হয়রানি: ডালহৌসি স্কোয়্যারে নির্বাচন কমিশনের অফিসের সামনে বিএলও-দের বিক্ষোভ। ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
পাঁচ বছর আগে বা পনেরো বছর আগে যেমন ছিলেন, এখন কি তার থেকে ভাল অবস্থায় রয়েছেন? না কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে?— নির্বাচনের আগে রাজনীতিকরা ভোটারদের সামনে এই প্রশ্নটা ছুড়ে দেন।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যখন বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে যাবেন, সে সময় তাঁদের সামনেও এই প্রশ্নটাই থাকার কথা। বাম জমানার তুলনায় গত পনেরো বছরে রাজ্যের হাল কি ভাল হয়েছে? না কি গত পনেরো বছরে রাজ্যের হাল আরও খারাপ হয়েছে? বাস্তবে ভোটাররা কি সত্যিই পাঁচ বা পনেরো বছরের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতি তুলনা করে ভোট দেন?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লেনজ় গবেষণা করে জানিয়েছেন, ভোটাররা আসলে ভেবে দেখেন, ছয় মাস আগে কেমন ছিলাম, এখন কেমন রয়েছি! যার অর্থ হল, মোটামুটি ভাবে ভোটের আগের ছয় মাসের হালচালের ভিত্তিতেই মানুষ ভোট দিয়ে থাকেন। এ দেশে অনেক রাজনীতিক মনে করেন, আসলে ছয় মাসও নয়। ভোটারদের স্মৃতিতে শেষ দু’তিন মাসে কী ঘটেছে, সেটাই থেকে যায়। তার আগে কী হয়েছে, কোন নেতা দুর্নীতির দায়ে জেলে গিয়েছিলেন, কে কত বার দল বদলেছিলেন, কোন সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে কত হেনস্থা হয়েছিল, এত সব মানুষের মনে থাকে না। মানুষ এমনিতেই ক্ষমাশীল মনে পুরনো ঘটনা ভুলে গিয়ে এগিয়ে চলেন। তার সঙ্গে রাজনীতিকরাও পুরনো ঘটনা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই খেলায় যে নেতা যত দক্ষ, তিনি তত সফল। অধুনা সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেখানে কোনও খবর ২৪ ঘণ্টাও স্থায়ী হয় না, সেখানে ভোটারদের মগজেও প্রতি দিন পুরনো ঘটনা ‘ডিলিট’ হয়ে গিয়ে নতুন স্মৃতি ‘রিফ্রেশ’ হতে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হল, রাজ্য জুড়ে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর ফলে যে মানুষের হয়রানি চলছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, মানুষ কি তার ভিত্তিতেই ভোট দেবেন? এই হয়রানি, আতঙ্কই মানুষ মনে রাখবেন? তার আগে তৃণমূলের যাবতীয় দুর্নীতি-অপশাসন ভুলে যাবেন? না কি এসআইআর-হয়রানিও ভোটের মধ্যে স্মৃতির পিছনে চলে যাবে?
বছর দশেক পিছিয়ে যাওয়া যাক। ২০১৬-র নভেম্বর। নোট বাতিল। এখন যেমন রাজ্যের মানুষকে শুনানি কেন্দ্রের সামনে লাইন দিতে হচ্ছে, সে সময় ঠিক একই ভাবে গোটা দেশের মানুষকে পুরনো নোট হাতে ব্যাঙ্কের সামনে লাইন দিতে হয়েছিল। এখন যেমন নির্বাচন কমিশনের নিত্যদিন নিয়ম করছে, সে সময় অর্থ মন্ত্রকও রোজ নিয়ম বদল করছিল। এখন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা ছাড়াই এসআইআর শুরু করে দেওয়ার অভিযোগ। নোট বাতিলের সময়ও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, নরেন্দ্র মোদী আগুপিছু না ভেবেই পাঁচশো ও এক হাজার টাকার নোট বাতিল করেছেন।
ভোটে তার কী প্রভাব পড়েছিল? নোট বাতিলের পরের এক বছরে সাতটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল। ২০১৭-র গোড়ায় পঞ্জাবের বিধানসভা নির্বাচনে শিরোমণি অকালি দল-বিজেপির জোট সরকারকে হারিয়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তার পরে গোয়া, উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, মণিপুর, হিমাচল প্রদেশ এবং গুজরাত, প্রতিটি রাজ্যে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছিল। নোট বাতিলের কোনও প্রভাব উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্যেও চোখে পড়েনি।
সদ্য বিহারের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। বিহারে ভোটের আগেও রাজ্যে এসআইআর হয়েছিল। সেখানেও মানুষের কম হেনস্থা হয়নি। হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে কাজকর্ম ছেড়ে বিহারে ফিরতে হয়েছিল। শুধুমাত্র এসআইআর-এর জন্য। অগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন বিহারে এসআইআর-এর কাজ চলছে, তখন মানুষের ক্ষোভ চরমে। রাহুল গান্ধী-তেজস্বী যাদব ভোটার অধিকার যাত্রায় বেরিয়ে বিপুল সাড়া পেয়েছিলেন। কিন্তু মাস দুয়েক পরে যখন বিহারে ভোট হচ্ছে, তখন এসআইআর ভোটের ময়দান থেকে ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গিয়েছিল। কোনও হয়রানির কথা মানুষের মনে ছিল না। বিহার তখন নীতীশ কুমারের মহিলাদের জন্য ১০ হাজার টাকার উপহার নিয়ে মশগুল।
এর একটা উল্টো তত্ত্বও রয়েছে। তা হল, কোনও দল যদি গোটা রাজত্ব কালে খুবই খারাপ ভাবে সরকার চালিয়ে থাকে, তা হলে মানুষের মনে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েই যায়। ভোটের আগের ছয় মাসে যা-ই হোক, তাতে খুব একটা ফারাক পড়ে না। তা ছাড়া ভোটের পরে সরকার বদল হলে হাল বদলে যাবে বলে আশা জাগানো গেলে, ভোটের আগের ছয় মাসে কী হল না হল, তা গুরুত্ব পায় না।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত ভাবে এখন এই উল্টো তত্ত্বেই বিশ্বাস রাখতে চাইছেন। তাঁরা নিশ্চিত ভাবে আশা করবেন, গত পনেরো বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের বেহাল দশা ও দুর্নীতি-অপশাসনের জেরে রাজ্যের মানুষের মনে একটা বিরক্তি তৈরি হয়েই গিয়েছে। সেই বিরক্তির চোরাস্রোত থাকবে। তার ভিত্তিতেই মানুষ চুপচাপ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। তার সঙ্গে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে শিল্প আসবে, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের উপহার হিসেবে রাজ্যে নানা প্রকল্প আসবে বলে আশা তৈরি করা হলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের ভোট পদ্মফুলেই পড়বে।
তা না হলে অবশ্য বিজেপির জন্য যথেষ্ট চিন্তার কারণ রয়েছে। কারণ ভোটের আগের ছয় মাসে বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে অপশাসনের অস্ত্রে শাণ দেওয়ার বদলে নিজেই তৃণমূলের হাতে একের পর এক অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। প্রথমে বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী শ্রমিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে ধরপাকড়, বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ উল্লেখ করে দিল্লি পুলিশের চিঠির জেরে বিজেপি যে ‘বাংলা-বিরোধী’ নয়, তার ব্যাখ্যাতেই শমীক ভট্টাচার্যরা ব্যস্ত থেকেছেন।তার পর এসআইআর-এর জেরে মানুষের হয়রানি নিয়েও বিজেপির শাঁখের করাত দশা। অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে বলে গোড়ায় এসআইআর-এর পক্ষে সওয়াল করলেও বিজেপি নেতারা মানুষের হয়রানির প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দাঁড়াতে পারছেন না। আবার অমিত শাহের আস্থাভাজন বলে পরিচিত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মুখও খুলতে পারছেন না। হয়তো তাঁরা মনে মনে প্রার্থনা করছেন, ফেব্রুয়ারিতে এসআইআর-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে বিহারের মতোই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হয়রানির কথা ভুলে যাবেন। তবে এ নিয়ে তাঁরা একেবারেই নিশ্চিত নন।
হয়তো সেই কারণেই দিল্লির রাজনীতির করিডরে এখন নানা গুজব ঘুরপাক খাচ্ছে। এই গুজবের মধ্যে একটি হল, হিংসা-অশান্তি, রাজ্য সরকারের বাধা, প্রশাসনিক সমস্যার জেরে এসআইআর-এর কাজ শেষ করতে না পারার যুক্তি দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে ছয় মাস পরে বিধানসভা নির্বাচন হবে। তত দিনে মানুষ এসআইআর নিয়ে হয়রানির কথা ভুলে যাবেন। সর্বোপরি, রাষ্ট্রপতি শাসনে বিধানসভা নির্বাচন হলে তৃণমূলের পক্ষে পেশিশক্তির জোরে ভোটে জেতা সম্ভব হবে না। এই গুজব অবশ্য অনেকেই উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, বিজেপি এতখানি রাজনৈতিক ঝুঁকি নেবে না। কারণ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা হলে তিনি আরও আগ্রাসী হয়ে ময়দানে নেমে পড়বেন। তখন তাঁর নিজের সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান দেওয়ারও দায় থাকবে না। বিজেপির বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের অভিযোগই তাঁর প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠবে।
গুজবের কথা থাক। ধরে নেওয়া যাক, মার্চ-এপ্রিলে নির্দিষ্ট সময়েই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হবে। সে ক্ষেত্রে এই নির্বাচন কে ভোটারদের কতখানি ভুলিয়ে দিতে পারেন, তার লড়াই হয়ে উঠবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিশ্চিত ভাবে চাইবেন, তাঁর রাজত্বে দুর্নীতি-অপশাসনের যাবতীয় অভিযোগ ভুলিয়ে দিয়ে মানুষের মনে যেন শুধু এসআইআর-এর হয়রানির স্মৃতিই থেকে যায়। বিজেপি চাইবে, এসআইআর-এর হয়রানির টাটকা স্মৃতি মুছিয়ে দিয়ে গত পনেরো বছরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কী মনে রাখবেন, কী ভুলে যাবেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তাতেই চূড়ান্ত ফয়সালা হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে