এই হানাদারি কি সংবিৎ ফেরাবে, ভাঙবে সর্বনাশা ‘বাইনারি’?
Poila Baisakh

তুমি শুধু পয়লা বৈশাখ?

রাজধানীর মহানায়করা তো পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন পছন্দসই জনতা নির্বাচন করতেই তৎপর, যে জনতা পরম ভক্তিভরে তাঁদের নির্বাচন করে গদিতে বসিয়ে দেবে। আর যারা পছন্দসই নয়? তার উত্তর অনেক আগেই জেনেছি আমরা।

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫২
Share:

পয়লা বৈশাখ সময় মতোই হাজির। পঞ্জিকা কেন বাধ্যতে? অতএব, বের্টোল্ট ব্রেখটের কথাগুলো একটু পাল্টে নিয়ে বলাই যায়: হ্যাঁ, এই অন্ধকার সময়েও আমরা নববর্ষ পালন করব, অন্ধকারের নববর্ষ। আমাদের এই রাজ্যটিতে অন্ধকার অবশ্য নতুন নয়, অনেক কাল ধরেই আমরা ‘কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো’ আর্তনাদ করে এসেছি, আর অনন্ত কুয়োর জলে মরা চাঁদ ক্রমাগত আরও আরও তলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার পরেও, মানতেই হবে, এই নববর্ষে পশ্চিমবঙ্গ যে প্রগাঢ় এবং ভয়াল তমসায় নিমগ্ন, সেটি এই দুর্ভাগা রাজ্যের ইতিহাসেও অস্বাভাবিক, কার্যত অভূতপূর্ব। তার কারণ, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের নামে, সেই নির্বাচন আয়োজনের নিয়মকানুনের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে নিশানা করে রীতিমতো কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে যুদ্ধঘোষণা করেছেন দেশের শাসকরা। ধর্মযুদ্ধ নয়, ভয়াবহ রকমের অধর্মযুদ্ধ। এবং— সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে— হস্তিনাপুরীর শাহেনশাদের এই আগ্রাসী অভিযানের সহায় তথা আজ্ঞাবহ হিসেবে সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ নামে পরিচিত বিবিধ প্রতিষ্ঠানের নায়করা। মনে পড়ে যায় প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সুরধ্বনি: এ মহাভারত দাদা, এ মহাভারত!

এ মহাভারতে গত এক যুগ ধরে দিল্লীশ্বরদের নির্দেশনায় প্রতিনিয়ত গণতন্ত্রের নতুন প্রতিমা— না কি নতুন পুতুল— নির্মিত হয়ে চলেছে, সে-কথা আমরা বিলক্ষণ জানি। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সেই নবনির্মাণের প্রধান কেন্দ্র। কী তার লক্ষ্য? কেমন পুতুল চান ইন্দ্রপ্রস্থের নায়করা? সেই প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর জানতে আরও এক বার ব্রেখটের কাছে যেতে পারি। ১৯৫৩ সালে বার্লিন-সহ পূর্ব জার্মানির লক্ষাধিক শ্রমজীবী মানুষের প্রতিবাদে ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত শাসক শিবিরের বশংবদ লেখক সঙ্ঘের এক কর্তা হুমকি দিয়েছিলেন: (প্রতিবাদী) জনতা রাষ্ট্রের আস্থা হারিয়েছে, তা ফিরে পাওয়ার জন্য তাদের দ্বিগুণ তৎপর হওয়া দরকার। সেই বিচিত্র উপদেশটি উদ্ধৃত করেছিলেন ব্রেখট ‘সমাধান’ শীর্ষক এক সংক্ষিপ্ত কবিতায় এবং তার পরে, কবিতার শেষে, পেশ করেছিলেন তাঁর ক্ষুরধার সুপরামর্শ: তা হলে শাসকরা বরং এই জনতাকে ভেঙে দিয়ে নিজের পছন্দমতো আর একটি জনতা নির্বাচন করে নিন, তাতে ওঁদের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে।

রাজধানীর মহানায়করা তো পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন পছন্দসই জনতা নির্বাচন করতেই তৎপর, যে জনতা পরম ভক্তিভরে তাঁদের নির্বাচন করে গদিতে বসিয়ে দেবে। আর যারা পছন্দসই নয়? তার উত্তর অনেক আগেই জেনেছি আমরা। উইপোকার মতো তাদের বিদায় জানানো হবে। উইপোকা তাড়ানো কি চাট্টিখানি কথা? তার জন্য বিশেষ নিবিড় শোধন চাই বইকি! এবং ঝটিকার বেগেই তা করা চাই— আজ বাদে কাল যুদ্ধু হবে, অশ্বমেধের ঘোড়াকে পশ্চিমবঙ্গ নামক বেয়াড়া রাজ্যটি পার করানোর কাজ হাসিল করতে হলে কি ধীরে-সুস্থে, প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে, সব দিক বিবেচনা করে চলা যায় নাকি? এখন কি ‘এক জনের প্রতিও যেন অবিচার না হয়’ ইত্যাদি মহতী শর্তাবলি পূরণ করে কাজ করার সময়? কে জানে, এ ঘোর কলিতে পিতামহ ভীষ্মও হয়তো শরশয্যায় শুয়ে উচ্চারণ করতেন অলৌকিক সান্ত্বনার বাণী: এক বার নাহয় ভোট দেওয়া না-ই হল, আসছে বছর আবার হবে! এ-কথা ভাবতেই অবশ্য মনটা কুডাক ডেকে ওঠে: হবে তো, জাহাঁপনা? মনের আর দোষ কী? এমন অন্ধকারে ভয় তো হবেই।

কিন্তু এত কাণ্ডের পরেও শেষ পর্যন্ত যদি অশ্বমেধের ঘোড়া পশ্চিমবঙ্গে আটকে যায়? ‘সুনার বাংলা’ হয়ে যাওয়ার ডাবল-ইঞ্জিন-চালিত সৌভাগ্যের কবল থেকে আপাতত রেহাই মেলে? তা হলেও কি নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারব আমরা? ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিল দুর্বৃত্ত’ ঘোষণা করে চেনা দুঃখ চেনা সুখ নিয়ে কাল কাটাতে পারব, যেমন কাটিয়ে চলেছি? পারব না, কারণ লক্ষ লক্ষ নাম কেটে দেওয়ার যে অভিযান নিয়ে এই মুহূর্তে আমরা এতখানি উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ, সেটি যুদ্ধের একটা অঙ্গমাত্র। এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রকট অঙ্গ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু, যেন ভুলে না যাই, আজকের এই দুর্দৈবের পিছনে আছে আরও অনেক বড়, অনেক বেশি গভীর বিপদ, যা ইতিমধ্যেই আমাদের গলা অবধি গ্রাস করে ফেলেছে। এখনও যদি সেই বিপদ সম্পর্কে সচেতন না হতে পারি, তা হলে অচিরেই আমাদের সবিস্ময়ে এবং সভয়ে বলতে হবে: এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার?

কঠিন সত্য এই যে, দেশের বর্তমান শাসককুল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে ইতিমধ্যেই অনেক দূর অবধি অগ্রসর হয়েছেন, হতে পেরেছেন। এই ধুন্ধুমার সংহারপর্ব— ওঁদের (পরি)কল্পনায় বোধ করি উপসংহারপর্ব— অবশ্যই ভয়ঙ্কর, কিন্তু তার পিছনে আছে দীর্ঘ অভিযানের ইতিহাস, যা আজ ওঁদের এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, আমাদেরও। সেই অভিযান নিছক ভোটের অনুপাত বাড়ানোর জন্য নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পাল্টে দেওয়াই তার গভীরতর অভিসন্ধি। বঙ্গসমাজের মানসিকতাকে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে নেওয়াই ওঁদের নিগূঢ় প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গকে হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের বলয়ে ঢুকিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে উদ্ভাবিত এই প্রকল্প কেবল তখ্‌ত দখলের নয়, মন এবং মগজ দখলেরও।

এই প্রকল্পের প্রাথমিক জমি, কাঁচামাল এবং মূলধন মজুত ছিল অনেক কাল ধরেই, বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের জন্মের আগে থেকেই। সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসরে মেরুকরণের যে দানবমূর্তিকে আজ আমরা অতি দ্রুত বিপুল আকারে মাথা চাড়া দিতে দেখছি, সমাজের মানসভূমিতে বিভেদ, বিরাগ এবং বিদ্বেষের ভিত রীতিমতো মজবুত না হলে সেটা ঘটতে পারত না। অন্য দিকে, সামাজিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অনুশীলনের যে ধারা অনেক দিন যাবৎ এই রাজ্যকে— তার সমস্ত ব্যর্থতা, ঘাটতি ও বিচ্যুতি সত্ত্বেও— গরলাক্ত সংখ্যাগুরুতন্ত্রকে প্রতিরোধের কাজে শক্তি সরবরাহ করে এসেছিল, সাম্প্রতিক কালে তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে চলেছে। এর পিছনে আছে এক ধারাবাহিক আত্মসমর্পণের ইতিহাস। এককেন্দ্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বহুবর্ণ বহুমাত্রিক যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার যে প্রতিস্পর্ধা নিয়ে এক দিন এ রাজ্যের গর্ব ছিল, তা ক্রমশ দুর্বল হতে হতে আজ প্রায় দিগন্তে বিলীন। তাই বহিরাগত ক্ষমতার পরুষ হুঙ্কার শুনে আমরা এখন ক্রুদ্ধ হই না, ক্ষুব্ধ হই না, এমনকি বিচলিতও হই না, বিগলিত হই। সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিস্পর্ধার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী একটি রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় মহাশক্তির আগ্রাসনকে উত্তরোত্তর এমন নিরাবরণ এবং বেপরোয়া হয়ে উঠতে দেখেও সেই রাজ্যের বহু নাগরিক বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না, বরং তাঁরা অনেকেই উইপোকা তাড়ানোর কর্মযজ্ঞ দেখে মনে মনে (অথবা প্রকাশ্যে) উৎফুল্ল বোধ করেন এবং যজ্ঞশেষে কব্জি ডুবিয়ে ভোজ খেয়ে ‘দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো বা’ সঙ্কীর্তন করতে করতে হিন্দু ভারতের সেবায়েত হবেন, তার দিন গোনেন! আমরা এক দিনে এই অন্ধকারে পৌঁছইনি।

ভরসা একটাই। কাণ্ডজ্ঞান। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের, অন্তত যাঁদের জনসাধারণ বলা হয়ে থাকে সেই শ্রমজীবী মানুষের অন্তরে ওই বস্তুটি এখনও যথেষ্ট বহাল আছে বলেই বিশ্বাস করি। অনাচার তাঁদের অচেনা নয়, দশকের পর দশক ধরে তার বহু নিদর্শন তাঁরা দেখে আসছেন, তার যন্ত্রণা ভোগ করে আসছেন। ‘পরিবর্তন’-এর পরে গত পনেরো বছরে সেই অনাচার আড়েবহরে বিস্তর বেড়েছে, তদুপরি যুক্ত হয়েছে লজ্জাকর দুর্নীতির তৃণমূলায়ন। কিন্তু তার প্রতিকার যথার্থ গণতন্ত্রের পথেই সম্ভব, এবং সেটাই একমাত্র ন্যায্য পথ। সাধারণ মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ বোধ থেকেই জানেন যে এই উৎকট আগ্রাসন গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। জানেন যে আজ এই অনাচারের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে কাল তাঁদের জীবনেও বুলডোজ়ার নেমে আসবে। বুলডোজ়ারের সেটাই ধর্ম। যেমন বিশ শতকের ইউরোপে, তেমনই একুশের ভারতে। ইতিহাস বড় কঠিন ঠাঁই।

ইতিহাস ভরসা দেয়। আগ্রাসী অনাচার চরমে উঠেছে বলেই ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদও প্রবল হয়ে উঠতে পারে। এই নির্বাচন হয়ে উঠতে পারে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের মোড় ঘোরানোর এক সন্ধিক্ষণ, ভাষান্তরে ক্রান্তিকাল। কিন্তু তার জন্য রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা দরকার যথার্থ গণতন্ত্রের পথে, যেখানে নিজের দু’পায়ে শক্ত করে দাঁড়িয়ে আত্মসচেতন জনতা রাজারানি বা দাদাদিদিদের মুখের উপর ঘোষণা করতে পারে: সিঙ্গল বা ডাবল কোনও ইঞ্জিনেরই প্রয়োজন নেই আমাদের, আমরাই আমাদের ইঞ্জিন, যা আমাদের সুস্থ এবং মর্যাদাময় জীবনের লক্ষ্যে অগ্রসর হবে— আমরাই আমাদের নির্মাণ করব, তোমাদেরও। এটাই যথার্থ গণতন্ত্রের পথ, যে পথ শ্রমজীবী মানুষের সুস্থ এবং মর্যাদাময় জীবনের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। এই পথে চলার প্রথম শর্ত আধিপত্যকামী সংখ্যাগুরুতন্ত্রের এই হানাদারি রোধ করা। সেই শর্ত পূরণ হলে রাজ্যের রাজনীতি তার সর্বনাশা ‘বাইনারি’-র কবল থেকেও উদ্ধার পাবে। সেটা এখন অতিমাত্রায় জরুরি। এই বৈশাখে সেই জরুরি কাজটি আমরা অন্তত শুরু করতে পারি।

না পারলেও অবশ্য বাঙালির নববর্ষ আবার আসবে। আসতেই থাকবে। পঞ্জিকা কেন বাধ্যতে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন