Women Rights

অধিকার বনাম ধর্ম-রাজনীতি

নিজের শরীরের উপর মেয়েদের অধিকারের ধারণাই কি এতে আক্রান্ত হল না? এর সঙ্গে জড়িয়ে ধর্ম-পরিচয়-পছন্দের জটিল রাজনীতিও।

দেবশ্রী সরকার

শেষ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:৩৭
Share:

গত ডিসেম্বরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এক মুসলিম মহিলা ডাক্তারের নিকাব হাত দিয়ে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় রাজনীতি উত্তপ্ত হয়েছিল। বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের ক্ষোভের মধ্যেই নীতীশের সমর্থনে অনেকের মুসলিমবিদ্বেষী ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য উস্কে দিয়েছে পুরনো বিতর্ক— নারীর শরীর ও পোশাকে তাঁর অধিকার। আশ্চর্য, ঘটনার সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষই ‘নারীর ইচ্ছা’য় না গিয়ে জোর দিচ্ছেন বিভাজনের রাজনীতিতে। এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতীশের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, ভারতে আইনের শাসন চলে, এটা ইসলামি রাষ্ট্র নয়, নীতীশ ‘অভিভাবকের মতো’ কাজ করেছেন। ঘটনার পরে ওই চিকিৎসকের চাকরি প্রত্যাখ্যান প্রসঙ্গে তাঁর জবাব, সে চাকরি প্রত্যাখ্যান করুক বা জাহান্নমে যাক, তার নিজস্ব ব্যাপার। এঁরা বোঝেননি, এক জন মহিলা ঘোমটা দেবেন না কি হিজাব পরবেন, সেও তাঁর ‘নিজস্ব ব্যাপার’।

নিজের শরীরের উপর মেয়েদের অধিকারের ধারণাই কি এতে আক্রান্ত হল না? এর সঙ্গে জড়িয়ে ধর্ম-পরিচয়-পছন্দের জটিল রাজনীতিও। ২০২২-এ কর্নাটকের এক সরকারি কলেজে হিজাব পরার কারণে ছ’জন ছাত্রীকে ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, সেই ঘটনাও এক তীব্র বিভাজনের রাজনীতি সৃষ্টি করে। কিছু হিন্দু ছাত্রছাত্রী গেরুয়া শাল জড়িয়ে ক্লাসে আসতে শুরু করে। হিন্দুত্ববাদী এবিভিপি বা ইসলামি ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাস ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া উভয়েই উস্কানিমূলক বিবৃতি দিতে থাকে। কর্নাটক সরকার স্কুল-কলেজ সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়ে। সেখানকার এক বেসরকারি কলেজে শিক্ষারত রশ্মিতা শেঠী বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কর্নাটকে তখন ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতাদের উস্কানিমূলক বিবৃতির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন: তাঁদের কেউ বলেছেন হিজাব পরতে চাইলে পাকিস্তানে চলে যেতে, কেউ বলেছেন কলেজে হিজাবের বিরোধিতা প্রয়োজন যাতে রাজ্যটা ‘তালিবানি’ না-হয়ে যায়।

কর্নাটক হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, ইসলামে হিজাব বাধ্যতামূলক নয় তাই হিজাব নিষিদ্ধকরণ সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে না, বরং তা জনপরিসরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একটা যুক্তিসঙ্গত নিষেধাজ্ঞা। অথচ ২০১৬-য় এক সরকারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের হিজাব পরাকে পোশাকবিধির কারণে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আমনা বিন্ত বশীরের করা মামলায় কেরল হাই কোর্ট হিজাব পরাকে অপরিহার্য ধর্মীয় প্রথা বলে রায় দেয়, হিজাবে বিশেষ ছাড় দেয়। কর্নাটক হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে দুই বিচারকের বেঞ্চ ছিলেন দ্বিধাবিভক্ত। ২০২৩-এর ডিসেম্বরে কর্নাটকের নবনির্বাচিত কংগ্রেস সরকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাবের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া বলেন, খাদ্য ও পোশাকের পছন্দ ব্যক্তির নিজস্ব, সেখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপ অবাঞ্ছিত।

আইনের মারপ্যাঁচ তো ভারতে আছেই। আর আছে এমন এক পরিবেশ, যেখানে এক ভারতীয় সংখ্যালঘু নারীর নিজ পোশাক ও শরীরের উপর অধিকার খণ্ডিত হয় রাজনৈতিক তরজায়। সুকৌশলে চাপা দেওয়া হয় নারীদেহের উপর আক্রমণ। নীতীশ বিনা অনুমতিতে এক মহিলার গায়ে হাত দিয়েছেন; তাঁর স্বেচ্ছায় পরা একটি পোশাকে— যা তাঁর বিশ্বাস ও পরিচয়ের অঙ্গ— আঘাত হেনেছেন। এ কাজ যে কোনও সভ্য দেশেই অনভিপ্রেত, শাস্তিযোগ্য। অথচ ঘটনার সমর্থকরা হিজাব পরার সঙ্গে তুলনা টানছেন তালিবানি শাসনের। তালিবানদের দেশে মেয়েদের বেশির ভাগ মৌলিক অধিকারই অসুরক্ষিত, বোরখা সেখানে নারীর পছন্দের সঙ্গে জড়িত নয়। কিন্তু ভারতে সংবিধান অনুসারে নারীরাও ধর্ম-নির্বিশেষে সমস্ত মৌলিক অধিকারের অংশীদার।

গত অক্টোবরে দিল্লিতে আফগানিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনে কোনও নারী সাংবাদিককে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে এক কিশোরীর ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সিংহ সেঙ্গারের জামিন গত ২৩ ডিসেম্বর দিল্লি হাই কোর্ট শর্তসাপেক্ষে মঞ্জুর করে। সেঙ্গার শুধু ধর্ষণেই অভিযুক্ত নন, ধর্ষিতার বাবার পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর মামলায় কারাদণ্ডেও দণ্ডিত। ২০১৯-এ অভিযোগকারিণী তাঁর পরিবারের দুই সদস্য ও উকিলকে নিয়ে রায়বরেলী যাওয়ার সময় ট্রাকের ধাক্কায় অভিযোগকারিণী ছাড়া কেউ প্রাণে বাঁচেননি। ২৯ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট পূর্বোক্ত রায় খারিজ করে, কিন্তু সেঙ্গারের মুক্তির দাবিতে তাঁর সমর্থকদের বিক্ষোভ তুলে ধরে এক অন্ধকার বাস্তব: পিতৃতন্ত্র সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতি মিলেমিশে মেয়েদের উপর দমননীতি চালিয়ে যাওয়া।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী যে নারীর প্রতি অসম্মানসূচক আচরণ করেছেন, তাঁর দল বা জোটসঙ্গী বিজেপি তা এড়িয়ে যাচ্ছে। এনসিপি (শরদ পওয়ার) নেত্রী ফৌজ়িয়া খান বলেছেন, এক জন মহিলা জনসমক্ষে নিজের দেহ কতটা ঢেকে রাখবেন, মুখ ঢেকে রাখবেন কি না সেটা তাঁর সিদ্ধান্ত; জোর করে তাঁর পোশাক সরিয়ে দেওয়া ধিক্কারযোগ্য। জনসমক্ষে এক জন মহিলার পরনের কাপড় খুলে ফেলার ঘটনা কি নিছক ধর্মীয় বিষয়? না কি তা ধর্মীয় উন্মাদনা কাজে লাগিয়ে শ্লীলতাহানির দায় এড়ানোর চেষ্টা?

গবেষক, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন