WB Election 2026 Result

‘ভোটব্যাঙ্ক’ নামক বিভ্রান্তি

এই ভোটের ফল দেখিয়ে দিল, তা হয়নি। মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গিয়েছে। তার ফলে বহু মুসলিম অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রেও তৃণমূল কংগ্রেস জিততে পারেনি।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ ০৮:৩৩
Share:

এত দিন রাজ্য রাজনীতির ‘প্রাচীন প্রবাদ’ ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে নিয়ে নির্বাচনে নামেন। ফলে ভোটগণনার আগেই তৃণমূলের জন্য অন্তত গোটা ৭০ আসনে জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব এ বার এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত ছিলেন। তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, এসআইআর করে মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা হচ্ছে বলে সমস্ত মুসলিম ভোটার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিছনে এককাট্টা হবেন।

এই ভোটের ফল দেখিয়ে দিল, তা হয়নি। মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গিয়েছে। তার ফলে বহু মুসলিম অধ্যুষিত বিধানসভা কেন্দ্রেও তৃণমূল কংগ্রেস জিততে পারেনি। বরঞ্চ মুসলিম ভোট বিভাজনের সুবিধা নিয়ে এবং হিন্দু ভোটের সিংহভাগকে এককাট্টা করে বিজেপি এমন অন্তত ৩৪টি আসনে জিতে গিয়েছে, যেখানে মুসলিম ভোটের হার উল্লেখযোগ্য। বিজেপির নিজের হিসেবে, মালদহ ও মুর্শিদাবাদে এমন ১২টি আসনে বিজেপি জিতেছে, যেখানে মুসলিমদের হার ৪০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে ৪টি এমন আসন রয়েছে, যেখানে ৫০ শতাংশের বেশি মুসলিম।

এতে অন্তত একটি ‘রাজনৈতিক মিথ’ ভুল প্রমাণিত হল। অনেকের বিশ্বাস, মুসলিমরা চিরকাল যান্ত্রিক ভাবে এককাট্টা হয়ে, একটি ‘মোনোলিথিক’ ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে একই ঝুলিতে ভোট দিয়ে থাকেন। একের পর এক লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, হিন্দুদের মতো মুসলিম সমাজও শ্রেণি, গোষ্ঠী, জাতের অঙ্কে বিভক্ত। ফলে গোটা মুসলিম ভোট একই ঝুলিতে যায়, এটি ভুল তত্ত্ব। মুসলিমরা সব সময়ই রাজ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী দলকে ভোট দিয়ে থাকেন, এ-ও ভুল। যেমন পশ্চিমবঙ্গে মালদহ-মুর্শিদাবাদ-উত্তর দিনাজপুরে মুসলিমদের ভোট তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেস, আইএসএফ, সিপিএম, হুমায়ুন কবীরের দলের মধ্যে বিভাজন হয়ে গিয়েছে। অথচ অসমের নির্বাচনে মুসলিমরা মোটামুটি এককাট্টা হয়ে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। কেরলে মুসলিমদের ভোট গিয়েছে কংগ্রেস, আইইউএমএল-এর ইউডিএফ জোটের দিকে। একই রকম বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক মিথ হল, মুসলিমরা বিজেপিকে ভোট দেন না। সমীক্ষা বরং বলে, মোদী জমানাতেই কখনও ৬ শতাংশ, কখনও ৯ শতাংশ পর্যন্ত মুসলিম ভোট বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে। পসমন্দা, বোহরা সম্প্রদায়ের মুসলিমরা খোলাখুলিই বিজেপিকে সমর্থন জানিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা এ বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এককাট্টা হয়ে ভোট দেননি দেখে প্রথমেই মনে হতে পারে, তাঁরা তৃণমূলের তোষণ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ। প্রশ্ন হল, তৃণমূলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক গেল কোথায়? অবশ্যই কংগ্রেস, বাম এবং আইএসএফ-এর দিকে। একই সঙ্গে হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টির দিকেও, যে হুমায়ুন কবীর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমিয়েছিলেন। তৃণমূল থেকে নিলম্বিত হয়ে আমজনতা উন্নয়ন পার্টি তৈরি করেছিলেন। অতীতে তিনি বিজেপির টিকিটে ভোটেও লড়েছেন। নির্বাচনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির থেকে টাকা নিয়ে সংখ্যালঘু ভোট বিভাজনের খেলায় নামার অভিযোগ উঠেছিল। ভোটের ফল বলছে, তার পরেও মুসলিমরা হুমায়ুন কবীরকে ভোট দিয়েছেন। যে রেজিনগরে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস হয়েছিল, সেই রেজিনগর ও পাশের নওদা, জোড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন হুমায়ুন কবীর।

এ বার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের একেবারে কেন্দ্রে ছিল মুসলিম রাজনীতি। এক দিকে বিজেপি বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে জনসংখ্যার চরিত্র বদলে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে পরিণত হতে চলেছে বলে প্রচার করেছিল। মমতা সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের মানুষের ক্ষোভ উস্কে দেওয়ার পিছনে অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল, তৃণমূল অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে। তৃণমূলের তোষণের রাজনীতির ফলেই মুসলিমদের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। অন্য দিকে, তৃণমূল এসআইআর-সিএএ-এনআরসি-র জুজু দেখিয়ে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ককে এককাট্টা করতে চাইছিল।

ভোটের ফল বলছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের একটা অংশ আরও ‘কট্টর’, ‘রক্ষণশীল’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক’ দলের দিকে ঝুঁকেছেন। এসআইআর-এর ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়ায় মুসলিমদের অনেকেই অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এই অবস্থায় তাঁরা কোনও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাজনৈতিক নেতাদের দিকে ঝুঁকছেন, যাঁরা বলেন, শুধু মুসলিম স্বার্থ রক্ষার জন্যই রাজনীতি করছেন। হুমায়ুন কবীরের জোড়া আসনে জয় তারই প্রমাণ।

পশ্চিমবঙ্গ প্রথম নয়। এর আগে একাধিক রাজ্যে এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। অসমে বদরুদ্দিন আজমলের এআইইউডিএফ এর সুবিধা তুলেছে। হায়দরাবাদের এমআইএম-এর প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়েইসি ঠিক এই রাজনীতিই করে থাকেন। বিহার থেকে মহারাষ্ট্র, বহু রাজ্যে তিনি গোঁড়া মুসলিম রাজনীতির তাস খেলেছেন। তিনি বিজেপির হয়ে মুসলিম ভোট বিভাজন করে থাকেন বলে বহু পুরনো অভিযোগ। উল্টো দিকে ওয়েইসি বলে থাকেন, ‘তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলি মুসলিমদের শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ও অসমে ভোটে কংগ্রেসের হারের পরে আসাদুদ্দিন ওয়েইসি বলেছেন, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি বিজেপিকে রুখতে ব্যর্থ। তাই মুসলিমদের উচিত নিজস্ব স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করা।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ইতিহাস ঠিক এর উল্টো কথা বলে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ শুধুমাত্র মুসলিম সমাজের নেতা ছিলেন না। জওহরলাল নেহরু মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। রামমনোহর লোহিয়া থেকে জয়প্রকাশ নারায়ণ বা ‘জেপি’ মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিংহ যাদব, বিহারে লালুপ্রসাদ যাদব মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এক সময় অটলবিহারী বাজপেয়ী লখনউ তথা উত্তরপ্রদেশের মুসলিম সমাজের নেতা ছিলেন। ১৯৯৮-৯৯ সালে লখনউতে অটলবিহারী বাজপেয়ী হিমায়ত কমিটি তৈরি হয়েছিল। ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় সেই হিমায়ত কমিটি বাজপেয়ীর হয়ে প্রচারেও নেমেছিল।

মুসলিম নেতারাই মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব দেবেন, মুসলিম ভোটাররা শুধু কট্টর মুসলিম নেতা বা দলকে ভোট দেবেন— এই রাজনৈতিক তত্ত্বের উল্টো পিঠ হল, হিন্দুরা শুধুমাত্র হিন্দুত্ববাদী দলকেই ভোট দেবে। এতে বিজেপির আরও সুবিধা। মুসলিম ভোটের মেরুকরণের অর্থই হল, হিন্দু ভোটেরও মেরুকরণ। এমনিতেই বিজেপির কৌশল হল, কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি থেকে আরজেডি-র মতো দলের গায়ে ‘মুসলিমদের দল’-এর তকমা সেঁটে দেওয়া।

পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের পরে বিজেপি-আরএসএসের তরফ থেকে একই প্রচার শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের তিন ভাগের এক ভাগ বিধায়কই মুসলিম। কংগ্রেসের দুই বিধায়কই মুসলিম। সিপিএমের এক জন বিধায়ক মুসলিম। আইএসএফ-এরও তাই। অসমে কংগ্রেসের ১৯ জন বিধায়কের ১৮ জনই মুসলিম। কেরলে কংগ্রেসের সহযোগী দল ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ ২২টি আসন পেয়েছে।

জাতীয় স্তরে কংগ্রেস বিজেপি-আরএসএসের এই আক্রমণকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়ে থাকে। কারণ ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে হারের কারণ খুঁজতে এ কে অ্যান্টনির নেতৃত্বে যে কমিটি তৈরি হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, কংগ্রেসের সংখ্যালঘু তোষণকারী দলের ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ায় রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। কংগ্রেসকে এখন তাই পাল্টা প্রচারে নেমে বলতে হচ্ছে, লোকসভায় কংগ্রেসের ৯৯ জন সাংসদের মধ্যে ৯১ জনই হিন্দু। কংগ্রেস-শাসিত কর্নাটকে কংগ্রেসের ১৪০ জন বিধায়কের ১৩৫ জন হিন্দু। আর এক কংগ্রেস-শাসিত রাজ্য হিমাচলে ৪০ জন বিধায়কের মধ্যে ৪০ জনই হিন্দু। কেরলে কংগ্রেসের ৬৪ জন নির্বাচিত বিধায়কের মধ্যে ৫২ জন হিন্দু। তামিলনাড়ুতে জিতে আসা ৫ জন কংগ্রেস বিধায়কের সকলে হিন্দু। কংগ্রেসের দাবি, গোটা দেশে কংগ্রেসের ৬৬৪ জন বিধায়ক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫২০ জন বা প্রায় ৭৮ শতাংশই হিন্দু। মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ৮০ জন বা মাত্র ১২ শতাংশ। অন্য ধর্মের বিধায়ক ৬৪ জন বা ১০ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর নীতি মেনে বলে থাকেন, কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোনও ধর্মীয় বৈষম্য হয় না। হিন্দু, মুসলিম-নির্বিশেষে সকলে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেয়ে থাকেন। আশা করা যায়, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গেও সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ধর্মের ভেদাভেদে বৈষম্য করবে না। নরেন্দ্র মোদী যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তার সুফল মুসলিমদের কাছেও সমান ভাবে পৌঁছবে। গোঁড়া, কট্টর, সাম্প্রদায়িক মুসলিম নেতা বা দলের দিকে মুসলিমদের ঝুঁকে পড়া ঠেকাতে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-উন্নয়নই প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন