এই বাজেট পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে
West Bengal Budget 2026

নতুন আশার চৌকাঠে

ভাতা প্রয়োজন, কিন্তু তার লক্ষ্য সুস্পষ্ট হতে হয়। উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত না হলে ভাতা শেষ পর্যন্ত রাজকোষের উপর চাপ বাড়ায়, কিন্তু অর্থনীতিকে সচল করতে পারে না।

চিরদীপ মজুমদার

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:১৭
Share:

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির গতিপথ বদলানোর প্রকৃত সুযোগ এনে দিয়েছে এ বারের রাজ্য বাজেট— দীর্ঘ দিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা অর্থনীতিকে নতুন পথে চালিত করার প্রথম প্রচেষ্টা। এই বাজেটকে বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে নতুন সরকার কী ধরনের অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ২০১১-১২ সালে সমগ্র ভারতের শিল্প উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের অংশ ছিল ৭.১%। ২০২৪-২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৭.৩%। পনেরো বছরে দেশের শিল্প অর্থনীতির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ কার্যত নিজের অবস্থানেই স্থির থেকেছে। অর্থাৎ শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। মাথাপিছু নিট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের নিরিখে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য, হিমালয় সংলগ্ন রাজ্য, গোয়া ও গুজরাত বাদ দিয়ে যে ১৬টি প্রধান রাজ্যের তথ্য ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক প্রকাশ করেছে, সেখানে ২০১১-১২ এবং ২০২৪-২৫— দুই সময়েই পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ১১টি রাজ্য। দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে আটকে থাকা সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ছবিটা আশাব্যঞ্জক নয়। গ্রামাঞ্চলে ২০০৯-১০ সালে প্রতি হাজার জনে ১৯ জন দীর্ঘ সময় কাজ পেতেন না। ২০২৩-২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৩। শহরাঞ্চলে কিছু উন্নতি হলেও তা অর্থনীতিতে গতি আনার মতো নয়। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও শিশুমৃত্যু ও প্রসূতিমৃত্যুর মতো সূচকে পশ্চিমবঙ্গ বহু রাজ্যের চেয়ে পিছিয়ে।

এই অবস্থার জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রতিকূলতাকে দায়ী করলে ভুল হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ সংঘাত, প্রয়োজনীয় হিসাব না দেওয়ার অভিযোগে কেন্দ্রীয় অর্থ আটকে যাওয়া, উৎপাদনশীল খাতের বদলে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়ের অগ্রাধিকার— সব মিলিয়ে রাজ্যের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে অর্থনীতি ক্রমশ ভারাক্রান্ত হয়েছে। এই সময়কালে সরকারি নীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছিল ভাতা; কর্মসংস্থান নয়। সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভাতা অর্থনৈতিক বিকাশের বিকল্প হতে পারে না। বরং প্রশ্ন হল, এই বিপুল ব্যয় মানুষের জীবনমানের মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে কি?

জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে সারা ভারতে যেখানে ২০.১% জানিয়েছেন যে, তাঁদের অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে সেই হার ৩৬.৪%। আবার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি মেয়েদের মধ্যে মা হয়েছেন বা সন্তানসম্ভবা— এমন উত্তরদাতার হার সারা ভারতে ৬.৭% হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা ১৬.৬%। কন্যাশ্রীর টাকা ব্যাঙ্কে পৌঁছেছে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে সামাজিক পরিবর্তন পৌঁছয়নি। কম বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্ব কিংবা শিক্ষার মাঝপথে ছিটকে পড়ার প্রবণতা রয়ে গিয়েছে। এর একটি কারণ নিশ্চয়ই কর্মসংস্থানের অভাব। উচ্চশিক্ষার শেষে যখন কাজের নিশ্চয়তা নেই, তখন বহু পরিবারে মেয়েদের বিয়েই নিরাপদ বিকল্প বলে মনে হয়।

ভাতা প্রয়োজন, কিন্তু তার লক্ষ্য সুস্পষ্ট হতে হয়। উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত না হলে ভাতা শেষ পর্যন্ত রাজকোষের উপর চাপ বাড়ায়, কিন্তু অর্থনীতিকে সচল করতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থার অবনতির পিছনে এই নীতিগত ভারসাম্যহীনতার ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন।

এই প্রেক্ষাপটেই এ বারের বাজেটকে বিচার করা প্রয়োজন। বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কোনও নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়; বরং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। নতুন সরকার এক দিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলি বজায় রাখার আশ্বাস দিয়েছে, অন্য দিকে স্পষ্ট করেছে যে, শিল্প, পরিকাঠামো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সরকারি ব্যয়ও বাড়ানো হবে। এই ভারসাম্য বজায় রাখাটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কোনও সরকারই কেবল সদিচ্ছার জোরে শিল্পায়ন করতে পারে না। লগ্নিকারীদের আকৃষ্ট করতে পরিকাঠামো উন্নয়ন, জমি, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক উৎসাহ প্রয়োজন। এগুলির প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজন অর্থ। সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটাই রাজ্যের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। নতুন সরকারের ক্ষেত্রে অবশ্য কয়েকটি সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটেছে। যে সমস্ত কেন্দ্রীয় প্রাপ্য এত দিন নানা কারণে আটকে ছিল, তার অন্তত একটি বড় অংশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির সঙ্গে সমন্বয় ঘটলে রাজ্যের নিজস্ব ব্যয়ের কিছু অংশ সাশ্রয় হতে পারে। আয়ুষ্মান ভারতের মতো প্রকল্প চালু হলে স্বাস্থ্যখাতে রাজ্যের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। তৃতীয়ত, নতুন সরকার ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের কাছে বিশেষ আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। তার একটি অংশ মিললেও রাজকোষ কিছুটা স্বস্তি পাবে।

তবে এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সংযম প্রয়োজন। অতীতে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল উৎপাদনশীল বিনিয়োগের তুলনায় রাজস্ব ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। সরকারি কর্মসূচি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই ব্যয় যদি দীর্ঘমেয়াদে আয় সৃষ্টির ক্ষমতা তৈরি না করে, তা হলে শেষ পর্যন্ত ঋণের বোঝাই বাড়ে। রাজস্ব ঘাটতি কমানো এবং মূলধনি ব্যয় বাড়ানো— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সুস্থ রাজকোষের লক্ষণ। এ বারের বাজেটে সেই দিকেই এগোনোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

শিল্পনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পশ্চিমবঙ্গে বহু দিন ধরেই একটি ভুল ধারণা চালু ছিল যে, শুধু শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক করলেই শিল্প আসে। বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে। লগ্নিকারীরা প্রথমেই দেখেন সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা। তার পরে আসে আর্থিক উৎসাহের প্রশ্ন। ভারতের বিভিন্ন শিল্পোন্নত রাজ্য করছাড়, স্ট্যাম্প ডিউটি মকুব, বিদ্যুৎ-ভর্তুকি, প্রশিক্ষণ সহায়তা কিংবা সুদে ছাড়— নানা উপায়ে লগ্নি আকর্ষণ করে। পশ্চিমবঙ্গও যদি বড় শিল্প চায়, তা হলে এই প্রতিযোগিতায় তাকে নামতেই হবে।

অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি তুলে দিতে হবে। উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতিই কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে টিকিয়ে রাখে। উৎপাদন বাড়লে রাজস্ব বাড়ে, রাজস্ব বাড়লে সরকার আরও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারে। অর্থাৎ শিল্প এবং কল্যাণ— দু’টিকে পরস্পরের বিকল্প নয়, পরিপূরক হিসাবে দেখতে হবে।

এখানেই এ বারের বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি রয়েছে। অন্তত নীতিগত স্তরে সরকার বুঝিয়েছে যে, শুধু ভাতা দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান, শিল্প, পরিকাঠামো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ— এই চারটি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব না দিলে রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে না। বাজেটে সেই উপলব্ধির প্রতিফলন রয়েছে। তবে বাজেট ঘোষণাই শেষ কথা নয়। পশ্চিমবঙ্গে বহু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণার পরে বাস্তবায়নের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে এই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে তার বাস্তব প্রয়োগের উপর। শিল্পে নতুন লগ্নি আসে কি না, সরকারি প্রকল্প সময়মতো সম্পূর্ণ হয় কি না, কর্মসংস্থান বাড়ে কি না এবং রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকে কি না— সেই উত্তরই শেষ পর্যন্ত এই বাজেটের মূল্য নির্ধারণ করবে।

নতুন সরকারের রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার বিচার ভবিষ্যৎ করবে। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে এ বারের বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে যে অর্থনীতি মূলত ভোগনির্ভর সরকারি ব্যয়ের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে ধীরে ধীরে উৎপাদন, লগ্নি এবং আর্থিক শৃঙ্খলার পথেফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এই পরিবর্তন সহজ হবে না। রাজনৈতিক চাপ থাকবে, নতুন দাবি উঠবে, জনপ্রিয়তার প্রলোভনও থাকবে।তবু আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে বঙ্গের অর্থনীতি নতুন গতি পেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত কোনও বাজেটের সাফল্য তার ঘোষণায় নয়, তার অগ্রাধিকারে। সেই বিচারে এ বারের বাজেটের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এই বার্তায়— রাজকোষের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনলে উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হয় না। আর সেই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনমানের স্থায়ী উন্নতির সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

অর্থনীতি বিভাগ, রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়, হুগলি

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন