Sourced by the ABP
স্বর্ণদ্বীপ হোমরায়ের “‘দক্ষিণপন্থা’ বলতে কী বুঝব” (২৮-১) শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়াতেই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির আধিপত্য, এ কথা ঠিক। দক্ষিণপন্থা বলতে আগে যা বোঝাত, তার মধ্যেও একটি উন্নত আদর্শ, সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগের মানসিকতা এবং ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা ছিল। আজকের দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে এই গুণগুলি খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনেও মতবাদ ও আদর্শ নিয়ে পার্থক্য ছিল। কিন্তু আজকের রাজনীতির মতো এত কাদা ছোড়াছুড়ি ছিল না। আন্তরিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ছিল। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও ছিল। কিন্তু আজ অহংবোধ থেকে শুরু করে মিথ্যাচার, ব্যভিচার ও দুর্নীতি চরমে পৌঁছেছে। ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধ চাঙড় খসার মতো খসে পড়ছে। চূড়ান্ত আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, ব্যক্তিবাদ ও আমিত্বই সব কিছু গ্রাস করছে। প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি-স্বার্থে ও হীন রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানো হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে এক নিদারুণ সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি করা হচ্ছে। জাতপাত-ধর্ম-বর্ণকে ভিত্তি করে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির রাজনীতি চলছে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি এমন পথে চলছে যাতে তাদের মনে হচ্ছে যা করা উচিত, ঠিক সেটাই করা হচ্ছে, আর যেন এটাই ‘স্বাভাবিক’-এর সংজ্ঞা। এই ক্ষেত্রে বামপন্থীদের অভাববোধ, এক শূন্যতা, সারা দুনিয়ায় মানুষ উপলব্ধি করছে। মানুষ লড়ছে, ‘পরিবর্তন চাই’ স্লোগান উঠছে, সারি সারি মানুষ জমছে লড়াইয়ের ময়দানে। পরিবর্তনের দাবি উঠছে। কিন্তু পরিবর্তন আসছে না— তার কারণ, আজ যথার্থ বামপন্থী রাজনীতির চর্চা পৃথিবী জুড়ে অল্প।
সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের কারণে বিশ্ব সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছে। অন্য দিকে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দেশে দেশে খুব ক্ষীণ হলেও বামপন্থীরা বহু ক্ষেত্রেই সংগ্রাম পরিচালনা করছেন, সফল হতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পথ বেয়ে ফ্যাসিবাদ নিয়ে আসার নানা কলাকৌশল যেমন দক্ষিণপন্থীরা গ্রহণ করছেন, তেমনই বামপন্থীরাও বসে নেই। সংগ্রামকে তীব্র থেকে আরও তীব্রতর করছেন। একটি সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় পৌঁছনোর প্রয়োজন অনুভব হচ্ছে। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে প্রয়োজন বামপন্থার পুনর্জাগরণের।
বিদ্যুৎ সীট, জগদল্লা, বাঁকুড়া
কথার খেলাপ
স্বর্ণদ্বীপ হোমরায়ের লেখা প্রবন্ধ “‘দক্ষিণপন্থা’ বলতে কী বুঝব” বিষয়ে কিছু কথা। প্রবন্ধটি বেশ পরিণত চিন্তাধারায়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। সত্যিই দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীরা ক্রমে ‘সোনার পাথরবাটি’ হয়ে উঠেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ সারা ভারতে প্রায় একই চিত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখানে নীতিগত প্রশ্নে বহু ক্ষেত্রে সংশয় থেকে যায়। কোথাও গিয়ে যেন কাজ ও কথার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নোট বাতিল হোক বা জমি অধিগ্রহণ, চিনের সঙ্গে বিদেশনীতি অথবা স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ— প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই ধারা দেখা গিয়েছে। নেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও তাঁদের অবস্থান বা কথার বদল ঘটে। নীতি বা যুক্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনবোধটুকুও মনে করেন না তাঁরা।
আজকাল সংবাদপত্র হোক বা টেলিভিশন চ্যানেল— প্রায়ই দেখা যায়, কোনও দলের নেতা কোনও বিষয়কে কেন্দ্র করে যে বক্তব্য রাখেন, সে সম্পর্কে যৌক্তিক বিশ্লেষণ চাইলে তিনি রাজ্যের প্রসঙ্গ এড়িয়ে অন্য রাজ্যের উদাহরণ টেনে আনেন। আসল ঘটনাটিকে আড়াল করার প্রবণতা বহু সময় নেতাদের মধ্যে ধরা পড়ে, অথবা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা বলেই মনে হয়। এর পিছনে কোনও সুসংহত মতাদর্শগত যুক্তিকাঠামো থাকে না।
কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, দক্ষিণপন্থার ভিতরে মতাদর্শগত প্রশ্ন তোলার মানুষ কমে যাওয়ায় গুরুতর অভিযোগ উঠলেও নেতারা দায় নিতে অস্বীকার করেন। বিষয়টি গভীর ভাবে সত্য ও স্পষ্ট। কোনও সাংবাদিক কোনও ঘটনার প্রেক্ষিতে সোজাসুজি প্রশ্ন করলে রাজনৈতিক নেতারা হয় তা এড়িয়ে যান, নয়তো প্রশ্নকর্তাকেই উল্টে হেনস্থার শিকার হতে হয়।
তবুও দেশের সাধারণ নাগরিক আলোর ভোর আসবে বলেই অপেক্ষায় রয়েছেন। তাই এটুকু প্রত্যাশা করি, বেশিরভাগ মানুষের শিরদাঁড়া সোজা থাকুক।
সোমা বিশ্বাস, কলকাতা-৭৬
অগণতান্ত্রিক
শুধুমাত্র আমাদের দেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক আবহেও স্বর্ণদীপ হোমরায়ের “‘দক্ষিণপন্থা’ বলতে কী বুঝব” শীর্ষক প্রবন্ধটি অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ। সমগ্র বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বামপন্থা ও দক্ষিণপন্থার মধ্যে প্রভেদ প্রায় মুছে যেতে বসেছে, এর জন্য দায়ী আত্মসর্বস্বতা। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি বেশিরভাগ সময়েই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পরিবারের স্বার্থকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রায়শই সেখানে মানুষের স্বার্থে গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা মূল্যহীন হয়ে পড়ে। ফলে আজকের সিদ্ধান্ত কিছু দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে সরে যায়, শুধুমাত্র নিজের বা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। এই ধরনের অবিমৃশ্যকারিতার ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকেই, যা গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত কোনও সরকারের কাছ থেকে কেউই আশা করেন না।
বিশদ ব্যাখ্যায় না-গিয়ে বলা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সেই দেশের নাগরিকরা তো বটেই, সমগ্র বিশ্বই আজ জেরবার। আমাদের দেশে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে নোটবন্দি থেকে শুরু করে এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষের হয়রানি, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মেরুকরণের রাজনীতির আশ্রয় নেওয়া, পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের শাসক দলের নানা ধরনের আর্থিক ও নিয়োগ-দুর্নীতি— প্রভৃতি বহু ঘটনাই দক্ষিণপন্থী অগণতান্ত্রিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।
অপর দিকে, চিন, ভেনেজ়ুয়েলা, নিকারাগুয়া প্রভৃতি দেশে বামপন্থী শাসনে স্বৈরতান্ত্রিকতার অভিযোগ বা কমিউনিস্ট আদর্শে পরিচালিত উত্তর কোরিয়ায় উদ্ভট শাসনব্যবস্থার অধীনে মানুষের স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা উদ্বিগ্ন করে। এ সব সম্পর্কে যাঁরা সামান্যতম খোঁজখবর রাখেন, তাঁরাও কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।
অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি
শুধু দক্ষিণপন্থী?
‘দক্ষিণপন্থা বলতে কী বুঝব’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে উল্লিখিত স্বতন্ত্র পার্টি প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। গুরুচরণ দাস তাঁর বই দ্য ডিলেমা অব অ্যান ইন্ডিয়ান লিবারাল-এ স্বতন্ত্র পার্টির কথা সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করেছেন। গুরুচরণ দাস লিখেছেন, প্রতি শুক্রবার মুম্বইয়ের (তৎকালীন বম্বে) রিগ্যাল সিনেমা-র কাছাকাছি একটি জায়গায় সদস্যরা মিলিত হতেন। সেখানে ফ্রিডরিখ হায়েক, অ্যাডাম স্মিথ এবং জন স্টুয়ার্ট মিল-এর মতো উদারপন্থী চিন্তকদের লেখা পড়া হত।
স্বতন্ত্র পার্টির মূল অবস্থান ছিল সর্বাধিক ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের ন্যূনতম হস্তক্ষেপের পক্ষে। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির বাড়বাড়ন্তের বিরোধিতা করতেন পার্টির সদস্যরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের কাজ শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও শাসন করা, ব্যবসা করা নয়। রাজনৈতিক মহলে স্বতন্ত্র পার্টিকে ‘মার্কেটওয়ালা’ নামে বিদ্রুপও করা হত। কাজেই, স্বতন্ত্র পার্টিকে শুধুমাত্র দক্ষিণপন্থী হিসাবে চিহ্নিত করলে তাঁদের প্রকৃত রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি সুবিচার করা হয় না।
তমাল মিত্র, কলকাতা-২৮
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে