চূর্ণি নদী থেকে পদ্মা ও যমুনা, দু’টি খাল জন্ম নিয়ে এক সঙ্গে মিশে, গিয়ে পড়েছে ইছামতী নদীতে। খাল দু’টিকে স্থানীয় মানুষ নদীই বলেন। প্রাচীন কালে এই দুই নদী বেয়ে ব্যবসার নৌকা যেত, বজরা যেত। উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া ব্লকের চাতরা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রায় একটা গামলার মতো। বর্ষার যত জল জমে— তা এই দুই খাল বেয়ে বেরিয়ে যায়। এই দুইয়ের মাঝখানে প্রায় ৩০,০০০ লোকের চাষবাস। গত সাত-আট বছর বর্ষার পরে জল আর নামছে না। অগস্টে জল ওঠে, নামতে নামতে অক্টোবর। ফলে আমন ধানের চাষ বন্ধ। পদ্মা প্রায় বুজে এসেছে। কারণ তাতে বাঁধ দিয়ে মানুষ ব্যক্তিগত পুকুর বানিয়েছেন, চাতরা বাজারের সব আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতে, পিলার তুলে বেআইনি দোকান-বাড়িঘর বসেছে পদ্মার উপর। কচুরিপানায় বিপর্যস্ত নদীর গতি এবং তার জলধারণ ও নিকাশি ক্ষমতা। যেটুকু উঁচু জমি আছে, তাতে আনাজ ও রবি মরসুমের কিছু চাষই ভরসা কেবল। সম্প্রতি নদী সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এই নদী বেদখল ও শ্লথ হয়ে যাওয়ার সমস্যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে বলে স্থানীয় কৃষকরা আশা করছেন না।
একটি ব্যক্তিগত গল্প। অতি গ্রীষ্মেও কখনও আমার শান্তিনিকেতনের বাড়ির কুয়োর জল শুকিয়ে যায়নি। টানাটানি হলেও রাতে মাটির তলার জল চুইয়ে আবার তা ভরে যেত সকাল হতেই। গত দু’বছর ধরে আর তা হচ্ছে না। এর কারণ আশঙ্কা করছি আশপাশে অসংখ্য গভীর নলকূপ।
এই রকম নানা টুকরো ছবি আমাদের রাজ্যের নানা জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। যেখানে মানুষের কোপে পড়ে নদী, জঙ্গল, পাহাড় বিপর্যস্ত। তারা বিপর্যস্ত বলে স্থানীয় মানুষরাও বিপর্যস্ত। আর বিপর্যস্ত তাদের আশ্রয়ে থাকা পশুপাখিও। পুরুলিয়ায় ঝাড়ুখামার গ্রামের কাছে প্রস্তাবিত স্পঞ্জ আয়রনের কারখানা, কাঁঠালজোলের ড্যাম আর সাঁতরাগাছির ঝিলে ক্রমে কমতে থাকা পরিযায়ী পাখি। জঙ্গলে হঠাৎ লাগা আগুন, যার মূল উদ্দেশ্য জঙ্গল দখল বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা। তালিকায় রয়েছে উত্তরবঙ্গে রেলপথে মরতে থাকা হাতি, বীরভূমের বহুলচর্চিত কয়লাখনি, পাথরখাদানের আশপাশের গ্রামের মানুষের ক্রমবর্ধমান সিলিকোসিস— এ সব খবরে উঠে আসে মাঝেমধ্যে। আদিগঙ্গার উপরে ব্যারাজ নির্মাণেও শহুরে বন্যা কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নতুন উৎপাত হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর কলকাতা শহরের বাতাসের গুণমান সূচক (এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স) বেশ কিছু দিন ধরে ছিল তিনশোর উপরে। হাজার হাজার মরা মাছ ভেসে আসে জলপাইগুড়ির করলা নদীতে। আমাদের ঘরের পাশে পুকুরও কি চোখের সামনে ‘নেই’ হয়ে যায় না? এই সব খবর ভেসে ওঠে। তার পর কখন চাপা পড়ে যায়।
তবে আসল প্রশ্ন, প্রকৃতিকে ঘিরে এই সব বিষয় আদৌ আমাদের পঞ্চবার্ষিকী ভোটরঙ্গে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবে কি না। এ বিষয়ে এক মহীরুহসম ঔদাসীন্য আমাদের মধ্যে। এই উদাসীনতার সূত্র হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের ক্ষুদ্র ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের আড়ালে। প্রতি দিনের জটিলতায় আমরা এমন ব্যস্ত যে, হয় বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভুলে যাই অথবা তাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনতে পারি না। মনে হয় এ সমস্যা অতি দূরের, ভৌগোলিক দূরত্ব মানসিক দূরত্বও বাড়িয়ে তোলে বইকি! না কি মনে হয় আমাদের আর কতটুকু ক্ষমতা, না কি এই সমস্যার বিপুল ব্যাপ্তিকে দেখতেই পাই না আমরা?
আমরা সবাই বুঝি, অথবা না বোঝার ভান করি যে, জঙ্গল, জমি, নদী বুজিয়ে তৈরি করা এই মুনাফা আসলে মুষ্টিমেয় মানুষের মুনাফা। প্রাকৃতিক সম্পদ-নির্ভর মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে এই চটজলদি মুনাফার কোনও ভূমিকা নেই। এ-ও জানি যে, আমার হাওয়া, জল, স্বাস্থ্য বিষিয়ে যাওয়ার কারণও পরোক্ষে আমাদের প্রকৃতি ধ্বংস মেনে নেওয়া। আজ প্রাকৃতিক সম্পদকে যে ভাবে দেখা যাচ্ছে, তাতে আসলে দীর্ঘ সময়ের মানুষ-সহ গাছপালা পশুপাখি ইত্যাদি জীবন্ত উপাদানের ভূমিকা রয়েছে। আজ সেই ইতিহাস উপেক্ষা করে কেবল কিছু গোষ্ঠীর কাছে কেন তাকে তুলে দেওয়া হবে?
খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের অধিকারের সঙ্গে বিশুদ্ধ হাওয়া, নদীর পরিষ্কার জল, নানা গাছপালা পশুপাখি পূর্ণ চমৎকার একটা জঙ্গল, আমার কুয়োতে মে মাসের চড়া গরমেও ফিরে আসা জল কি আমার সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না? গাছপালা, পশুপাখির অধিকারের কথা তো তুলছিই না। কিন্তু প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় মানুষের এই অধিকারগুলির স্বীকৃতি কি আমরা চাইতে পারি না?
কোথায় আমাদের এই জল-জমি-জঙ্গলের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে ভোটপ্রার্থী সম্ভাব্য প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করি। ভোট চাইতে এলে যেন অনুরোধ রাখি আমার পাড়ার পুকুরটি বাঁচিয়ে রাখতে, প্রাচীন বটবৃক্ষটি বাঁচিয়ে রাখতে। দলের মুখপাত্রদের কাছে আমার অঞ্চলে কী কী পরিবেশগত সমস্যা রয়েছে তার সমাধানের আগাম আর্জি জানিয়ে রাখি। নজর রাখি, তা আসছে কি না নির্বাচনী ইস্তাহারে, প্রতিশ্রুতিতে এবং প্রচারে। তার পর প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন হল কি না সে দিকেও নজর রাখি। কারণ সরকারের পাঁচ বছর নয়, এই প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে ভরসা করেই আমাদের কাটাতে হবে অনেক অনেক জীবন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে