বিক্ষুব্ধ: সিবিএসই-র কম্পিউটার-নির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল জাতীয় ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা, নয়া দিল্লি, ৩০ মে। ছবি: পিটিআই ।
সন্দেহ নেই, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, প্রবেশিকা থেকে বোর্ড পরীক্ষা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে রয়েছে পড়ুয়াদের মূল্যায়ন। কথায় আছে, বৃক্ষের পরিচয় ফলে। তেমনই পড়ুয়াদের মেধার পরিচয়ও প্রকাশিত হয় তাদের পরীক্ষার ফলেই। সন্দেহ নেই, পড়ুয়াদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দ্রুত ফলপ্রকাশ কিংবা ফলপ্রকাশের স্বচ্ছতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই যে কোনও গুরুতর পরীক্ষা বিপর্যয় বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষা প্রশাসনের সংবেদনশীলতা, দক্ষতা এবং দায়বদ্ধতা আতশকাচের তলায় আসাটাই স্বাভাবিক।
সাম্প্রতিক অতীতে মেডিক্যাল নিট পরীক্ষা থেকে শুরু করে সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ফলপ্রকাশের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার ঘটনা দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া ও অভিভাবকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফলপ্রকাশ, একের পর এক বিড়ম্বনা দেশ জুড়ে শিক্ষার মূল্যায়নের মানদণ্ড নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সিবিএসই বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় এই বছর থেকে শুরু হয়েছিল কম্পিউটার-নির্ভর অনস্ক্রিন মূল্যায়ন ব্যবস্থা (ওএসএম)। সন্দেহ নেই, আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে পড়ুয়ার পরীক্ষার খাতা শিক্ষক, কোঝিকোড় থেকে কলকাতা দেশের যে কোনও প্রান্তে ঘরে বসেই কম্পিউটার কিংবা মোবাইল খুলে দেখে তার মূল্যায়ন করতে পারলে দ্রুত নির্ভুল ভাবে সেই পরীক্ষার ফলপ্রকাশ সম্ভব। এমনকি, ফলপ্রকাশের পর পড়ুয়ার নিজের উত্তরপত্র দেখার সুযোগের পাশাপাশি উত্তরপত্রের পুনর্মূল্যায়ন করাও দ্রুত সম্ভব এমন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়। কিন্তু কথায় আছে ‘যার শেষ ভাল তার সব ভাল’। ফলে এমন ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত ফলপ্রকাশ করতে গিয়ে প্রথম বছরেই হোঁচট খেল ওই নতুন ‘ওএসএম’ ব্যবস্থা। মনে রাখতে হবে, এ দেশের কেন্দ্রীয় বোর্ড সিবিএসই পড়ুয়ার সংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর অন্যতম বড় স্কুল বোর্ড। এ দেশের মাটিতে ২৭০০০ স্কুল এবং বিদেশের ২৬টি দেশে ২৪০টি স্কুলে অনুমোদিত এই বোর্ডের শিক্ষার মানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এ দেশের সার্বিক স্কুলশিক্ষার গুণমানের প্রশ্নটিও।
সাম্প্রতিক কালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে টি-২০’র ফরম্যাট বদলের মতোই পরীক্ষার প্রশ্নের ফরম্যাট বদলে গিয়েছে। হাল আমলে বিশ্লেষণী মেধার পরিবর্তে সমসাময়িক প্রয়োগধর্মী মেধা ও দক্ষতার উপরই জোর বাড়ছে। এমসিকিউ কিংবা ছোট ছোট উত্তরের প্রশ্নের ভিড় বাড়ছে প্রশ্নপত্রে। ফলে বাড়ছে পরীক্ষার প্রশ্ন এবং উত্তরের বৈচিত্র। ফলে পরীক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগী হতে হচ্ছে। নতুন ওএসএম পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষার পর পড়ুয়ার যাবতীয় উত্তরপত্র স্ক্যান করে কম্পিউটার সার্ভারে সংরক্ষিত করে ফেলতে হয়। সেই সংরক্ষিত উত্তরপত্রের ডিজিটাল কপি, শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য নিজের গোপন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তাঁর কম্পিউটার বা মোবাইল পর্দায় দেখতে পারেন কিংবা নম্বর দিতে পারেন ওই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষকের খাতা দেখার পর লাখ লাখ পড়ুয়ার ফলপ্রকাশ থেকে মেধাতালিকা তৈরি করা যায় অতি দ্রুত।
এই ব্যবস্থায় প্রাথমিক প্রয়োজন স্ক্যান করা উত্তরপত্রের প্রতিলিপির স্বচ্ছতা ও পাঠযোগ্যতা। কিন্তু এ বারের পরীক্ষায় পড়ুয়াদের স্ক্যান করা বেশ কিছু উত্তরপত্রে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চড়ার তথ্য মিলেছে। প্রমাণিত হয়েছে পরীক্ষকের দেওয়া নম্বরের অস্বচ্ছতা। ফলে ওই প্রযুক্তি নিবিড় ওএসএম পদ্ধতিতে ফলপ্রকাশের পর রাতারাতি ফেলের শতাংশ ৩.১৯% বেড়ে ফেল করা পড়ুয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২.৬ লক্ষ। এমনকি ওই ব্যবস্থায় উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের অভিযোগ নথিভুক্ত করার জন্য যে পোর্টালের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটিও ফলপ্রকাশের পর থেকে বিকল হয়ে যাওয়ায় ফল বিভ্রাটের আগুনে ঘি পড়ার মতোই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে গোটা দেশ জুড়ে।
যদিও ফলপ্রকাশের অব্যবহিত পরেই বোর্ডের কর্তা থেকে শিক্ষা মন্ত্রকের কর্তারা এমন বিভ্রাটকে আমল দিতেই চাননি। কিন্তু উত্তরোত্তর পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে ওঠায় স্বয়ং দেশের শিক্ষামন্ত্রীকে এই ঘটনার দায় স্বীকার করতে হয়েছে। ইতিমধ্যে বরখাস্ত হয়েছেন বোর্ডের কয়েক জন শীর্ষকর্তা। কিন্তু এমন প্রতীকী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করে জনরোষ প্রশমিত করার চেষ্টার থেকেও যে ব্যাধি সামনে এসেছে তার সমাধানসূত্র বার করাটাই এখন বেশি জরুরি। বিশেষত নতুন ওএসএম প্রযুক্তির বহু ফাঁকফোকর ইতিমধ্যে সামনে এসেছে, যেখানে প্রযুক্তির ঠুনকো নিরাপত্তা-জাল ভেদ করে যে কেউ সেই গোপন উত্তরপত্রের ভান্ডারে ঢুকে পড়তে পারছে, এমনটাই অভিযোগ। ফলে এমন গুরুতর ফল বিভ্রাটের অভিযোগের ঝাঁপি খোলার পর যারা ফেল করেছে কিংবা প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পেয়েছে— কেবল তাদের উত্তরপত্র নয়, যারা ভাল করেছে সেই ফলাফলও সন্দেহের তালিকায় চলে আসছে!
ইতিমধ্যে এই নতুন ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থার পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত সাম্প্রতিক অতীতে সেই সংস্থার তত্ত্বাবধানে তেলঙ্গানা স্কুল বোর্ডের একাদশ-দ্বাদশের পরীক্ষার ফলপ্রকাশের ক্ষেত্রে ৯৭ লক্ষ পড়ুয়ার মধ্যে ৩.২৮ লক্ষ পড়ুয়া ফেল করেছিল, যার ফলে ২০ জন পড়ুয়া আত্মহত্যা করেছিল। সেই ঘটনার তদন্ত নেমে ওএমআর শিট মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংস্থার প্রযুক্তিগত ত্রুটি ধরা পড়েছিল। তেলঙ্গানা হাই কোর্টে বিষয়টি গেলেও সেই এক সংস্থাকেই দেশের বৃহত্তম স্কুলবোর্ডের পড়ুয়াদের ফলপ্রকাশের দায়িত্ব দেওয়া হল। পরীক্ষায় ফলপ্রকাশের জন্য নিয়োজিত সংস্থার অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল। দেশের স্কুলশিক্ষার অন্যতম ‘লাইফ-লাইন’ কেন্দ্রীয় বোর্ডের এই ফল-বিপর্যয় দেশের বেসরকারি স্কুলশিক্ষার প্রতি মানুষের ভরসা টলিয়ে দিল।
সিবিএসই বোর্ডের পরীক্ষার ফল বিভ্রাটের পাশাপাশি স্মরণে রাখা জরুরি যে, দেশে এ বছরও মেডিক্যাল প্রবেশিকা নিট পরীক্ষা বাতিল হয়েছে প্রশ্ন ফাঁসের কারণে। দু’বছর আগেও নিট একই কারণে বাতিল হয়, তবু তার থেকে শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা এনটিএ। ইতিমধ্যে ২০২৪-এর প্রশ্ন ফাঁসের পর গঠিত রাধাকৃষ্ণন কমিটির শতাধিক সুপারিশ এখনও বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে। সেই সুপারিশগুলির অন্যতম ছিল পেন-পেনসিল দিয়ে ওএমআর শিট ব্যবহারের পরিবর্তে দেশ জুড়ে অনলাইন কম্পিউটার-নির্ভর পরীক্ষার আয়োজন করা, যেমনটা হয়ে থাকে জয়েন্ট এন্ট্রান্স এঞ্জিনিয়ারিং (মেন) পরীক্ষার ক্ষেত্রে। কিন্তু এ দেশে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার বিজ্ঞাপন ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচারিত হলেও গোটা দেশে মেরে কেটে দেড় লাখ পড়ুয়া এক দিনে অনলাইন পরীক্ষায় বসতে পারে। ফলে ‘নিট’ মেডিক্যালের মতো ২৩ লক্ষ পড়ুয়ার পরীক্ষা নিতে অন্তত দুই সপ্তাহ লেগে যাবে।
এত ফাঁকফোকর, এত সঙ্কট। তবু দেশের প্রশাসন কি আদৌ সমাধানের কথা ভাবছে? না বিতর্ক থামানোটাই আসল চিন্তা?
নির্মাণ প্রযুক্তি বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে