অশোক কুমার লাহিড়ীর ‘টাকা আসবে কোথা থেকে’ (১৬-৪) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। কর্মসংস্থানের সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি, বেকারত্ব নিরসনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, শিল্পের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রের ব্যাপক সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি এবং সেগুলি বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক সরকার পরিচালিত হয়। শুধু কেন্দ্র নয়, রাজ্য সরকারগুলির কাছেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এটাই আকাঙ্ক্ষা। যে মজবুত ভিতের উপর গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে, অর্থাৎ জনগণ যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে ঝড়-জল-রৌদ্র তুচ্ছ করে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, সেটাই গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল শক্তি। নাগরিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা, প্রান্তিক মানুষের মধ্যেও রাষ্ট্রপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের চেতনা জাগিয়ে তোলা এবং সামাজিক বিকাশের পথ সুগম করার মধ্য দিয়েই ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমৃদ্ধ হতে পারে— এই ধারণার ভিত্তিতেই ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হয়েছিল।
এর পর গঙ্গা, গোদাবরী, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বয়ে গিয়েছে হাজার হাজার কিউসেক জল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পটপরিবর্তন হয়েছে, কেন্দ্র ও রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কিন্তু ‘সমানাধিকার’ নামক বহুল ব্যবহৃত শব্দটি বার বার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে রাজনৈতিক দলের শক্তিবৃদ্ধির কৌশল, পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং বিষোদ্গারের কদর্য অভ্যাসকে কেন্দ্র করে।
ভাতা প্রদান কখনও কোনও দেশ বা রাজ্যের অর্থনৈতিক দিশা নির্ধারণের সুদূরপ্রসারী পথ হতে পারে না। সঙ্গত কারণেই প্রবন্ধকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং অবিলম্বে মহাহিসাব নিরীক্ষকের আপত্তিগুলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তবে, এ-ও সত্য যে, যাঁরা ওই দেড়-দু’হাজার টাকা ভাতা হিসাবে পান, তাঁদের প্রায় কেউ-ই শপিং মলে বা মহানগরের বিলাসবহুল রেস্তরাঁয় সেই অর্থ ব্যয় করেন না। অর্থের বড় অংশই খরচ হয় স্থানীয় বাজারে, ছোট দোকানে। সেই অর্থ বার বার স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে আবর্তিত হয়, গ্রামীণ ও মফস্সলের বাজারগুলিকে সচল রাখে। বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসনের বিপরীতে এই ভাবেই এক পুনরাবর্তিত স্থানীয় অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠে। দেশের ক্ষুদ্র অর্থনীতি সামগ্রিক ভাবে মোট দেশজ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ না করলেও অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও বিকেন্দ্রীকরণের যে ভিত নির্মাণ করে, অর্থনীতিবিদেরা তাকেই একটি দেশের অর্থনৈতিক সাম্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করেন।
বাজার অর্থনীতির যুগে এবং কোভিড অতিমারির পরবর্তী সময়ে এই গ্রামীণ অর্থনীতিই ভারতের জীবনরেখা-সম।
রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
ভারততীর্থ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ভারত একটি ভৌগোলিক অঞ্চলমাত্র ছিল না— ভারত তাঁর কাছে ছিল এক প্রাণময়, শাশ্বত সত্তা। ভারতের প্রকৃতি, এর আলো-বাতাস, সমুদ্র-পর্বত, অরণ্য-প্রান্তর এবং সর্বোপরি মানুষকে নিয়েই রচিত হয়েছিল তাঁর স্বপ্নের ভারত। এই ভারতেই তিনি কল্পনা করেছিলেন ভাষা, জাতি, বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষে মানুষে মিলন ঘটবে। বাধাবিপত্তি, সমস্যা, অভাব-অনটন সত্ত্বেও কবি ‘এক সূত্রে সহস্র জীবন’-কে গাঁথতে চেয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথকে ভারতের আদর্শ শিক্ষাগুরু বলা যেতে পারে। নানা ভাবে তিনি স্বাদেশিকতার মন্ত্র দেশবাসীর উদ্দেশে উচ্চারণ করেছেন। ভারতকে ঘিরে কবির স্বপ্নগুলিও তাঁর স্বদেশভাবনায় পরিলক্ষিত হয়। দেশের প্রতি মমতা দেশের মানুষকে বাদ দিয়ে জন্মায় না। শিক্ষাকে স্বাধীন ও জীবন্ত করার প্রয়োজন প্রথম থেকেই রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে কবিগুরু সেই ভাবনাকে নানা ভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। আমরা জানি, ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় ও আশ্রম স্থাপনের মধ্য দিয়ে তাঁর এই চিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল। স্বদেশের ভাষা ও সাহিত্যের অনুশীলন স্বদেশ-পরিচয়েরই অঙ্গ বলে কবি মনে করতেন। শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব দেওয়ার কথা তিনিই বলেছিলেন। তখন দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় দেশীয় ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি ভাষার ব্যবহারই ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। কবি এর অ-বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। আমরা তা জানি এবং আজও গর্ববোধ করি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা অথবা ধর্মগুরু না হয়েও দেশের এক চরম বিপর্যস্ত সময়ে বৃহত্তর দায়বদ্ধতার তাগিদে এগিয়ে এসেছিলেন। আশ্রম বিদ্যালয়ের যিনি প্রতিষ্ঠাতা, তিনিই এক সময় জাতীয় শিক্ষার উদ্যোগী পরিচালক হয়ে ওঠেন। তাঁর স্বপ্নের ভারত যখন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উদ্ধত মত্ততা, কার্জ়ন আমলের শিক্ষা-সঙ্কোচন ও ভাষা-বিদ্বেষের চক্রান্ত এবং বঙ্গ-ভাগের জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তখন ভাষা ও সাহিত্যকে অবলম্বন করে জাতীয় সংস্কৃতি পুনর্গঠনের প্রয়াসে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। আসলে তাঁর স্বপ্নের ভারতের কোনও রকম অমর্যাদা তিনি সহ্য করতে পারেননি। এখানে তিনি কবি-সাহিত্যিক-ঔপন্যাসিক-গীতিকার-দার্শনিক রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি এক যথার্থ দেশনেতার পরিচয়ও দিয়েছেন। তাঁর জীবনদর্শনকে মানবতা বা মানুষের ধর্ম বললেও কোনও ভুল ব্যাখ্যা হয় না, এবং তা আজকের একবিংশ শতাব্দীর জটিল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক।
আসলে জগৎ ও জীবনের কোনও সমস্যাকে, বা কোনও বিষয়কে রবীন্দ্রনাথ খণ্ড খণ্ড করে দেখতেন না— সকল বিষয় বা সমস্যাকে সমগ্রদৃষ্টিতে দেখাই ছিল তাঁর নিয়ম। দেশসেবার ধারণা সম্পর্কে তিনি যা ভেবেছিলেন তা হল, মানুষ তার নিজের দেশ নিজেই সৃষ্টি করে। দেশকে সৃষ্টি করার মধ্য দিয়েই দেশকে লাভ করার সাধনা আমাদের করতে হবে। ভারতে পল্লিগঠন ও স্বরাজ-সাধনের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ সুস্পষ্ট, সুচিন্তিত এবং বাস্তবসম্মত ভাবনার কথা বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরেছিলেন।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে, ভারতপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতা এবং দেশাত্মবোধ প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাবীন্দ্রিক এই চেতনাকে আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায় বিচার করলে সর্বদাই ভুল হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এক শ্রেণির মানুষ চিরকালই কবির এই অনুভূতিকে বিচার করতে গিয়ে শ্রদ্ধার চেয়ে বরং অশ্রদ্ধাই বেশি প্রকাশ করেছেন। কারণ, কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাবীন্দ্রিক শাশ্বত দর্শনকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অসীম, অনন্ত, চিরন্তন সেই ভাবনাকে সীমার মধ্যে এনে অনুধাবন করার মতো শক্তি, সাহস ও দক্ষতা যদি আমাদের না থাকে, তা হলে অন্ধের হস্তিদর্শনের মতোই রবীন্দ্রনাথের অনুভূতিগুলির বিচার ও বিশ্লেষণ করা হবে। তাই প্রাক্-স্বাধীনতা পর্বে এবং তার পরেও কিছু গোষ্ঠী, সমাজ ও দেশ বিশ্বকবির সৃষ্টি ও মননকে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জটিলতার জালই বিস্তার করেছে। সহজ ভাবে যিনি ধরা দিতে চেয়েছেন, তাঁকেই আমরা অজ্ঞতার কারণে কখনও কখনও দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছি। তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। কোনও দিনও এই ধারণা থেকে সরে আসেননি, বলেওছেন সেই কথা: “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।”
অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আসানসোল, পশ্চিম বর্ধমান
সুরকন্যা
জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘অদ্বিতীয়া: সুরের আগুন অনির্বাণ, প্রয়াত আশা’র (১৩-৪) পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। আশা ভোঁসলে গানের সেই স্বর্ণযুগে হয়ে উঠেছিলেন অনন্যাদের মধ্যে অন্যতমা। তাঁর গায়কি শরীর ছুঁয়ে গানের আত্মায় পৌঁছে যাওয়ার এক অনিবার্য যাত্রা। বোদ্ধারা মেনে নিয়েছেন ‘আশাজি’র অসম্ভব দক্ষতা, তাঁকে ‘বহুমুখী’ অভিধা দিয়েছেন। এক দিন যা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল, তা-ই তিনি সঙ্কল্প, জেদ এবং আত্মবিশ্বাসে সম্ভব করে তুলেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্কও দানা বেঁধেছে। কিন্তু তাঁর প্রতিভার দীপ্তির কাছে শেষ পর্যন্ত সবই ম্লান হয়ে গিয়েছে।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত,ব্যান্ডেল, হুগলি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে