যা বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে, তা হল প্রধান পুরুষ চরিত্রের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিপক্ষ হিসাবে তার নির্মাণ। সে শান্ত, বিচক্ষণ এবং আবেগগত ভাবে সংযত; অপর দিকে অরিন্দম তার খ্যাতি ও পুরুষালি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও ক্রমশ দুর্বল এবং মানসিক ভাবে ভঙ্গুর বলে প্রতীয়মান হয়। এর মাধ্যমে সত্যজিৎ যেন বোঝাতে চান, আধুনিক কর্মরতা নারীর এক নীরব কর্তৃত্ব রয়েছে, যা সামাজিক ক্ষমতা থেকে নয়, বরং মেধা, পেশাদারিত্ব এবং আবেগের পরিপক্বতা থেকে উদ্ভূত। পাশাপাশি অদিতির উপস্থিতি এও ইঙ্গিত দেয়, ষাটের দশকের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের নারীরা একেবারেই ব্যতিক্রমী ছিলেন। বস্তুত, অদিতি স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে, ‘নায়িকা’ না হয়েও প্রায় নায়িকা হিসাবে স্থান করে নেয় পর্দায়, এই কারণেই যে, তার চরিত্রের সঙ্গে সেই সময়ের আর পাঁচ জন সাধারণ নারীর মিল ছিল সামান্যই।

প্রতিদ্বন্দ্বী-তে নায়ক সিদ্ধার্থ বেকার, আর তার ছোট বোন সুতপা চাকরি করে। সুতপার এই চাকরি করা প্রচলিত লিঙ্গভেদের নিয়মের এক বিপরীত চিত্র তুলে ধরে— যেখানে শিক্ষিত পুরুষ বেকার ও লক্ষ্যহীন হয়ে থাকে; আর নারী হয়ে ওঠে পরিবারের ভরণপোষণকারী। সমাজের এই অপ্রচলিত চিত্রটি সিদ্ধার্থকে গভীর ভাবে বিচলিত করে, যা পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে পুরুষের অহঙ্কারের ভঙ্গুরতাকে প্রকাশ করে। তথাপি সুতপার আর্থিক স্বাধীনতাকে দ্ব্যর্থক ভাবে চিত্রিত করেন সত্যজিৎ। তার চাকরি ও জীবনযাত্রা নৈতিক আপসের বিষয়ে সন্দেহ জাগিয়ে তোলে এবং তাকে নিয়ে পরিবারের অস্বস্তি এটাই ইঙ্গিত করে যে, সমাজ প্রায়শই স্বাধীন নারীদের সন্দেহের চোখে দেখে। সত্যজিৎ এমন এক সমাজের ভণ্ডামি উন্মোচন করেন, যা নারীর উপার্জনের উপরে নির্ভরশীল, অথচ একই সঙ্গে জনজীবনে পা রাখার জন্য নারীর বিচার করতে সদাপ্রস্তুত। সুতপাকে নিঃশর্ত ভাবে মহিমান্বিত করা হয়নি ছবিতে; বরং, তাঁর চরিত্রে শহুরে নারীদের নব অর্জিত অর্থনৈতিক স্বাধিকারকে ঘিরে থাকা ‘মরাল অ্যাংজ়াইটি’ বা নৈতিক উত্তেজনা প্রতিফলিত হয়।

এই উত্তেজনা স্পষ্টত ফুটে ওঠে ছবির আর একটি নারী চরিত্র চিত্রণে। চরিত্রটি একটি নার্সের, যার ফ্ল্যাটে সিদ্ধার্থকে নিয়ে যায় তার বন্ধু। মূল উপন্যাসে চরিত্রটির নাম লতিকা। ফ্ল্যাটে পৌঁছেই সিদ্ধার্থ বুঝতে পারে যে নার্স হলেও, সে ‘খারাপ মেয়ে’— যৌনকর্মের সঙ্গে লিপ্ত। সেবিকা ও যৌনকর্মী হিসাবে লতিকার দ্বৈত ভূমিকা গভীর ভাবে প্রতীকী। এক দিকে, সে সেই সব শহুরে নারীর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিনিধিত্ব করে যাঁরা বেঁচে থাকার জন্য সম্মানজনক চাকরির পাশাপাশি ‘কলঙ্কিত’ শ্রম করতে বাধ্য হন। অন্য দিকে, তার চরিত্রটি অভাব ও হতাশায় জর্জরিত সমাজে সামাজিক সম্মান ও নৈতিক নিন্দার মধ্যকার ভঙ্গুর সীমারেখা উন্মোচন করে। সামাজিক ভাবে সমাদৃত নার্সিং পেশার সঙ্গে যৌনকর্মকে পাশাপাশি রেখে সত্যজিৎ ‘সম্মানজনক’ ও ‘অসম্মানজনক’ কাজ সম্পর্কে দর্শকের প্রচলিত ধারণাকে নাড়িয়ে দেন। জানান, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ‘ভাল কাজ’ ও ‘খারাপ কাজ’-এর পার্থক্য প্রায়শই ভেঙে পড়ে।

জন অরণ্য-এও সমাজের একই রকম হতাশাজনক চিত্রায়ণ দেখা যায়। ছবিটির চমকপ্রদ ক্লাইম্যাক্সে প্রকাশ পায়— এক জন খদ্দেরের যৌনকর্মীর চাহিদা মেটাতে ছবির প্রধান চরিত্র সোমনাথ (তত দিনে যে ভাল ছাত্র থেকে দালালে পরিণত হয়েছে) অজানতেই যাকে নিয়ে শহরের পাঁচতারা হোটেলে পৌঁছয়, সে সোমনাথেরই বন্ধুর বোন কণা (ওরফে যূথিকা)। যৌনকর্মে আসার তার এই সিদ্ধান্তকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসাবে নয়, বরং এক মরিয়া অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসাবে দেখানো হয়। ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিতে যে বাজার পুরুষদের মর্যাদাপূর্ণ চাকরি থেকে বঞ্চিত করে, সেই একই বাজারে নারীদের শরীর পণ্যে পরিণত হয়— সত্যজিৎ দর্শককে এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে বাধ্য করেন। মহানগর-এর আরতির আশাব্যঞ্জক ক্ষমতায়নের বিপরীতে, কণা যেন পুঁজিবাদের অধীনে নারীশ্রমের করুণ অন্ধকার দিকটির প্রতিনিধিত্ব করে। এর মাধ্যমে সত্যজিৎ স্বীকার করেন যে, কেবল অর্থনৈতিক অংশগ্রহণই ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা দেয় না; কাজের প্রকৃতি ও পরিস্থিতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মরতা মেয়েদের এই সরাসরি চিত্রায়ণের পাশাপাশি, সত্যজিৎ ঘরে বাইরে (১৯৮৪) ছবিতে খুব সূক্ষ্ম ভাবে নারী-মুক্তির বৃহত্তর প্রশ্নটিও অন্বেষণ করেন। যদিও ছবিটি প্রচলিত অর্থে নারীর শ্রম নিয়ে নয়, কিন্তু বিমলার গার্হস্থ জগৎ থেকে বাইরের জগতে পদার্পণের মুহূর্তটি যেন আরতি, অদিতি, সুতপা, লতিকা এবং কণার সংগ্রামের সূচনা মুহূর্ত হিসাবেই পুনর্নির্মিত। সত্যজিৎ জানান, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বহু আগে, অনেক সামাজিক বাধা পেরিয়ে মেয়েদের জনজীবনে দৃশ্যমানতা এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। আখ্যানের সময়কালের কয়েক দশকের ব্যবধান কী ভাবে পাল্টেছিল ‘বাইরে’-র জগতে নারীর অবস্থান, আর কতখানি অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছিল, সত্যজিতের ছবিগুলি পর পর দেখলে তার রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অর্থনীতি বিভাগ, শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন