প্রবন্ধ ২

‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’? ভুল এবং বিপজ্জনক

বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই ব্যাপারটা নিতান্তই সোনার পাথরবাটি। খামখা এই ধুয়ো নিয়ে পড়ে থাকলে কংগ্রেস-সিপিআইএম জোটের ক্ষতি হবে। কথাটা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির বোঝা দরকার।বা মফ্রন্ট ও কংগ্রেস ও এই দুইয়ের বাইরে কিছু সংগঠন ও ব্যক্তির মৈত্রীর যে মঞ্চ তৈরি হয়ে উঠেছে তাতে নতুন একটা কথা জুড়ে দিচ্ছেন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। তিনি বলছেন, কিছু আসনে ওই আসনরফার মধ্যেও ‘বন্ধুত্বমূলক লড়াই’ হবে। অধীররঞ্জন এই প্রয়োজনীয় মৈত্রীমঞ্চের প্রধানতম কারিগরদের এক জন। তাঁকে প্রদেশ কংগ্রেসের ভিতরেও সহকর্মীদের নিজের মতে আনতে হয়েছে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৬ ০০:২৭
Share:

বা মফ্রন্ট ও কংগ্রেস ও এই দুইয়ের বাইরে কিছু সংগঠন ও ব্যক্তির মৈত্রীর যে মঞ্চ তৈরি হয়ে উঠেছে তাতে নতুন একটা কথা জুড়ে দিচ্ছেন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। তিনি বলছেন, কিছু আসনে ওই আসনরফার মধ্যেও ‘বন্ধুত্বমূলক লড়াই’ হবে। অধীররঞ্জন এই প্রয়োজনীয় মৈত্রীমঞ্চের প্রধানতম কারিগরদের এক জন। তাঁকে প্রদেশ কংগ্রেসের ভিতরেও সহকর্মীদের নিজের মতে আনতে হয়েছে। যেটা সম্ভবই হত না যদি কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতাদেরও তিনি নিজের মতে না আনতে পারতেন। অধীররঞ্জনকে তাঁর পার্টির ভিতরে যে সব বাধা উতরোতে হয়েছে, সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রকেও প্রায় সেই সেই বাধাই পেরোতে হয়েছে। তাঁরা দু’জনেই সেই স্তরে একটাই রাজনৈতিক সূত্রের ভাষায় কথা বলেছিলেন: মানুষের জোট হয়ে গেছে, সেটাকে রাজনৈতিক জোটে পরিণত করতে হবে।

Advertisement

সেই রাজনৈতিক মঞ্চের শক্তপোক্ত খুঁটি যখন গাড়া হয়ে গেছে, সেই মঞ্চের স্বীকৃত প্রার্থীরা যখন তাঁদের প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন, প্রাথমিক প্রচারের সেই ধাক্কাতেই যখন ‘তৃণমূল’ ছত্রখান হয়ে পড়েছে, এক কথার মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁর নির্বাচনী স্লোগানকে ‘উন্নয়ন’ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছেন ‘অনৈতিক জোটের বিরুদ্ধে’, যখন সকালে কেরলে সব আসনে তৃণমূল প্রার্থী দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট-কংগ্রেস রাজনৈতিক মৈত্রীকে বেকায়দায় ফেলার পরোক্ষ কৌশল বিকেলেই প্রত্যাহার করতে হয়, যখন ভোটের একেবারে মুখে তৃণমূলের বিভিন্ন উপদলের ভিতরের রেষারেষি প্রকাশ্য খুনোখুনিতে পরিণত হয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে তৃণমূল আসলে কোনও রাজনৈতিক পার্টিই নয়— বিভিন্ন আর্থিক স্বার্থের কতকগুলি ঘোঁটের দল, যার এক একটি ঘোঁটের মাথায় এক এক জন মন্ত্রীস্থানীয় নেতা আছেন মাত্র, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, ‘কেউ চুরি করে থাকলে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, দলের কোনও ব্যাপার নয়’ মেনে নিয়ে মদন মিত্রের পরিবার তাঁর ভোটপ্রচার করছেন আর তৃণমূল তা থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছে, যখন মদন মিত্রকে প্রার্থী করায় এই সন্দেহ সত্যে পরিণত হচ্ছে যে মদন মিত্র যাতে সারদা কেলেঙ্কারিতে তৃণমূলের উচ্চতম নেতাদের জড়িয়ে না ফেলেন সেই উদ্দেশ্যেই তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে, তখন, ঠিক তখনই অধীররঞ্জন বলে বসেছেন, সাত-আটটি আসনে বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই হবে।

অধীররঞ্জন তো মাটিতে পা রেখেই রাজনীতি করেন। মানুষজনের আস্থা তাঁর ওপর আছে বলেই মুর্শিদাবাদকে তিনি সিপিআইএম ও তৃণমূল, দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের পক্ষে রক্ষা করে আসছেন প্রায় সারা জীবনই। তিনি কি বোঝেন না, কোনও লড়াই যদি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ হয়, তা হলে মেনে নিতেই হবে ওই ‘লড়াইটা’ আসলে জালি বা ওই ‘বন্ধুত্ব’টাই জালি? তিনি কি বোঝেন না, ওই সাত-আটটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ হয়ে দাঁড়াবে ভাঙা বেড়া দেখানো? অঘোষিত কত গোঁজ তৈরি হবে কত আসনে। তৃণমূলও ভোটের কৌশল হিসেবে কংগ্রেস থেকে কত গোঁজ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

Advertisement

তৃণমূলের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা যে প্রবল, তার নিশানা এখন তিনটি। এক, অঙ্ক। দুই: তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া। তিন, তৃণমূল-বিরোধী রাজনৈতিক মৈত্রীর প্রধান শরিক কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া।

এই তিন নম্বর নিশানাটা টের পেয়ে গেছেন বলেই অধীররঞ্জন ভোটের পরের বিধানসভায় নিজেদের সদস্যসংখ্যা এই শেষ বোঝাপড়ায় বাড়িয়ে নিতে চাইছেন। তেমন একটা বাজে চেষ্টায় তিনি আলোচনা থেকে সরে গিয়ে সোমেন মিত্র-প্রদীপ ভট্টাচার্যদের এগিয়ে দিয়ে নিজে আড়ালে থেকে নতুন দর কষাকষি করছেন।

এতে তাঁর ক্ষতি হচ্ছে তো বটেই— তিনি আর ‘মৈত্রী’র প্রধান নির্মাতা থাকতে পারছেন না, হয়ে যাচ্ছেন ছোট-রাজনীতির মানুষ। কিন্তু তিনি আরও বড় ক্ষতি করছেন বামফ্রন্ট-কংগ্রেস ও অন্যান্য মৈত্রী-মঞ্চের। যে মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে, অধীরবাবু সেই মঞ্চের সুযোগে নিজের দলের আখের গোছাতে চাইছেন। এই মুহূর্তে তো তাঁর ঘোষণা করা দরকার: কোনও ‘লড়াই’ই বন্ধুত্বপূর্ণ হবে না, সব লড়াই হবে সরাসরি।

এখন তো ভোটারদের কাছে গণতান্ত্রিক মঞ্চের এই সরল ও সাদাসিধে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে দেওয়া দরকার যাতে ঠিক এই কথাগুলির জবাব দিতে তৃণমূল বাধ্য হয়। তাঁরা এই কথাগুলির বা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের ব্যর্থতা, আপাদমস্তক ব্যর্থতা, প্রমাণ করে ফেলবেন। অধীররঞ্জন যে সময়টা নষ্ট করছেন, সেটি বড় মূল্যবান।

গণতান্ত্রিক মঞ্চ শুধু এই কথাগুলিই বলুন না: তাঁরা যে সরকার করবেন সেই সরকারে— পুলিশই পুলিশ থাকবেন, ডাক্তাররাই ডাক্তার থাকবেন, ছাত্ররাই ছাত্র থাকবেন, এমএলএ-রা বিধানসভার ভিতরে এমএলএ থাকবেন, মন্ত্রীরা দফতরেই মন্ত্রী থাকবেন ও কোনও উদ্বোধন-শিলান্যাস করবেন না, আর সবচেয়ে বড় কথা, সবার সবচেয়ে বড় কথা— মেয়েরা মেয়ে হলেও মানুষ থাকবেন, অমানুষদের শিকার হবেন না, মধ্যরাতেও দক্ষিণ কলকাতার কোনও হলে রাতের শো দেখে বাসে চড়ে উত্তর কলকাতায় ফিরতে পারবেন সেই ফিল্মের কোনও গান গুনগুনিয়ে। আগে তো সবাই মিলে বেঁধে থাকা। তার পর তো উন্নয়ন আর উৎসব।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement