শিয়ালদহ-সহ দেশের বিভিন্ন জংশন চত্বরের চিরপরিচিত ব্যস্ততার আড়ালে প্রতি দিন নিঃশব্দে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক অপচয়, যা আমরা অনেক সময় দেখেও দেখি না। লরি বা ট্রেন থেকে ফল বা খাদ্যসামগ্রী স্থানান্তরের সময়ে সামান্য অসাবধানতায় থেঁতলে যাওয়া তরমুজ, পেঁপে বা অন্যান্য ফলমূল চিরাচরিত বাণিজ্যিক নিয়মে আজও ব্রাত্য। অথচ, এই ‘বিশ্রী’ ফলগুলোই হতে পারত কোনও অভুক্ত শিশু বা অনাথের বেঁচে থাকার প্রধান রসদ। রাস্তার ধুলোবালিতে পড়ে থাকা ফলটির সামান্য লাল অংশ কোনও পথশিশুর খুঁটে খাওয়ার করুণ দৃশ্য আজও আধুনিক ভোগবাদী সভ্যতার নিষ্ঠুরতা ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানসিকতাকেই প্রকট করে।
২০২২ সালের রাষ্ট্রপুঞ্জের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজ়েশন (এফএও)-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রাহকের হাতে পৌঁছনোর আগেই নষ্ট হয়। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২৫ অনুযায়ী, ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০২তম, যা সূচক অনুযায়ী উদ্বেগজনক। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিনে এমন অপচয় আমাদের খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নীতিগত এবং পরিকাঠামোগত খামতির প্রতীক। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র এক কেজি তরমুজ ফলাতে প্রায় দু’শো-তিনশো লিটার পরিস্রুত জল, রাসায়নিক সার ও কৃষকের অমানুষিক শ্রম ব্যয় হয়। ফল নষ্ট হওয়া মানে প্রকারান্তরে কৃষকের ঘাম ও সীমিত জলসম্পদের অপমৃত্যু।
এই অপচয় রোধে সরকারি উদ্যোগে বা ‘ফুড ব্যাঙ্ক’-এর মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত শৃঙ্খল গড়ে তোলা জরুরি। এই সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত ফলগুলো সংগ্রহ করে যদি ‘পথের ক্যান্টিন’ বা অনাথ আশ্রমে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে প্রান্তিক শিশুরা প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের জোগান পাবে। মনে রাখা প্রয়োজন, অপচয় হওয়া প্রতিটি ফল মানে কেবল একটি খাদ্যের নষ্ট হওয়া নয়, বরং একটি ক্ষুধার্ত মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া। এই ফলগুলি বিষ নয়, কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের অভাবে বর্জিত। সঠিক বণ্টন ও প্রশাসনিক সদিচ্ছাই পারে এই অপচয় রুখে ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন তুলে দিতে। অন্যথায়, প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় লুটানো এই ফলগুলি আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতা ও বিবেকের পচনকেই বার বার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে।
শুভজিৎ বসাক, কলকাতা-৫০
অবহেলিত
সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন সমগ্র রাজ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, প্রতিশ্রুতি ও জনমত যাচাইয়ের আবহে মুখর ছিল, তখন গভীর উদ্বেগ ও বেদনায় এই পত্রের অবতারণা। কারণ, এই বিস্তৃত আলোচনার পরিসরে বিশেষ ভাবে সক্ষম নাগরিকদের কণ্ঠস্বর কার্যত অনুপস্থিত ছিল।
নির্বাচনের আগে সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সংস্থা সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া, ক্ষোভ ও প্রত্যাশা জানতে সচেষ্ট হয়। কোথাও পরিবর্তনের দাবি, কোথাও বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি আস্থা, কোথাও বিভিন্ন ভাতা প্রকল্পের উপযোগিতা নিয়ে আলোচনা— সবই সামনে আসে। কিন্তু আমাদের মতো বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষের বাস্তবতা, আমাদের প্রতি দিনের সংগ্রাম— সেগুলি এই গণআলোচনায় স্থান পায় না। আমাদের নাগরিক সত্তার মূল্য কি এতটাই নগণ্য?
ভোটগ্রহণের দিনে আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন কিছু ব্যবস্থা করে— র্যাম্প, হুইলচেয়ার, সহায়ক কর্মী ইত্যাদি। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা সাময়িক। ভোটের দিন ছাড়া বছরের বাকি সময়ে আমাদের জীবনযাত্রার বাস্তব সমস্যা— পরিকাঠামোর অভাব, চলাচলের অসুবিধা, সামাজিক বৈষম্য— এ সব কি নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আসে?
শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো এখনও অপ্রতুল। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা— এ সবের অভাব আমাদের শিক্ষাগত অগ্রগতিকে বাধা দেয়। ফলে, বহু মেধাবী শিক্ষার্থী সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই সঙ্কট। নিয়মিত থেরাপি, পুনর্বাসন, এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা— এ সব পরিষেবা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যয়বহুল এবং সহজলভ্য নয়। সরকারি পরিকাঠামো এখনও প্রতিবন্ধী-বান্ধব নয়, যা আমাদের আরও প্রান্তিক করে তোলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কর্মসংস্থান। আমরা করুণা নয়, কাজ চাই— স্বনির্ভরতার অধিকার চাই। অথচ বাস্তবে, বিশেষ ভাবে সক্ষমদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত এবং প্রায়শই অপ্রতুল। সংরক্ষণ নীতির যথাযথ প্রয়োগও দেখা যায় না। আর যাঁরা কাজ করতে অক্ষম, তাঁদের জন্য যে মানবিক পেনশন প্রদান করা হয়— মাসিক এক হাজার টাকা— তা বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে খুবই কম। এই সামান্য অর্থ দিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন তো দূরের কথা, ন্যূনতম জীবনধারণও কঠিন।
গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ কেবল ভোটাধিকার নয়, সমান সুযোগ, সমান অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। যদি রাষ্ট্র আমাদের ভোট প্রত্যাশা করে, তবে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আমাদের জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলি নিশ্চিত করা এবং আমাদের উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ করা।
সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের কাছে আবেদন— বিশেষ ভাবে সক্ষমদের আর প্রান্তিক করে রাখবেন না। আমাদের জন্য সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা এবং আন্তরিক উদ্যোগ। নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে আমাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করুন এবং একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলুন।
আমরা শুধুই ভোটার নই— আমরাও এই দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
কৌশিক বিশ্বাস, জালালখালি, নদিয়া
পেনশন পাইনি
আমি ২০২০ সালের শেষে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চশিক্ষা সংসদ থেকে ‘ক্যাশিয়ার’ পদে অবসর গ্রহণ করি। দুঃখের সঙ্গে জানাই, অবসরের পর সাড়ে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমি আমার প্রাপ্য পেনশন পাইনি। এই বঞ্চনা শুধু আমার একার নয়। আমার বহু সহকর্মী যাঁরা ২০১৮ সালে অবসর নিয়েছেন, তাঁরাও এখনও পেনশন থেকে বঞ্চিত। তাঁদের মধ্যে এক জন ইতিমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন— তাঁর পরিবার চরম আর্থিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আর এক জন দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছেন, কারণ পেনশনের অভাবে ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই।
সারা জীবন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালনের পর শেষ বয়সে এই আর্থিক অনিশ্চয়তা আমাদের অসহায় করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট দফতরে বার বার আবেদন-নিবেদন করেও কোনও সুরাহা মেলেনি। ফাইল কোথায় আটকে আছে, কেন এই অমানবিক বিলম্ব— তার কোনও জবাব নেই। বিষয়টি রাজ্য সরকার ও উচ্চশিক্ষা দফতরের নজরে আনতে চাই যাতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের বকেয়া পেনশন অবিলম্বে চালু করা হয়।
স্মৃতি রঞ্জন সরকার, কলকাতা-৬৭
আসন বৃদ্ধি
সাধারণ প্রাইভেট বাসগুলিতে বয়স্কদের জন্যে দু’টি মাত্র বসার আসন নির্দিষ্ট করা থাকে। এর ফলে ভিড় বাসে অনেক বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হন, বসতে পারেন না। এঁদের কথা ভেবে যদি প্রাইভেট বাসে অন্তত ছ’টি আসন বয়স্কদের জন্য নির্দিষ্ট করা যায়, তা হলে এই প্রবীণদের কষ্ট একটু লাঘব হয়। আশা করি রাজ্যের পরিবহণ দফতর বিষয়টি ভেবে দেখবে এবং সেইমতো ব্যবস্থা করবে।
রূপেন মোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা-১২২
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে