‘কথা কয়ো নাকো...’
‘হেমন্ত ৯৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পরদেশি কোথা যাও থাম গো হেথা’ গানটি তাঁকে সেই চল্লিশের দশকে বাংলা গানের শ্রোতাদের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিল (কলকাতার কড়চা, ২৬-৬)। এই প্রসঙ্গে আর একটু আলোকপাত হওয়া দরকার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে প্রথম জনপ্রিয়তা এনে দেয় ১৯৪৩ সালে ‘কথা কয়ো নাকো শুধু শোনো’ গানটি। কবি-গীতিকার অমিয় বাগচীর লেখা এই গানে সুরারোপ করেছিলেন স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এটাই তাঁর নিজের সুরে গাওয়া প্রথম গান। অমিয় বাগচী ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। এর নেপথ্যে একটি কাহিনি আছে। হেমন্ত এবং তাঁর বন্ধুরা এক সঙ্গে ট্রেনে করে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ট্রেনের মধ্যে প্রায় সবাই এক সঙ্গে জোরে কথা বলছিলেন। ফলে কেউই কারও কথা ঠিকঠাক শুনতে পারছিলেন না। তখন সবাইকে শান্ত করার জন্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায় দীপ্তকণ্ঠে বলে উঠলেন— ‘কথা কয়ো নাকো শুধু শোনো’। ব্যস, ওষুধের মতো কাজ হল। পরিবেশ শান্ত হল। এটা অমিয় বাগচীর খুব মনে ধরেছিল। তখন তিনি কবি হওয়ার পথে। কথাটা লিখে রাখলেন। পরে এই কথা ধরে আস্ত একটা গান লিখে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দেখালেন। এই গানটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্বর্ণকণ্ঠে ইতিহাস সৃষ্টি করে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা ‘কথা কয়ো নাকো...’ গান দিয়ে প্রিয়তমাদের জন্য প্রেমার্ঘ্য সাজিয়ে রাখত। আরও একটি গান ছিল ‘আমার বিরহ আকাশে’। ‘কথা কয়ো নাকো...’র স্মৃতিকে উসকে দিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ১৯৮০ সালে এল পি রেকর্ডে রিমেক করেছিলেন। সেই রিমেক গানটিও অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। ১৯৪৩ সালেই প্রকাশিত প্রণব রায়ের কথায় ও শৈলেশ দত্তগুপ্তের সুরে ‘পরদেশি কোথা যাও...’ গানটিও অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এবং সঙ্গে ছিল ‘আকাশে দুটি তারা’ গানটি। মজার কথা, এই রেকর্ডটি প্রথমে ওডিয়ান কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে জনপ্রিয়তার জোয়ার দেখে কলম্বিয়া কোম্পানিও নতুন করে গান দুটি প্রকাশ করে। এবং ‘পরদেশি কোথা যাও...’ গানটিও হেমন্ত ১৯৮০ সালে ‘কথা কয়ো নাকো...’ গানটির সঙ্গেই এল পি রেকর্ডে রিমেক করেছিলেন।
বিশ্বনাথ বিশ্বাস কলকাতা-১০৫
ঠাঁই নেই
সোমা মুখোপাধ্যায়ের (‘নাম যে রেজাউল...’, ২৬-৬) লেখা পড়ে মনে হল, সাম্প্রদায়িকতার বিষ আমরা এখনও বুকের মধ্যে লালন করে রেখেছি৷ পারস্পরিক বিভেদের আর এক নাম তো ধর্ম নয়, ধর্ম মানে তো বিদ্বেষ নয়৷ শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের গফুর সমাজে যে অবহেলার শিকার হয়ে আমিনাকে সঙ্গে নিয়ে শহরে পাড়ি জমিয়েছিল, সেই শহরও আজ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কাঁটায় বিদ্ধ৷ একটি সম্প্রদায়কে আর একটি সম্প্রদায় প্রায় সব সময় একঘরে করে রেখেছে, আর সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গ এলে নির্বিচারে তাদের দোষ দিয়ে এসেছে, এটাই বাস্তব চিত্র৷ শুধু রেজাউলবাবু কেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষই হিন্দু পাড়ায় জায়গা পান না৷ নানা অছিলায় তাঁদের ফেরত পাঠানো হয়৷
শিক্ষা কি সত্যিই চেতনা আনছে! একই ভাষাভাষী সব সম্প্রদায়ের মানুষের একই সঙ্গে বাস করাতে কী অসুবিধা? আঘাত আর অবহেলা মানুষকে কঠিন করে, অন্য রকম কিছু ভাবতে প্রেরণা জোগায়৷ মৌলবাদী শিবির এটাকেই মূলধন করে৷ ধর্মীয় জিগির দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই বর্তমান, দূরে সরিয়ে রেখে তাকে বাড়তে দিলে বিপদ বাড়বে৷ শুধু ইফতার পার্টিতে গেলেই সম্প্রীতি রক্ষা হয় না, অন্য বিষয়গুলোও প্রাসঙ্গিক, তা দেখতে হবে৷
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় কালনা, পূর্ব বর্ধমান
শহুরে গোঁড়ামি
এই লেখা পড়ে আমার নিজের ঘটনা মনে পড়ল। নিউ টাউনের এক সমবায়ের আবাসনের সদস্য পদ বিক্রি হচ্ছিল। প্রাথমিক কথাবার্তার পর নাম জেনেই নাকচ। দক্ষিণ কলকাতার এক আবাসনে বিক্রেতার বিজ্ঞাপনের প্রেক্ষিতে যোগাযোগ করলে তিনি সম্পত্তির বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। কিন্তু আমার নাম জেনেই নাকচ। কোনও যথার্থ কারণ দেখালেন না। শুধুমাত্র বললেন ‘অসুবিধা আছে’।
আসলে এটা একটা শহুরে মানসিক সমস্যা। আমরা যতই নিজেদের প্রগতিশীল বলে জাহির করি না কেন, আমাদের মনের অবচেতন কোণে কোথাও না কোথাও এই গোঁড়ামি রয়েই গিয়েছে। নিশ্চিত করে বলতে চাই, এটা শহুরে মানসিকতা। কলকাতার বাইরে যে বৃহৎ পশ্চিমবঙ্গ, সেখানে এই ধরনের মানসিকতার কোনও স্থান নেই। তবে কি আমাদের শহুরে জীবন, সভ্যতা এবং মানসিকতায় আর বাঙালির সংস্কৃতির ছোঁয়া নেই? ভাবার সময় হয়েছে।
শেখ মোহাম্মদ আলী কলকাতা
দুঃখের, লজ্জার
বিস্মিত হইনি। মফস্সল থেকে কলকাতায় পড়তে আসা হাজারও ছাত্রছাত্রীর এহেন অভিজ্ঞতা আছে। অনেকেই আবার নিজের নাম গোপন করে চলনসই হিন্দু নামে পরিচয় দিয়ে থাকার ঠাঁই খোঁজেন। এ সমস্যা যে দীর্ঘ দিনের, তা সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অভিজ্ঞতার উল্লেখে বিবৃত হয়েছে। শুধু বাড়ি ভাড়া নয়, কোথাও বাড়ির জন্য এক টুকরো জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে গেলেও ‘এখানে হবে না’ বা ‘এ পাড়ায় চলবে না’-গোছের কথা বা প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। এ ঘটনা দুঃখের, লজ্জারও। সময় এগিয়েছে, ‘শিক্ষা’ বেড়েছে, মন কিন্তু সেই অর্থে প্রসারিত হয়নি। বরং, অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে।
অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি, কলকাতার বাইরে জেলা সদরগুলিতেও এই চিত্র সমান ভাবে বর্তমান। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, রেজাউল চিকিৎসক। উচ্চশিক্ষিত। প্রতিষ্ঠিত। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বা ডাক্তার রেজাউলের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটলে সাধারণ্যে কী ঘটে, তা সহজেই অনুমেয়। উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, একদা এই পত্র লেখককেও কলকাতার টালিগঞ্জ অঞ্চলে কিছু দিনের জন্য আকমল হোসেন থেকে কমল সেন হতে হয়েছিল।
আকমল হোসেন (জাতীয় শিক্ষক), চালতিয়া, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ
পাক্কা হিন্দু
রেজাউল করিমের ঘরভাড়া পাওয়া বিষয়ক খবর পড়ে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল। এ নিয়ে তিনি ফেসবুকেও একটি পোস্ট দিয়েছেন। যদিও আমাদের এই ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ, সম্প্রীতির দেশের আনাচকানাচে আকছার ঘটে চলেছে এই জাতীয় ন্যক্কারজনক ঘটনা, তবুও আমরা তুলো কানে গুঁজে দিব্য আছি। এ রকম বেশ কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনার উল্লেখ করি।
১৯৭৮-৭৯ সাল নাগাদ আমি বছরখানেক কর্মসূত্রে বাঘাযতীন স্টেশন সংলগ্ন একটি বাড়িতে ভাড়া ছিলাম। সঙ্গে আরও তিন জন। আমি বাদে বাকিরা বিজ্ঞানের গবেষক। চার জনেই পাক্কা হিন্দু— এই সুবাদে ঘরভাড়া পেয়েছিলাম। আমাদের মধ্যে বর্ধমানের ‘দেবু’-দাও ছিলেন। সাহা ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদ্যার সনিষ্ঠ গবেষক।
আমরা বেশ মজায় দিন কাটাতাম। বাড়িটিতে প্রায়ই কীর্তন লেগে থাকত। তা নিয়ে আমরা মশকরাও করতাম। দেবুদা খুব একটা কিছু বলত না। প্রায় ন’মাস পর জানতে পারি, দেবুদা আদতে ‘জামাল’দা। ভেতর ভেতর কুঁকড়ে যাই সে দিন। জামালদার সামনে খুব ছোট মনে হয়েছিল নিজেকে। তার পর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি আমার। যে যার মতো ছিটকে গেছি। মনে থেকে গেছে সেই সহবাস! ইদ-উল-ফিতর’এর দিন ফেসবুক ছেয়ে গিয়েছিল মুসলমান ভাইদের প্রতি হিন্দু ভাইদের মোবারক জ্ঞাপনে। হাসি পায়।
বিপ্লব বিশ্বাস কলকাতা-৫৯
চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।
ই-মেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়