উদ্বেগ: এসআইআর-এর শুনানিতে নথি যাচাইয়ের লাইনে অপেক্ষারত সাধারণ মানুষ, ঝাড়গ্রাম, জানুয়ারি ২০২৬।
কথা হচ্ছিল তিন বন্ধুতে। তার পর যা হয়, ঘুরে-ফিরে এই মুহূর্তে বাংলায় সব আলোচনার কেন্দ্র— ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়া, তাতে নাম ‘বাদ যাওয়া’ ও ‘বিচারাধীন’ থাকায় আতঙ্কিত বিপুল মানুষ, তাঁদের উৎকণ্ঠিত দীর্ঘ লাইন ও দিনের শেষে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত ‘ঝুলে থাকা’র কারণে মানসিক ও শারীরিক ক্লেশ/‘হেনস্থা’র কথাও অবশ্যম্ভাবী চলেই এল। সঙ্গে এল এই অভূতপূর্ব ও নিত্যপরিবর্তনশীল নথি দাখিলের নির্দেশে নাজেহাল ভোটার ও ভোটকর্মীদের পক্ষে বাংলার অধিকাংশ (কেন্দ্রবিরোধী) রাজনৈতিক দল ও মঞ্চগুলির এর তীব্র প্রতিবাদে পথে নেমে পড়ার কথাও।
বাদ-পড়া ও বিচারাধীন থাকা ভোটারের সংখ্যা কমবেশি ১ কোটি ২০ লাখ! ১৯৫১-৫২’র প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকে গত লোকসভা (২০২৪) ভোট অবধি, পশ্চিমবঙ্গে এক সঙ্গে এত লোকের নাম বাদ যায়নি। জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রতিটি ভোটের আগে রুটিনমাফিক ভোটার তালিকা সংশোধন করেছে, প্রতি বারই নাম যুক্ত/বিযুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ‘বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন’ও বা ‘এসএসআর’ হয়েছে, মাঝে মাঝেই ‘নিবিড় সংশোধন’ও হয়েছে। কিন্তু কোনও বারই এত জটিল, দীর্ঘসূত্রী তথা নাগরিকত্ব-বিলোপের সম্ভাবনাময় ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও তাতে এত সংখ্যক মানুষের নাম কার্যত বাদ যায়নি। তা ছাড়া নামের বানান, ঠিকানা ও সম্পর্ক নিয়ে গলদের শেষ নেই। শোনা যাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কাজে লাগিয়ে এই তালিকা প্রস্তুত হয়েছে, যাতে ‘হ্যালুসিনেট’ করা বা ‘কাল্পনিক তথ্য’ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাদ-পড়া ভোটারদের আশঙ্কা, এর পর হয়তো তাঁদের অনুপ্রবেশকারী/বাংলাদেশি তকমা দিয়ে সীমান্তের ও-পারে বা ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে।
স্বাভাবিক কারণেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই আন্দোলনে রাজ্য ও কেন্দ্র স্তরে চোখে পড়ার মতো নেমে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানিতে আবেদনকারী হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অংশগ্রহণ করে দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বামপন্থীরাও মামলা লড়েছেন। শেষ পর্যন্ত অন্যান্য বিরোধী দল তথা নানা নাগরিক মঞ্চের নিজের নিজের মতো প্রতিবাদে রাজপথ মুখরিত হয়ে চলেছে। ফলে, বিধানসভা নির্বাচনের নানা রাজনৈতিক বিষয় ছাপিয়ে ‘এসআইআর’ই সব চর্চার আলো টেনে নিয়েছে।
এর কয়েক মাস আগে বিহারে বিধানসভা ভোটের আগেও ৬৫ লাখ নাম বাদ গিয়েছিল, তাতে বহু গরিব, নিম্নবর্গ ও পরিযায়ী শ্রমিক ছিলেন বলে অভিযোগ। তারও প্রতিবাদ হয়েছিল, মামলাও। কিন্তু এই পরিমাণে আইনি ও রাজনৈতিক দশদিশি-জোড়া প্রতিরোধ তথা বিরোধী দলগুলি বনাম নির্বাচন কমিশন তথা কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির মধ্যে প্রতিনিয়ত চাপানউতোরও চলেনি। তিন বন্ধুর আড্ডায় এই সব কথা-পাল্টা কথা চলছিল। হঠাৎ এক বন্ধু বললেন, আমরা যে সব সময় বলি, বাঙালির জীবনে আর কিছু নেই, শুধু রাজনীতি/‘পলিটিক্স’! পলিটিক্সই বাঙালির সব খেল, আর কিচ্ছু হওয়ার নেই। ভেবে দেখো, এই পলিটিক্সের জন্যই কিন্তু বাঙালি এ বার এসআইআর প্রক্রিয়ায় যে নাম-কাটার খেলা চলছিল, তাকে এমন চ্যালেঞ্জ জানাতে পারল। শেষ পর্যন্ত যদি লড়াই করে ‘বিচারাধীন’ তকমা পাওয়া অনেক মানুষের নাম ভোটার হিসেবে ফিরিয়ে আনতে পারে, তাও কিন্তু বাঙালির ওই রাজনীতির জন্যই।
এ কথা শুনে খানিকটা থমকে গেলাম। এমন ভাবে ভাবিনি। সত্যিই, বাঙালি চরিত্রের মধ্যেই এমন একটা তার্কিক ও সব কিছু চ্যালেঞ্জ করার মনোভঙ্গি আছে, বিশেষত কেন্দ্রীয় ভাবে দেওয়া কোনও ‘ফতোয়া’ না-মানার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, যা বাঙালিকে ভারতের অন্যান্য জন/ভাষা গোষ্ঠীগুলির চেয়ে পৃথক করেছে। আদিকাল থেকেই এমনটা চলেছে। যেমন, ঐতরেয় আরণ্যক-এ উল্লিখিত ‘বয়াংসি’ হল প্রাচীন বাংলায় বসবাসকারী একটি অ-আর্য জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়, যাদের আর্যরা ‘পক্ষীজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে খাটো চোখে দেখতেন। এদের মধ্যে চতুর্বর্ণের বিভেদ ছিল না। অতি প্রাচীন ‘আদি যুগ’ থেকে বাংলায় মুসলমান শাসনের প্রবর্তনার কাল অবধি লেখা, নীহাররঞ্জন রায়ের ‘ম্যাগনাম ওপাস’, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) পাঠ করলে স্পষ্ট হয়, শুরু থেকেই বাঙালিদের উত্তর ও মধ্য ভারতের আধিপত্যকামী কেন্দ্রীয় বাচনের সঙ্গে ছিল গ্রহণ-বর্জনের ক্রিটিক্যাল বোঝাপড়া, সনাতন/আর্য ধর্ম-সংস্কৃতি, সমাজনীতি হোক, ভাষা বা রাজনীতি, সর্বত্রই। বাঙালি খুব শিথিল ভাবে এই সব কেন্দ্রীয় আখ্যান গ্রহণ করলেও তার নিজস্বতা ছাড়েনি। কারণ অনেকটাই ভৌগোলিক— উত্তর ও মধ্য ভারতের সনাতন/আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি থেকে বাংলার দূরত্ব ও নানা কৌমে বিভক্ত অঞ্চলগুলির (বিশেষত, পূর্ববঙ্গীয় ‘বঙ্গ’, ‘সমতট’-এর) দুর্গমতা। ফলে, আর্যাবর্তের সনাতন সংস্কৃতি কখনওই বাংলার বহুত্ববাদী অথচ সমন্বয়ী সংস্কৃতিতে বড় একটা দাঁত ফোটাতে পারেনি।
বঙ্গ কৌমজীবনের এই লোকায়ত ধর্ম-সংস্কৃতিতেও আর্যবাদী প্রভুত্বের রক্ষণশীল বড় আখ্যান, বা ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ বার বার হোঁচট খেয়েছে। আর্য ভারতের প্রাচীন/সনাতনকে আঁকড়ে ধরা ধর্মীয় ভাষ্যের বিপরীতে বাংলায় লোকায়ত ঐতিহ্যে মিশেছে মহাযানী বৌদ্ধধর্মের নানা শাখার সমন্বয়ী/‘সিনক্রেটিক’ প্রভাব। এটাই গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের ভিত্তি। সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিও অবশ্য তার অস্তিত্ব হারায়নি, তা সীমাবদ্ধ ছিল অল্পসংখ্যক ব্রাহ্মণাদি উচ্চবর্ণের মধ্যে। বিপরীতে ছিল বিপুল সংখ্যক নিম্নবর্গের মানুষ, যাঁরা একটি শিথিল ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির মধ্যে বাস করলেও, নিজস্ব ধর্ম (লোকায়ত দেবদেবীর পুজো-পার্বণ) ও সমাজনীতি (বিবাহ, খাদ্যাখাদ্য প্রভৃতি বিষয়ে) বজায় রেখেছেন। ফলে, সনাতন সংস্কৃতিতে যেমন অধিকাংশ বাঙালির অরুচি, তেমনই বাঙালির হিঁদুয়ানিতেও আর্যাবর্তের দারুণ অবিশ্বাস। সে যুগ থেকে হাল আমল, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।
সম্প্রদায়গত অন্তর্ভুক্তি ও সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও বাঙালি অনেক বেশি উদার ও সমন্বয়বাদী, আর্যাবর্তের মতো চারিদিকে নিষেধের বেড়াজাল তোলেনি। ফলে, আদি পর্বের শেষে বাংলায় মুসলিম শাসন চালু হলে, প্রাথমিক দ্বন্দ্ব-বিরোধ পার হয়ে, দুই পক্ষের মধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের একটা অলিখিত রফা হয়েছিল। এটা সম্ভব হয়েছিল, কারণ, বাংলার অধিকাংশ মুসলমান ‘বাইরে’ থেকে আসেনি— বেশির ভাগই পূর্বতন হিন্দু বা বৌদ্ধ সমাজের নিম্নবর্গভুক্ত। ধর্ম পরিবর্তনের পরও অনেক দিন অবধি বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি, এমনকি লোকাচারের নানা চিহ্ন অবধি বর্জন করেনি। এর পর যখন ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকের হাত ঘুরে পশ্চিমি জ্ঞানবিজ্ঞান-চর্চার যুক্তিবাদী আন্দোলন, ‘আলোকায়ন’-এর বাণী এ দেশে পৌঁছেছে, তখন গোড়ায় বাঙালির চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও, পরে মুগ্ধতার ঘোর কেটে গেলে, ব্রিটিশ শাসন-বিরোধী প্রতিবাদ ও প্রতিরোধেও বাঙালিরা অগ্রগামী। তাই বিশ শতকের গোড়ায় কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব বাঙালি ব্রিটিশদের চোখ রাঙানিতেও মানেনি— রুখে দিয়েছে। এর জন্য বড় মূল্য চোকাতে হয়েছে— দেশের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি স্থানান্তরিত হয়েছে, যার আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষতির কথা ভাবার হিসাবি, শীতল মস্তিষ্ক বাঙালির যৌথসত্তায় ছিল না।
বঙ্গভঙ্গ থেকেই যে বিপ্লবী স্বদেশিয়ানার সূত্রপাত, তাতেও ফাঁসির মঞ্চে জীবন বলি দিয়ে কত ‘তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে’! মূলধারার রাজনীতিতেও চিত্তরঞ্জন দাশ থেকে সুভাষচন্দ্র বসু কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক আধিপত্যের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেননি। অন্য দিকে, বঙ্গভঙ্গের পর থেকে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের ভিত্তিতে চিড় ধরল, যার বিষবাষ্পে, তীব্র সাম্প্রদায়িক হানাহানির আবহাওয়ায় ভারত তথা বাংলা ভাগ হল। কিন্তু ‘ধর্ম’-এর ভিত্তিতে বাংলা ভেঙে পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলেও, মানুষের মন থেকে বাংলা ভাষা ও বাঙালিয়ানা মুছে গেল না, বরং, পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুকেই ‘একমাত্র’ ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার আবহাওয়ায় একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) ঢাকার রাজপথ প্রতিবাদী শহিদদের রক্তে লাল হল। সেটাই মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীন বাংলাদেশ (১৯৭১) গড়ার প্রস্থান-বিন্দু। এ-পারেও, দেশভাগের পর উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন-সহ অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পিছনে ছিল বামপন্থীদের পথঘাটের লড়াই। আবার, দেশভাগের আগে-পরের ‘তেভাগা’ থেকে সাম্প্রতিক সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কৃষিজমি রক্ষার লড়াইয়েও বাঙালি বাণিজ্যিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করেনি, হৃদয়ের ডাকে আন্দোলনের মাঠে নেমেছে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে জানা নেই, কিন্তু এই বিপন্ন বেলায়, বাঙালির অস্তিত্ব যখন নতুন করে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, তখন হয়তো বাঙালির চিরায়ত প্রতিস্পর্ধী রাজনীতিই আবার নতুন করে পথ দেখাবে— যদি কবির মতো দলমত-নির্বিশেষে সবাই ভাবতে পারি, ‘আয় আরো হাতে হাত রেখে/আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’।
অ্যাডামাস ইউনিভার্সিটি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে