Special Intensive Revision

প্রমাণ হল, সবাই সমান নয়

কেন এত বছর ভোট দেওয়ার পরেও, পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম ভোটার তালিকায় থাকার পরেও তাঁরা এ বারের ভোটে সেই অধিকার পাবেন না, সেই প্রশ্ন করে চলেছেন বহু ভোটার।

সুজিষ্ণু মাহাতো

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫৮
Share:

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে। ট্রাইবুনালে আবেদন করতে এসে গজগজ করছিলেন বর্ধমান শহরের বছর আটষট্টির গৌরবরণ সামন্ত, মেমারির বাসিন্দা ইয়াসিন খান। তাঁদের ক্ষোভ, “সব কাগজ ঠিক থাকার পরেও নাম বাদ! বার বার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। হয়রানি আর হেনস্থার একশেষ। আমরা কি চুরির দায়ে ধরা পড়েছি?”

গত ৩১ মার্চ, বর্ধমানে যে দিন এই ঘটনা ঘটছে, তার পরের দিনই দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টের বার্তা, বাংলায় বিধানসভা ভোটের আগে অতিরিক্ত তালিকায় যাঁদের নাম উঠবে না, তাঁদের ভোটাধিকার চিরতরে চলে যাবে না। সেই সুপ্রিম কোর্টই ১৩ এপ্রিল, সোমবার জানিয়ে দেবে এ রাজ্যের ‘বিবেচনাধীন’ ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে যে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা গিয়েছে, তাঁদের এ বারের ভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সম্ভাবনা নেই।

কেন এত বছর ভোট দেওয়ার পরেও, পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম ভোটার তালিকায় থাকার পরেও তাঁরা এ বারের ভোটে সেই অধিকার পাবেন না, সেই প্রশ্ন করে চলেছেন বহু ভোটার। সেই সব প্রশ্ন, ক্ষোভ, হতাশা, কান্না নথিভুক্ত রয়েছে গত কয়েক সপ্তাহে প্রকাশিত সংবাদপত্রের বিভিন্ন পাতায়। উত্তর নেই।

নেই আরও বহু প্রশ্নের উত্তর। ১ এপ্রিলের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, কী যুক্তিতে নাম বাদ, তা এসআইআরের কাজে নিযুক্ত বিচারকদের জানাতে হবে। ১৩ তারিখের শুনানিতে নাম বাদ যাওয়া মামলাকারীদের আইনজীবী বলেন, ট্রাইবুনালে নিযুক্ত কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবগণনম নিজে বলেছেন যে, নাম খারিজের পরে বিচারকেরা বহু ক্ষেত্রে তার কারণ লেখেননি। তাঁর বক্তব্য, বহু ক্ষেত্রে আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে তার পরে নাম খারিজের ‘কারণ’ লেখা হয়েছে। কমিশন ৫ এপ্রিল থেকে ট্রাইবুনাল চলছে বলে বললেও তিনি জানিয়েছেন, এখনও কিছুই হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট তখন জানায়, তারা বিচারকদের অসম্মানিত হতে দেবে না।

নাগরিকদের সঙ্গে যা হচ্ছে, তা কি অসম্মান নয়? নদিয়ার রানাঘাটের ৮৪ বছরের নগেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের নাম বাদ পড়েছে। ন্যুব্জ শরীর নিয়ে গিয়েছিলেন ট্রাইবুনালে। সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ১৯৬২ সালে প্রথম ভোট দেন তিনি। ১৯৬৪ সালে রানাঘাট কলেজ থেকে পাশ করার শংসাপত্র, ১৯৫২ সালের ঠাকুরদার নামে বসতবাড়ির জমির দলিল, ১৯৭৯ সালের নিজের নামে জমির নথি রয়েছে। তাঁর আক্ষেপ, “এই বয়সে নথিপত্র নিয়ে দৌড়ঝাঁপ আর সহ্য হচ্ছে না।” সামনে এসেছে পশ্চিম বর্ধমানের রূপনারায়ণপুরের নবতিপর দুর্গা রায়ের ভোট প্রচারে যাওয়া প্রার্থীর কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ার কথা। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেছেন, “আমার নাম কেন কাটা গেল? আমি তো মরে যাইনি!” ট্রাইবুনালে আবেদন করতে এসে রানাঘাটে মহকুমাশাসকের দফতর চত্বরে মৃত্যু হয়েছে বছর আটষট্টির জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাসের। এসআইআর-পর্বে মৃত্যু হয়েছে শতাধিক বাসিন্দার। ট্রাইবুনালে আবেদন করতে ২১ দিনের শিশুসন্তানকে নিয়ে বীরভূমের দুবরাজপুরের যশপুর থেকে সিউড়িতে এসে দিনভর অপেক্ষা করতে হয়েছে সেলিমা খাতুনকে। সেই ছবিও প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে।

এসআইআরের কাজে নিযুক্ত বিচারকদের যথাযথ কারণেই নিরাপত্তা দিয়েছে শীর্ষ আদালত। নাম বাদ পড়া যে সব প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন তাঁদের নাম দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে উঠেছে। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর নাতি, তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের আর এক সদস্যের নাম বাদ পড়ার কথা সুপ্রিম কোর্টে জানানো হলে সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য কমিশনকে নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত। কিন্তু যাঁদের সুপ্রিম কোর্ট অবধি যাওয়ার সামাজিক বা অর্থনৈতিক পুঁজি নেই, তাঁদের কী হবে? প্রবল শীতে শুনানির লাইনে, প্রবল গরমে ট্রাইবুনালের লাইনে দাঁড়িয়ে যাঁদের দিনের রুজি নষ্ট হয়েছে, হচ্ছে, তাঁদের অধিকার কে দেখবে? কোন কারণে এই ভোগান্তি তা জানা যাবে না?

জানুয়ারিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, ভারতরত্ন অমর্ত্য সেনকে শুনানির নোটিসের খবর এল যখন, তার সমর্থনে এসআইআরের সমর্থকদের যুক্তি ছিল, আইনের চোখে সকলেই সমান। নথি, তথ্যের গোলযোগ থাকলে যে কারও কাছে নোটিস যেতেই পারে। সব ক্ষেত্রে সেই যুক্তি খাটে না, দেখা যাচ্ছে। জানা গেল, গত ২ এপ্রিল ট্রাইবুনাল নিয়ে কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে ওটিপি এবং পোর্টাল ব্যবহারের জন্য বিচারপতিরা ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও ইমেল ব্যবহার করতে নারাজ হয়েছেন। বুথ স্তরে যাঁরা এসআইআরের কাজ করেছেন, সেই বিএলও-দের অবশ্য ব্যক্তিগত মোবাইলেই কাজ করতে হয়েছে। অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত নম্বর কী ভাবে কমিশন প্রকাশ করে রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে দিল? এই প্রশ্ন গত নভেম্বরেই তুলেছিলেন বিএলওরা। বহু মহিলা বিএলও জানিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত নম্বর ছড়ানোয় তাঁদের ফোনে বিরক্ত করা হয়েছে। সমাধান মিলেছিল কি?

১৪ এপ্রিল ছিল ভারতীয় সংবিধানের প্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেডকরের জন্মদিন। সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের জন্য সওয়াল করেছিলেন তিনি। দলিত, নারী, দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই ভোটাধিকার পেলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, বলেছিলেন তিনি। এই কি গণতন্ত্র? যেখানে সকলের বিচার চাওয়ার সমান ক্ষমতা বা অধিকার নেই?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন