অনুভবে তিনি আছেন? না কি শুধুই অলঙ্কার? প্রশ্নগুলো সত্যিই কঠিন!

তিস্তাপাড়ে দোলপূর্ণিমার রাতে ‘জ্যোস্নারাতে সবাই গেছে বনে’। সে গান গেঁথে রয়েছে মনে, কিন্তু অনুভূতিতে কতটা জায়গা ছেড়েছি রবীন্দ্রনাথকে? লিখছেন শুভময় সরকারকেন জানি না, উত্তরবঙ্গের পরই যদি কোথাও প্রাণের আরাম পাই, সেটা শান্তিনিকেতন।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৯ ০৪:২৩
Share:

বেশ কিছু বছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। সদ্য অনার্স ক্লাসে ভর্তি হয়েছি কলেজে, জলপাইগুড়ি শহরে। করলা নদীর পাড়ে থাকি কলেজ-হস্টেলে। নদী পেরলেই ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক। করলা তিস্তারই শাখা। তিস্তা এবং করলা এই দুই নদী জলপাইগুড়ির জনজীবনে দারুণ ভাবে মিশে রয়েছে। তিস্তা নিয়ে কত-কত গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। সেদিন ছিল দোলপূর্ণিমার রাত! পাগল করা সময়! আর সে বয়সটা তো আউল-বাউল হওয়ারই! তিস্তার পাড়ে কিংসাহেবের ঘাটে বসে নদীর বুকে নষ্ট হয়ে যাওয়া চাঁদ দেখতে দেখতে বেশ রাত অবধি গান শুনছিলাম উদাত্ত এক কণ্ঠে। হস্টেলে ফিরেছিলাম অনেক রাতে!

Advertisement

অন্য শহর থেকে জলশহরে পড়তে এসে সঙ্গী জুটেছিল অনেক, কিন্তু বন্ধু তখনও হয়নি সে ভাবে। কাঁচরাপাড়ার ছেলে উদয় সিংহ রায়কে বেশ কাছ থেকে পেলাম হস্টেলে। অসাধারণ গলা উদয়ের। স্বাভাবিক ভাবেই গড়ে উঠল নিবিড় সখ্য। দোলপূর্ণিমার সে রাতে শুনিয়েছিল উদয় ‘আমি কান পেতে রই’, ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে’— এমনই কত গান! কিছু স্মৃতি মনের গভীর-গহন কোণে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। সেই পূর্ণিমার রাত আমার মনে ঠাঁই নিয়েছে চিরতরে। উদয় এখন কোথায়, জানা নেই। স্মৃতির কথকতায় সে সব দিন নাড়া দেয়!

দ্বিধাজড়ানো এই সময়ে, এই আকালের দিনেও আমরা যারা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি, তাদের এক নিবিড় আশ্রয়স্থল রবীন্দ্রনাথ। সুখে-দুঃখে, স্বজনে-বিজনে তাঁকে নিয়েই বেঁচে থাকা। এমন নির্ভরতা যাঁর প্রতি, তিনি কি আমার মতো নগণ্য অক্ষরকর্মীর ‘ব্যকগ্রাউন্ড’? না বোধ হয়! সেখানে তো আমি একা, নির্জনযাত্রায় থাকি! প্রিয় কথাকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ যেমন বলেছিলেন— কোনও লেখকের ব্যাকগ্রাউন্ড রবীন্দ্রনাথ নাই-বা হলেন, সেটা জরুরিও নয়; তবুও তিনি আমাদের আপনজন, আমাদের দুঃসময়ের আশ্বাস, কখনও-বা ঈশ্বরের প্রতিভাস!

Advertisement

আমার এবং আমার মতো বহুজনের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে প্রকাশিত, মাঝে খয়েরি ফ্ল্যাপ দেওয়া, বাদামি রঙের রবীন্দ্র রচনাবলির সেই শতবর্ষ সংস্করণের হাত ধরে। নূন্যতম মূল্যে বাঙালির ঘরে ঘরে রবীন্দ্রগ্রন্থ পৌঁছে দেওয়ায় উদ্যোগী হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। সেই সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় শৈশব থেকে। যেদিন থেকে বোধবুদ্ধি সামান্য হলেও শুরু, সেদিন থেকেই শ্বাসপ্রশ্বাসে তিনি কখন কী ভাবে যে ঢুকে গেলেন, নিজেও বুঝতে পারিনি। ‘বীরপুরুষ’, ‘বন্দিবীর’, ‘কাগজের নৌকো’য় যে রবীন্দ্রযাত্রা শুরু, আজ জীবনের অনেকটা সময় পার হয়ে এসেও তিনিই আমার নিবিড় আশ্রয়। আমার জীবনে প্রথম মঞ্চে দেখা রবীন্দ্রনাটক ‘রক্তকরবী’ এবং তারপর ‘রাজা’, বহুরূপীর। সেই কৈশোরে ‘ডাকঘর’, ‘কাবুলিওয়ালা’ চোখের জলে বুক ভিজিয়েছিল! আর যত বড় হতে লাগলাম, তাঁর গান হয়ে উঠল পরম নির্ভরতার জায়গা!

কেন জানি না, উত্তরবঙ্গের পরই যদি কোথাও প্রাণের আরাম পাই, সেটা শান্তিনিকেতন। মাটির রং আলাদা, ভূ-প্রকৃতি আলাদা, কথার ভঙ্গিমাও এক নয়। বীরভূমের মতো রুক্ষমাটি এই উত্তরের জনপদের নয়, তবুও প্রশান্তি যেন একই রকম! আর রবীন্দ্রনাথও তো বার বার এসেছেন, থেকেছেন এই উত্তরে। মংপু আর রবীন্দ্রনাথ যেন একাকার। মংপুতে থাকাকালীন সন্ধেবেলা বসে সামনের পাহাড়ে জ্বলে ওঠা আলোগুলো দেখতেন, চারিদিকে রাতের অন্ধকারের মধ্যে পাহাড়ের গায়ে মিটমিট করে জ্বলে ওঠা আলো দেখে বলতেন, ‘আশ্চর্য লাগে ভাবতে, ওখানেও মানুষের জীবনযাত্রা চলছে। এই রকম ছোট ছোট তাদের ঘর। কী রকম তারা মানুষ, কী রকম তাদের জীবনযাত্রা, কিছুই জানিনে, শুধু গভীর অন্ধকারের মধ্যে এতটুকু আলো, প্রাণের আলো (তথ্যসূত্র: পাহাড়ে রবীন্দ্রনাথ/রতন বিশ্বাস)! পাহাড় থেকে ইন্দিরা দেবী, অমিয় চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠি পড়লেই অনুভব করা যায় উত্তরের পাহাড় তাঁকে কতটা টেনেছিল। পাহাড় থেকে সমতলে ফেরার সময় কবি বলতেন, ‘সামনের পাহাড়ের বুকে সবুজ বন্যা, ওই উদ্ধত গাছ, দূরের পথে পাহাড়িয়াদের যাতায়াত, সিঁড়ির টবে জিরেনিয়াম, সন্ধেবেলা আলো জ্বেলে ইঙ্গিত, সবই মনে পড়বে।’

আমার-আমাদের শহরেও তো পা রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ! দার্জিলিং পাহাড়ে যাওয়ার পথে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনের পুরনো অংশ, আজ যা অনাদরে-অবহেলায় পরিত্যক্ত, হ্যাঁ, ওখানেই তো নামতেন তিনি! আমরা, এই উত্তরজনপদের বাসিন্দা হিসেবে অহঙ্কারী হয়ে উঠতেই পারি! কিন্তু হয়েছি কি? ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী কতটা হতে পেরেছি আমরা? কতটা ভালবেসেছি অহঙ্কারের জায়গাগুলোকে? অযত্নে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যমণ্ডিত শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন! কোনও সভ্যদেশে

এ সব অকল্পনীয়!

আসলে, এ সব আপাতমাত্র! আসল সমস্যা অনুভূতির দৈন্য! তাঁর সুদীর্ঘ ছায়ায় বাস করে আমাদের যে রবীন্দ্রপ্রেম, তা অনেকাংশেই বাহ্যিক অলঙ্কার মাত্র! অনুভবে, বোধে, মননে তিনি কোথায়?

প্রশ্নগুলো রয়েই যায়!

(লেখক শিলিগুড়ির জগদীশচন্দ্র বিদ্যাপীঠের ইংরেজির শিক্ষক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন