কোথায় কত নাম বিবেচনাধীন ও কেন, তার নকশা এখন স্পষ্ট
WB Elections 2026

নাম বাতিলের রাজনীতি

গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এটি নাগরিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি। ভোটাধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার যদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তা হলে কত জন বাদ পড়লেন, প্রশ্ন শুধু সেটা নয়— প্রশ্ন হল কোথায়, কার উপরে, কতটা বেশি ভাবে এই অনিশ্চয়তা নেমে এল।

জ্যোতিষ্ক দত্ত

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩২
Share:

ক্লিষ্ট: এসআইআর-কোপে পড়ে কাগজ-সহ অপেক্ষমাণ ভিড়, রানাঘাট, ৮ এপ্রিল। ছবি: পিটিআই।

ভোটার তালিকার বিবেচনাধীন নামগুলির পরিণতি শেষ অবধি কী হতে চলেছে, এখনও জানি না। এই লেখা যখন শেষ করছি, তখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এল— যাঁদের নাম এখনও তালিকায় ওঠেনি, ভোটের দু’দিন আগে অবধি যদি ট্রাইবুনাল তাঁদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয়, তবে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু, প্রতি দিনই যে ভাবে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, তাতে শেষ অবধি কী হবে, সে পূর্বাভাস না-করাই সম্ভবত বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে। এই লেখায় আমরা দেখার চেষ্টা করব যে, এসআইআর, এবং বিশেষত ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতির কারণে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিবেচনা কী ভাবে নির্বাচনী পাটিগণিতকে জটিলতর করেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আগের নির্বাচনগুলির ফলাফল দেখে নিলে ছবিটা বুঝতে সুবিধা হবে। ২০১১ সালে তৃণমূল ও কংগ্রেসের জোট প্রায় ৪৮% ভোট পেয়ে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২২৬টি আসনে জয়ী হয়েছিল— বাম ফ্রন্ট ৪১.১% ভোট পেয়েও আসন পেয়েছিল মাত্র ৬২টি। আসনসংখ্যার এই বিপুল ফারাক পরবর্তী দশকে আরও প্রকট হয়। ২০২১ সালে এসে বামেদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত কমে দাঁড়ায় ছয় শতাংশের কাছাকাছি। উল্টো দিকে, বিজেপির ভোটের হার ২০১১ সালে ছিল ৪ শতাংশের কাছাকাছি— ২০২১ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩৮ শতাংশে পৌঁছয়। এই পুনর্বিন্যাসে শুধু বিজেপিই লাভবান হয়েছে তা নয়; তৃণমূল কংগ্রেসও তাদের ভোটের ভিত্তি মজবুত করেছে— ২০১১ সালে একক ভাবে তারা পেয়েছিল ৩৮.৯% ভোট— ২০১৬ সালে ৪৫%, এবং ২০২১ সালে প্রায় ৪৮%।

জেলাভিত্তিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি ডিভিশনের জেলাগুলিতে— আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি— ২০২১ সালে বিজেপি শতাংশের বিচারে তৃণমূলের থেকে এগিয়ে ছিল। অন্য দিকে, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর দিনাজপুরে বিজেপির ফল তুলনামূলক ভাবে দুর্বল ছিল, বিশেষ করে ব্যবধানের বিচারে। অর্থাৎ, রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে অঞ্চলভেদে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে।

ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন ও যৌক্তিক অসঙ্গতির ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয়গুলিকে এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ার ঘোষিত উদ্দেশ্য— ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া, মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের পৃথক করা, এবং একটি ‘স্বচ্ছ’ ভোটার তালিকা তৈরি করা। কিন্তু, বাস্তবে কী দাঁড়িয়েছে, রাজ্যবাসী তা বিলক্ষণ টের পাচ্ছেন। একটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যে মানুষের মনে এমন গভীর উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, তা আগে জানা ছিল না। এই উদ্বেগের মূল উৎস অনিশ্চয়তা। ‘বিবেচনাধীন’ তালিকা তৈরি, সেই তালিকা থেকে ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়া— সবই তৈরি করেছে বিপুল অনিশ্চয়তা। শুধু ব্যক্তি-নাগরিকের ক্ষেত্রেই নয়, সার্বিক ভাবেও। কারা বাদ পড়লেন, কারা যুক্ত হলেন— তার কোনও নির্দিষ্ট তথ্য দীর্ঘ দিন অবধি প্রকাশ করা হয়নি। বুথভিত্তিক স্ক্যান করা তালিকা থেকে রাজ্যস্তরের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা কার্যত অসম্ভব।

তথ্যের এই অস্বচ্ছতা ও অসম্পূর্ণতার ফলে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া কঠিন হয়েছে— এই বিপুলসংখ্যক ‘বিবেচনাধীন’, অথবা বিবেচনার পরে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটার কোথায় অবস্থান করছেন? যদি ধরে নেওয়া হয় যে, এক জেলার সঙ্গে অন্য জেলার মৃত্যুহার বা স্থানান্তর ইত্যাদি কারণে নাম বাদ পড়ার অনুপাতে খুব বেশি ফারাক নেই, তা হলে পাটিগণিতের অঙ্ক বলবে, প্রতিটি বিধানসভা আসনেই মোট ভোটারের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বিবেচনাধীন থাকবে। কিন্তু, বাস্তব চিত্র তা নয়। বরং দেখা যাচ্ছে, যে সব বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২১ সালে তৃণমূল বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল, সেই সব কেন্দ্রে বিবেচনাধীন ভোটারের অনুপাত তুলনামূলক ভাবে বেশি। যদি এই শ্রেণিবিভাগ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফল হত, তা হলে তার মধ্যে এত প্রকট সম্পর্ক থাকত কি? সামান্য বিচ্যুতি থাকতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক ভাবে একই দিকের একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা গেলে তা ভিন্নতর ব্যাখ্যা দাবি করে।

এই সম্পর্ক ভৌগোলিক ভাবেও পুঞ্জীভূত। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-মধ্য বাংলার একটি বেল্ট— মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর— যেখানে বিবেচনাধীন ভোটারের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। বিবেচনাধীন ভোটারের হার সবচেয়ে বেশি যে ২৫টি কেন্দ্রে, তার মধ্যে ১১টি মালদহে, ৮টি মুর্শিদাবাদে, ৫টি উত্তর দিনাজপুরে এবং ১টি বীরভূমে। অর্থাৎ, পরিসংখ্যান বলছে যে, ‘বিবেচনাধীন ভোটার’ বিষয়টি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।

এখানে দু’টি কথা বলে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, রাশিবিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠই বলে যে, কো-রিলেশন বা আন্তঃসম্পর্ক মানেই কজ়েশন বা কার্যকারণ সম্পর্ক নয়। ফলে, বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা কয়েকটি নির্দিষ্ট জেলায় অনেক বেশি, এই তথ্য থেকে সরাসরি কোনও অভিসন্ধি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সম্ভাবনা রয়েছে যে, এই প্রবণতা আসলে সামাজিক বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন। যে গোষ্ঠীগুলি অধিকতর প্রান্তিক— দরিদ্র, নিরক্ষর, প্রবীণ, পরিযায়ী— তাদের পক্ষে পরিচয়পত্র বা নথিপত্র সঠিক ভাবে সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময়ে পেশ করা কঠিন। আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, জেলার জনসংখ্যায় মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ঘনত্বের সঙ্গে ‘বিবেচনাধীন’-এর সংখ্যার যেমন দৃঢ় আন্তঃসম্পর্ক আছে, তেমনই আছে নিরক্ষরতার হারের সঙ্গেও। অন্য দিকে, সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উত্তরদাতারা মনে করেছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রবীণ, নিরক্ষর, দরিদ্র, গ্রামীণ মানুষ এবং পরিযায়ীরা। অর্থাৎ, ঝুঁকির বোঝা সমাজের প্রান্তিক অংশের উপরেই বেশি পড়ছে— এবং এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ফল। এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যেই তৃণমূলের সমর্থন তুলনামূলক ভাবে বেশি থাকলে, পরিসংখ্যানে এই ধরনের সম্পর্ক দেখা যেতেই পারে।

তবু একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ নয়। নিরক্ষরতা ও আর্থসামাজিক বৈষম্যের প্রভাব পরিসংখ্যানগত ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পরেও দেখা যাচ্ছে, ভোটের ব্যবধান ও বিবেচনাধীন হারের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।

দ্বিতীয় কথা হল, গোটা রাজ্যকে একত্রে বিশ্লেষণ করলে জেলাভিত্তিক বৈচিত্র আড়াল হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক দক্ষতা, জনসংখ্যার গঠন, বা রাজনৈতিক সমর্থনের ধরন আলাদা। এই সবই ভোটের ব্যবধান ও বিবেচনাধীন হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। এই আপত্তিও যুক্তিসঙ্গত। তাই আমাদের বর্তমান বিশ্লেষণে জেলাভিত্তিক প্রভাব আলাদা রেখে দেখা হয়েছে। ফল একই। একই জেলার মধ্যেই, তৃণমূল-জেতা আসনে ভোটের ব্যবধান প্রতি ১ শতাংশ বাড়লে বিবেচনাধীন ভোটারের হার গড়ে প্রায় ০.৪১ শতাংশ বাড়ছে। বিপরীতে, বিজেপি-জেতা আসনে এই সম্পর্ক কার্যত শূন্য— অর্থাৎ ব্যবধান বাড়লেও বিবেচনাধীনের হারে তেমন পরিবর্তন নেই। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর— এই তিনটি জেলাতে আলাদা করে দেখলেও এই প্রবণতা একই রকম। যেখানে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান বেশি, সেখানে বিবেচনাধীনের হারও বেশি। উত্তর দিনাজপুরের যে সব বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল বড় ব্যবধানে জিতেছিল, যেমন গোয়ালপোখরে, সেখানে ‘বিবেচনাধীন’ নামের হার সর্বোচ্চ; আর রায়গঞ্জ ও কালিয়াগঞ্জে, যেখানে বিজেপি জয়ী হয়েছিল, সেখানে বিবেচনাধীনের হার সর্বনিম্ন।

এটা ঠিকই যে, পরিসংখ্যান রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে পারে না; তা কেবল দেখাতে পারে যে, গোটা ব্যবস্থার মধ্যে কোনও নির্দিষ্ট নকশা ফুটে উঠছে কি না। এখানে যে নকশাটি উঠে আসছে, তা হল— বিবেচনাধীন ভোটারের হার রাজ্য জুড়ে সমান নয়; এটি ভৌগোলিক ভাবে পুঞ্জীভূত; এবং এটি শুধু আর্থসামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে নয়, পূর্ববর্তী নির্বাচনের ভোট ব্যবধানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একই জেলার ভিতরেও এই সম্পর্ক তৃণমূল-জেতা আসনে দৃশ্যমান, কিন্তু বিজেপি-জেতা আসনে নয়। এই পর্যবেক্ষণগুলি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে— এমন প্রশ্ন, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা কেবল একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এটি নাগরিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি। ভোটাধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার যদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তা হলে কত জন বাদ পড়লেন, প্রশ্ন শুধু সেটা নয়— প্রশ্ন হল কোথায়, কার উপরে, কতটা বেশি ভাবে এই অনিশ্চয়তা নেমে এল। এবং সেই অনিশ্চয়তার দায় কার— প্রান্তিক মানুষের, প্রশাসনিক ব্যর্থতার, না কি এমন কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার, যা সরাসরি দৃশ্যমান নয়?

তথ্য সহায়তা: বাংলা গবেষণা কেন্দ্র

রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, ভার্জিনিয়া টেক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন