আজকের ভারতে অনেক সময় আমরা নিজেদের ছোট ছোট খোপে ভাগ করে ফেলি। ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল, রাজনৈতিক মত— সব কিছুই যেন বিভেদের নতুন রেখা টেনে দিচ্ছে। টেলিভিশনের পর্দা খুললেই বিতর্ক, সমাজমাধ্যমে চোখ রাখলেই সংঘাতের ছবি। এই সময়েই খেলাধুলা, বিশেষ করে ক্রিকেট আমাদের সামনে এক অন্য ছবি তুলে ধরে। সম্প্রতি টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের চারটি ম্যাচ আমি এবং আমার ছেলে সরাসরি মাঠে বসে দেখার সুযোগ পেয়েছি— চেন্নাই, কলকাতা, মুম্বই এবং আমদাবাদ। চারটি শহর, চারটি ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস। কিন্তু আবেগ একটাই— ভারত।
মধ্যবিত্ত মানুষ হিসেবে এই অভিজ্ঞতা সহজ ছিল না। বহু দিন ধরে সঞ্চয় করে রাখা অর্থের একটি বড় অংশ খরচ করতে হয়েছে এই চারটি ম্যাচ দেখার জন্য। কিন্তু ফিরে তাকালে মনে হয়, খরচ বাদে যে বিরল অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করলাম, তা অমূল্য। এখানে রাজনীতির কচকচি বাদ দিয়ে দেশের ঐক্যকে প্রত্যক্ষ করা যায়। আজকের অশান্ত সময়ে জাতীয়তাবাদ নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। কে বেশি দেশপ্রেমিক, কে কম— এই প্রশ্ন নিয়েই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে দাঁড়িয়ে সেই সমস্ত বিতর্ক যেন মুহূর্তের জন্য মুছে যায়। সেখানে দেশপ্রেম কোনও মতাদর্শ নয়, কোনও স্লোগান নয়— একটি অনুভূতি, যা হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে এক সঙ্গে ভাষা পায়।
টি-২০ ক্রিকেটের স্বভাবই অনিশ্চয়তা। এক দিন খারাপ খেললেই বিদায়। তবুও ভারতীয় দল ঝুঁকি নিয়েছে, আক্রমণাত্মক খেলেছে। সব কিছু মিলিয়ে দলটি যেন একটাই বার্তা দিয়েছে: ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, দেশ-ই আসল। এই জায়গাতেই ক্রিকেট আমাদের সমাজকে একটি আয়নার সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই এতটা বিভক্ত, যতটা আমরা ভাবি? রাজনীতির মঞ্চে বিভেদ সহজ, ঐক্য কঠিন। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে সেই কঠিন কাজটাই প্রতি দিন ঘটে। সেখানে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না— আপনি কোন ভাষায় কথা বলেন, কোন রাজ্যের, কোন মতের। সেখানে একটাই পরিচয়— আপনি ভারতের সমর্থক।
বিশ্ব জুড়ে যখন সংঘাত, যুদ্ধ, হিংসা ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ এগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ এখনও এক সঙ্গে আনন্দ করতে পারে, এক সঙ্গে স্বপ্ন দেখতে পারে। সম্ভবত এই কারণেই ক্রিকেট আমাদের দেশে কেবল খেলা নয়— এক সামাজিক বন্ধনও বটে।
বরুণ গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা-১২
বিশ্বজয়ী
আমদাবাদের ‘কলঙ্ক’ ঘুচিয়ে তৃতীয় বার টি-২০’র জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে বসল টিম ইন্ডিয়া। ফাইনালে নিউ জ়িল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারাল তারা। যে স্টেডিয়াম ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখের স্মৃতি উপহার দিয়েছিল বছর তিনেক আগের এক অভিশপ্ত রাতে, সেই নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামেই ইতিহাস পাল্টালেন সূর্যকুমার যাদবরা। ২০২৪-এর টি-২০ বিশ্বকাপ, ২০২৫-এর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, এ বার টি-২০ বিশ্বকাপ। তিন বছরেই ভারতের মাথায় উঠল ত্রিমুকুট। স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে অভিষেক, সঞ্জু, বুমরাদের বিশ্বজয়ের সাক্ষী থাকলেন দেশের অপর দুই বিশ্বজয়ী অধিনায়ক এম এস ধোনি ও রোহিত শর্মা।
এই জয়ের কৃতিত্ব অবশ্যই বহুলাংশে প্রাপ্য কোচ গৌতম গম্ভীরের। ২০২৪ বিশ্বকাপ জয়ের পর কোহলি, রোহিত, জাডেজার মতো মহাতারকার অবসরে ভারসাম্যহীন দলটাকে একা হাতে গড়েছেন তিনি। সূর্যের হাতে অধিনায়কত্বের ব্যাটনে, অভিষেক, তিলক, সঞ্জু, ঈশানের তারুণ্যের সঙ্গে অক্ষর, বুমরাদের অভিজ্ঞতার মিশেলে ক্রমেই এক অপ্রতিরোধ্য দলে রূপান্তরিত হয়েছে এই ভারতীয় দলটি। দ্রাবিড়-রোহিতের দেখিয়ে যাওয়া আগ্রাসী ক্রিকেটকেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন সূর্য-অভিষেকরা। তারই ফসল ঘরের মাটিতে এই বিশ্বকাপ জয়।
সুদীপ সোম, হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
নতুন ইতিহাস
২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে ভারতকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ষষ্ঠ বারের জন্য এক দিনের ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জয় সে সময়ে কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারেননি ভারতের ক্রীড়াপ্রেমীরা। অথচ, সেই নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামেই ইতিহাস সৃষ্টি করে ভারতের টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ে কোচ গম্ভীরের মুখে দেখা গেল বিরল হাসির রেশ। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাঁর কোচিংয়ে শ্রীলঙ্কা, নিউ জ়িল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে ভারত ঘরের মাঠে ওয়ান-ডে সিরিজ় হারে। নিউ জ়িল্যান্ডের সঙ্গে টেস্টেও হোয়াইটওয়াশ হয় তারা। স্বাভাবিক ভাবেই গম্ভীরের কোচিং নিয়ে দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন ওঠে সঠিক দল নির্বাচন না-করা এবং নিম্নমানের বোলিং, ব্যাটিং ও ফিল্ডিং নিয়ে। এ বারের চিত্র অবশ্য আলাদা। ২০০৭ সালের টি-২০ ওয়ার্ল্ড কাপ ও ২০১১ সালের ওয়ান-ডে ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ী দলের অন্যতম সদস্য, দু’বার কেকেআর-এর ক্যাপ্টেন হিসেবে আইপিএল চ্যাম্পিয়ন, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও সদ্যসমাপ্ত ২০২৬ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ী কোচ গম্ভীরের প্রশংসায় ক্রিকেটবিশ্ব পঞ্চমুখ।
একদা বিশ্বক্রিকেটে ‘আন্ডারডগ’ ভারত, ক্রিকেটে কৌলীন্য ও মর্যাদা পেয়েছিল কপিল দেবের হাত ধরে ১৯৮৩ সালে ওয়ান-ডে ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ের মাধ্যমে। ব্যাটিং-এর ক্ষেত্রে কিংবদন্তি সুনীল গাওস্কর বিশ্বের তাবড় দ্রুতগতির বোলারদের সামলে সর্বপ্রথম টেস্টে ৩৪টি সেঞ্চুরি ও দশ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করে ভারতীয় ক্রিকেটের কয়েক প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন। ১৯৯৯-২০০০ সালে দুর্নীতি ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জেরে যখন ভারতীয় ক্রিকেট গঙ্গার জলে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন উল্কার মতো ভারতীয় ক্রিকেটের হাল ধরতে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক বঙ্গসন্তান। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও কোচ জন রাইটের যুগলবন্দিতে তৈরি হয়েছিল ‘টিম ইন্ডিয়া’, বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তার পর একে একে ‘ক্যাপ্টেন কুল’ মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, কোচ রবি শাস্ত্রী ও বিরাটের যুগলবন্দি এবং কোচ রাহুল দ্রাবিড় ও রোহিত শর্মার নেতৃত্বে ঘরে-বাইরে ভারতের বিজয়রথ ও ক্রিকেট-আধিপত্য দুর্বার গতিতে এগোতে থাকে। সেই পথ ধরেই এ বার কোচ গৌতম গম্ভীর ও সূর্যকুমার যাদবের জুটি টি-২০ বিশ্বকাপে সৃষ্টি করল এক নতুন ইতিহাস।
হারান চন্দ্র মণ্ডল, ব্যারাকপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
চমকপ্রদ
দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বোচ্চ শিরোপা রঞ্জি ট্রফি জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করল জম্মু ও কাশ্মীর। যে দলের রঞ্জি ট্রফিতে প্রথম পদার্পণ ১৯৫৯-৬০’এর মরসুমে, কোনও ম্যাচে প্রথম জয়লাভ ১৯৮২-৮৩’র মরসুমে, তাদের ক্ষেত্রে তো বটেই, ক্রিকেটপ্রেমীর কাছেও এই খেতাব জয় অত্যন্ত খুশির খবর। এই জয় শুধু ক্রিকেট মাঠের একটি জয় নয়, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা একটি অঞ্চলের মানুষের কাছে বিশেষ গর্বের মুহূর্তও। এই সাফল্যের কান্ডারি হিসেবে প্রথমেই আসে বর্তমান বিসিসিআই সভাপতি মিঠুন মানহাসের নাম, যিনি বোর্ড নিযুক্ত প্রশাসক হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেট পরিকাঠামো উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। দলের বর্তমান মুখ্য প্রশিক্ষক অজয় শর্মাকে ২০২২ সালে তিনিই নিযুক্ত করেন। এ ছাড়া ইরফান পঠানও অতীতে পরামর্শদাতা ও খেলোয়াড় হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বোলার আকিব নবী ৬০টি উইকেট নিয়ে চলতি রঞ্জি মরসুমের সর্বোচ্চ উইকেট-শিকারি হয়ে জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন। সব মিলিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের এই অভূতপূর্ব সাফল্য নতুন প্রজন্মকে ক্রিকেটে আরও বেশি আগ্রহী করবে।
সৌম্য বটব্যাল, দক্ষিণ বারাসত, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে