নির্মীয়মাণ: বর্জ্য জল সংগ্রহ, শোধন ও পুনর্ব্যবহারের জন্য নিকাশি ব্যবস্থার পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজতে হবে।
মার্চের ২২ তারিখ ছিল বিশ্ব জল দিবস। যার অনুপস্থিতিতে জীবনের অস্তিত্বই অসম্ভব— সেই জল নিয়ে ভাবার, আত্মসমীক্ষা করার দিন। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণের অভিঘাতে গোটা দুনিয়াতেই এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ আজ মারাত্মক চাপে। জল ক্রমে দুর্লভ হচ্ছে, তার গুণগত মানেরও উদ্বেগজনক অবনতি হচ্ছে। ভবিষ্যতে ভারতের শহরগুলির জলের চাহিদা আরও বাড়বে— কিন্তু সেই চাহিদা পূরণ করা কি আদৌ সম্ভব হবে?
২০২৬ সাল এল নিনো-প্রভাবিত বছর— অর্থাৎ আরও তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক রকম উষ্ণ দিন-রাত, অনিয়মিত বর্ষা এবং ঘন ঘন চরম আবহাওয়ার ঘটনা এ বছর প্রত্যাশিত। বৃষ্টির ধরন হবে অনিয়মিত, ঋতুচক্রে ব্যত্যয় ঘটবে। জলসম্পদের উপরে এর প্রভাব হবে গভীর। সামনে কঠিন বছর অপেক্ষা করছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের জল-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে। এক দিকে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে অতীতের জলপ্রজ্ঞার দিকে— যখন আমাদের পূর্বপুরুষরা জানতেন, কী ভাবে প্রকৃতির স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে জল ব্যবহার করতে হয়; আর অন্য দিকে গড়ে তুলতে হবে ভবিষ্যতের জন্য এক জল-সচেতন সমাজ— যে সমাজ আজকের সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে তার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
ভারতে সচেতন জল ব্যবহারের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। এক সময় প্রতিটি ফোঁটা জল সংরক্ষণ করা হত, সযত্নে সঞ্চিত হত। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব জল ব্যবস্থাপনা ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সময় এসেছে। ‘যেখানে জল পড়ে, সেখানেই তাকে ধরে রাখো’— এই হওয়া উচিত মূল মন্ত্র। এর সঙ্গে আরও একটি জরুরি কাজ হল শহরের প্রাকৃতিক ‘স্পঞ্জ’ ফিরিয়ে আনা— জলাশয়, প্লাবনভূমি, জলাভূমি। এগুলি শুধু জল সংরক্ষণেই সাহায্য করবে না, শহরের সবুজ-নীল পরিসর পুনর্গঠনে এবং তাপপ্রবাহের সময়ে শহরকে ঠান্ডা রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
এর পাশাপাশি আমাদের সচেতন হতে হবে অপচয় বিষয়েও। আমরা জানি, যে পরিমাণ জল আমাদের সরবরাহ করা হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই বর্জ্য জলে পরিণত হয়। প্রশ্ন হল— এই ব্যবহৃত জলকে কেন আমরা আটকাব না, পরিশোধন করব না, পুনর্ব্যবহার করব না? প্রতিটি ফোঁটা নিকাশি জলকে আবার ব্যবহারযোগ্য জলে পরিণত করতে হবে— অর্থাৎ তাকে আবার জলচক্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।
নিকাশি জলের প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক এক ঘটনা মনে পড়ল। দেশের ‘সবচেয়ে পরিষ্কার’ শহর হিসাবে চিহ্নিত ইন্দোরে দূষিত পানীয় জলের কারণে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে— এই অহেতুক মৃত্যু আমাদের প্রত্যেকের গভীর শোক ও ক্রোধের কারণ হওয়া উচিত। কিন্তু বিষয়টি কেবল ইন্দোরের নয়, বা কেবল পানীয় জলের সরবরাহেরও নয়। মূল সমস্যা হল নিকাশি— প্রতি দিন ফ্লাশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যে জলের কথা ভুলে যাই। সমস্যা হল, আমরা বিষয়গুলিকে সংযুক্ত করে দেখি না। প্রতিটি নগর প্রশাসন এবং কার্যত সব রাজ্যের সরকারই জল সরবরাহের উপরে জোর দেয়, কিন্তু উৎপন্ন নিকাশি জলের দিকে নজর দেয় না। যত দিন না আমরা নিকাশি জল ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, তত দিন পরিষ্কার জলের নিরাপত্তা অধরাই থাকবে।
ভারতের নগরোন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলি এই প্রয়োজনের কথা স্বীকার করে বটে, কিন্তু বাস্তবে জলের ও নিকাশির পরিকাঠামো নকশায় যথেষ্ট পরিবর্তন আসেনি। কেন্দ্রীয় সরকারের অটল মিশন ফর রিজুভিনেশন অ্যান্ড আর্বান ট্রান্সফর্মেশন (অমৃত) প্রকল্প জল সরবরাহ, নিকাশি ও সবুজ পরিকাঠামোর জন্য অর্থসংস্থান করে। কিন্তু ব্যয়ের কাঠামোটিতে ভারসাম্যের অভাব প্রকট। কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬২ শতাংশ যায় জল সরবরাহে, নিকাশিতে মাত্র ৩৪ শতাংশ। আর জলাশয় পুনরুজ্জীবনে ব্যয় হয় মাত্র তিন শতাংশ— অথচ, এই প্রকল্পে যথেষ্ট অর্থসংস্থান হলে তা ভূগর্ভস্থ জলস্তর বৃদ্ধি, এবং তার মাধ্যমে জল সরবরাহের কাজে অত্যন্ত সহায়ক হতে পারত।
এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। কেবল নিকাশিতে বেশি ব্যয় করলেই হবে না, সম্পূর্ণ পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজতে হবে, যাতে তা সাশ্রয়ী হয়। তবেই শহরগুলি প্রতিটি ফোঁটা বর্জ্যজল সংগ্রহ, পরিশোধন এবং পুনর্ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।
বর্তমান জল সরবরাহ ব্যবস্থা নির্ভর করে পাইপলাইন ও পাম্পের উপরে, যা দূরবর্তী উৎস থেকে জল এনে দেয়— কারণ, স্থানীয় উৎসগুলি হয় শুকিয়ে যাচ্ছে, নয়তো দূষিত হয়ে পড়ছে। অথচ আমরা জানি, পাইপলাইন যত দীর্ঘ হয়, নির্মাণ তত ব্যয়বহুল হয়; লিকেজ বাড়ে, ফলে অপচয় হয়; বিদ্যুৎ খরচও বাড়ে। ফলে জলের খরচ এমন জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে ধনী পরিবারগুলির পক্ষেও তা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে; সরকারের পক্ষেও দরিদ্র মানুষকে ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই, মানুষ ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
নিকাশি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। ক্রমাগত নতুন পাইপলাইন তৈরি হচ্ছে, নতুন পাম্প বসছে— কিন্তু প্রকল্পগুলি কখনও সম্পূর্ণ হয় না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সব বাড়িকে সংযুক্ত করতে হয়, পুরনো নালা বদলাতে হয়, বার বার রাস্তা খোঁড়া হয়। এই বর্জ্য জল শেষ পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাম্প করে শোধনাগারে পাঠানো হয়; তার পর সে জল গিয়ে পড়ে নদী, খাল বা জলাশয়ে। সমস্যা হল, সেই নদী, খাল জলাশয়ে ইতিমধ্যেই অপরিশোধিত নিকাশির স্রোত প্রবাহিত হয়। ফলে, যে জল শোধন করা হল, সেটা বহুলাংশে ‘অপচয়’ হয়। অথচ, এমন সব প্রকল্পে খরচ বিপুল। অবধারিত ভাবে প্রকল্পে দেরি হয়, ব্যয়বৃদ্ধিও অনিবার্য হয়ে ওঠে। শহরের কোনও অংশে একটি প্রকল্প শেষ হতে না হতেই অন্য কোনও অংশে নতুন সংযোগের প্রয়োজন হয়। ফলে ভারতের বহু শহরে পূর্ণাঙ্গ নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি; অধিকাংশ পরিবার এখনও সেপটিক ট্যাঙ্ক-নির্ভর। ইন্দোরে এমন ব্যবস্থার লিকেজ থেকেই পানীয় জল দূষিত হয়েছিল।
তবে এই ‘অন-সাইট ব্যবস্থা’ যে সমস্যা হিসাবেই থেকে যাবে, তা নয়— বরং এক ভবিষ্যতের সমাধান হিসাবে ব্যবহার করে সম্ভব। শর্ত একটাই— নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, তা শোধনের জন্য নিয়ে যাওয়া, এবং শোধিত জল ও কঠিন বর্জ্যকে সার বা জ্বালানি হিসাবে পুনর্ব্যবহার করা। তা না হলে জল সরবরাহ দূষণের ঝুঁকি থাকবেই। তাই জল সরবরাহের আগে নিকাশি ব্যবস্থাপনাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নিকাশি ব্যবস্থাপনাকে সাশ্রয়ী করাও সমান জরুরি। অমৃত প্রকল্পের নির্দেশিকা নতুন করে লেখা প্রয়োজন— যাতে নিকাশি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে প্রতিটি পরিবারের বর্জ্য সংগ্রহ, অগ্রাধিকার পায়। প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য শহরগুলিকে উৎসাহিত করতে হবে বিদ্যমান সেপটিক ট্যাঙ্ক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে। পাইপলাইনের বদলে ট্যাঙ্কার ব্যবস্থায় এই বর্জ্য শোধনাগারে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে— এটি দ্রুত, সস্তা এবং অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক। দ্বিতীয়ত, পুনর্ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে— শহরগুলিকে প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা শোধিত বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহার করে এবং কঠিন জৈব বর্জ্যকে জৈব সার বা জ্বালানিতে রূপান্তরিত করে। প্রকল্পের নকশা হওয়া উচিত নিকাশি সংগ্রহ নয়, বরং পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অর্থায়নও যুক্ত হতে পারে পুনর্ব্যবহৃত জলের পরিমাণের সঙ্গে।
তৃতীয়ত, জল প্রকল্পগুলিকে স্থানীয় উৎসের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে— বিশেষ করে জলাশয় পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে। এতে দূরবর্তী উৎস থেকে জল আনার খরচ কমবে, ভূগর্ভস্থ জল সুস্থায়ী হবে, এবং জল সরবরাহ সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু এই পরিবর্তন সম্ভব একমাত্র তখনই, যখন নিকাশি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। জলাশয় দূষিত থাকলে শহরগুলি দূরের পরিষ্কার জলের সন্ধানে ছুটতেই থাকবে। ফলে পরিষ্কার জল থেকে দূষিত জলের এই চক্র চলতেই থাকবে।
শহরগুলিতে ক্রমবর্ধমান জল-সঙ্কট এবং সাম্প্রতিক জল-দুর্ঘটনাগুলি আমাদের সামনে যে সতর্কবার্তা তুলে ধরছে, তা আর উপেক্ষা করার কোনও সময় নেই।
নির্দেশক, সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, নয়াদিল্লি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে