যৌথ: ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। জানুয়ারি ২০২৬, নয়াদিল্লি। ছবি: রয়টার্স।
সম্প্রতি ভারত সরকার বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক সংযুক্তির ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে। এ বছর জানুয়ারিতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ঘোষিত হয়েছে। একই সময়ে চিলি, পেরু এবং ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া (২০২২), ব্রিটেন (২০২৫) এবং নিউ জ়িল্যান্ডের (২০২৫) সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে, বিশেষত ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে চড়া শুল্কের হার, এবং অপেক্ষাকৃত অন্তর্মুখী বাণিজ্য নীতির পর্ব চলছিল। নীতিনির্ধারকেরা এখন স্পষ্ট ভাবে স্বীকার করছেন যে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক রফতানির ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে। তবে এটিও সমান ভাবে সত্য যে, বাণিজ্য চুক্তি কোনও জাদুমন্ত্র নয়। সুযোগ তৈরি করা এবং সেই সুযোগ থেকে ফল পাওয়া— এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। চুক্তিগুলি থেকে সুফল পেতে হলে সুসংহত কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তিটি সরকারের আত্মবিশ্বাসেরই পরিচায়ক— ভারতীয় সংস্থাগুলি বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী ভাবে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম বলে নীতিনির্ধারকেরা বিশ্বাস করছেন। এই আত্মবিশ্বাসের উৎস একাধিক। প্রথমত, ভারতের বৈশ্বিক উপস্থিতি প্রসারিত করার এখনও বিপুল অবকাশ রয়েছে। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী পণ্য রফতানিতে ভারতের অংশ দুই শতাংশেরও কম। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বৃহত্তর কাঠামোগত রূপান্তর ঘটছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ক্রমশ চিনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস খুঁজছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় সংস্থাগুলি বৈচিত্রের প্রয়োজনে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের সন্ধান করছে। এখানে ভারতের বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এক দিকে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নীচে; আর অন্য দিকে, উৎপাদন ক্ষেত্রে ভারতের সম্ভাবনার বড় অংশ এখনও অব্যবহৃত— এই দুই বৈশিষ্ট্য ভারতকে একটি স্বাভাবিক বিকল্প গন্তব্যে পরিণত করতে পারে।
তা ছাড়াও, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থেকে যে নতুন সুযোগ তৈরি হয়, তা-ও সরকারকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে ২৭টি দেশের ৪৫ কোটি উপভোক্তার কাছে ভারতীয় রফতানিকারীদের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার মিলবে— যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ বাজার। জামাকাপড়, চামড়ার জিনিসপত্র, জুতো, রত্ন ও গয়না এবং ওষুধশিল্পের মতো শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রে রফতানি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সব মিলিয়ে, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিগুলি কার্যকর হলে তা ভারতে বিপুল নতুন কর্মসংস্থান করতে পারে।
তবে, এই চুক্তি থেকে লাভবান হতে হলে ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতিতে সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষত সুরক্ষাবাদী বাধা দূর করা প্রয়োজন। তিনটি ক্ষেত্রে সংস্কার বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এক, ভারতের বাণিজ্য নীতির কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। মধ্যবর্তী পণ্যের উপর উচ্চ শুল্ক বজায় থাকলে রফতানি প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে না। প্রয়োজনীয় উপাদানের দাম বেশি থাকলে ভারতীয় সংস্থাগুলি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় নামতে হলে ভারতীয় উৎপাদক সংস্থাগুলির যা প্রয়োজন, তা হল— কম খরচে উৎপাদনের উপাদান পাওয়ার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা, দ্রুত ও স্বচ্ছ শুল্ক প্রক্রিয়া, এবং সরলতর নিয়মবিধি। সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় বাজেটে অধিকাংশ আমদানি শুল্ক অপরিবর্তিত থাকায় শুল্কের প্রয়োজনীয় যুক্তিসঙ্গত পুনর্বিন্যাস হয়নি। পাশাপাশি, ভারতের উচিত তার কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার (কিউসিও), অর্থাৎ গুণমান নিয়ন্ত্রণ আদেশের নীতিটি পুনর্বিবেচনা করা— এই নীতিটি আমদানির পথে কার্যত বাধা হিসাবে কাজ করে। কয়েকটি কিউসিও প্রত্যাহার করা হলেও সাতশোরও বেশি আদেশ এখনও বহাল রয়েছে, যার ফলে জোগান-শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে, এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
দুই, নিশ্চিত করতে হবে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে সেখানকার সংস্থাগুলি ভারতের বাজারে আগ্রহী হচ্ছে, তাদের প্রযুক্তি এ দেশে আনছে, এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ দেশে বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করছে। এই চুক্তিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ খামতি রয়েছে— পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির অনুপস্থিতি। উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। বিনিয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়ে যে সমান্তরাল আলোচনা চলছে, তার অগ্রগতিও সীমিত। এর ফলে ইউরোপীয় সংস্থাগুলির কাছে ভারতে লগ্নি করার তাগিদ কমতে পারে— বিশেষত মনে রাখতে হবে যে, অন্য অনেক দেশ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতিমধ্যেই শুল্ক এবং লগ্নির বিষয়ে তাদের অনেক আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে।
২০১৫ সাল থেকে ভারত একতরফা ভাবে ৭৭টি দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি বাতিল করে— যার ফলে, কোনও ভারতীয় সংস্থা বা ভারত সরকারের সঙ্গে বিবাদে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিকল্প অস্ত্রের সংখ্যা সীমিত হয়ে পড়ে। ২০১৬ সালে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি (বাইল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট ট্রিটি, বা বিআইটি)-র একটি নতুন মডেল প্রবর্তিত হয়, যাতে বলা হয় যে, কোনও বিবাদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তির পথে হাঁটার আগে অন্তত পাঁচ বছর ভারতীয় আইন ব্যবস্থা অনুসারে প্রতিকারের চেষ্টা করতে হবে। অধিকাংশ দেশই এই শর্ত মানতে নারাজ। ফলে, বেশির ভাগ বড় বৈশ্বিক সংস্থাই ভারতে দীর্ঘকালীন লগ্নি করার ব্যাপারে ইতস্তত করছে। এর ফলাফলও প্রকট— ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে নেট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ কোটি ডলারে, যা নজিরবিহীন ভাবে কম। কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো না থাকলে ইউরোপীয় সংস্থাগুলি বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ রফতানি-ভিত্তিক মডেল, অথবা এ দেশে শুধুমাত্র শেষ ধাপের কাজটুকু করার সিদ্ধান্ত করতে পারে। ভারতে ধারাবাহিক ভাবে বিদেশি পুঁজি আনতে চাইলে বিআইটি ফ্রেমওয়ার্কের সংস্কার করতেই হবে।
তিন, ভারতকে নিয়মভিত্তিক বৃহৎ বহুপাক্ষিক বা আঞ্চলিক বাণিজ্য গোষ্ঠীতে যোগদানের প্রশ্নটিকেও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। যেমন, কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (সিপিটিপিপি)। এই ধরনের চুক্তি কেবল শুল্ক হ্রাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শ্রম আইন, মেধাস্বত্ব, নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতা নীতিতে উচ্চতর মানদণ্ড গড়ে রেখেছে— যে ক্ষেত্রগুলিতে ভারতের সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সে পথে প্রবলতম বাধার নাম অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে গতিশীল করতে পারে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চিনের অন্তর্ভুক্তি তার অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে ত্বরান্বিত করেছিল। উচ্চমানসম্পন্ন আঞ্চলিক চুক্তিতে যোগদান ভারতের নীতির স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি দিশা সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দেবে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে।
ভারত এমন এক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা করছে, যা এখনও চিনের শক্তিশালী উৎপাদন ক্ষমতা এবং সুসংহত জোগান-শৃঙ্খল দ্বারা প্রভাবিত। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু, এটি যেন এক বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হয়, সংস্কারের সমাপ্তি নয়। এর জন্যই প্রয়োজন ধারাবাহিক ও সুসংহত মুক্ত বাণিজ্য নীতি। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমদানিকৃত কাঁচামাল, উপাদান এবং যন্ত্রপাতির উপর শুল্ক হ্রাস, বাণিজ্যবিধির সরলীকরণ, বিনিয়োগের মজবুততর সুরক্ষা এবং গভীর কাঠামোগত সংস্কার— এই সব কিছুর সমন্বয় জরুরি।
বৈশ্বিক জোগানশৃঙ্খলের চরিত্র পাল্টাচ্ছে। ভারতের সামনে সেই মঞ্চে সফল হওয়ার সুযোগ আছে কি না, প্রশ্ন আদৌ তা নয়; প্রশ্ন হল, ভারত যথেষ্ট দ্রুত, স্থির ও দৃঢ় ভাবে এগোতে পারবে কি না।
অর্থনীতি বিভাগ, ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট রিসার্চ
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে