নাজিরাবাদে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ‘আগ্নেয় ফাঁদ’ (২৯-১) সম্পাদকীয়টি প্রাসঙ্গিক। রাজ্যে আগুনের ঝলকানি এবং মৃত্যুমিছিল সমানেই নাগরিকরা দেখে আসছেন। তাতে পুলিশ প্রশাসন বা দমকল বিভাগের কোনও হেলদোল আছে বলে মনে হয় না। প্রায় বছরখানেক আগে জোড়াসাঁকো থানা এলাকার মেছুয়ার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা আমরা দেখেছি। সেই সঙ্গে দেখেছি ঢাকুরিয়ার ‘আমরি’ হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডে জানলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে চাওয়া রোগীর মৃত্যু। স্টিফেন কোর্টের লেলিহান আগুনে ৪৩ জনের মৃত্যু দেখেছে এই শহর। নন্দরাম মার্কেট থেকে বাগরি মার্কেট, শহরের প্রাচীন জনবহুল এলাকায় আগুনের গ্রাসে পুড়ে ছাই হওয়া বাণিজ্য কেন্দ্রও দেখেছে। পূর্ব কলকাতা জলাভূমির মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া জায়গায় কী করে জলাভূমি বুজিয়ে বিশাল গুদাম তৈরি হল এবং ব্যবসা চলল, সেই জবাব তো পুলিশ-প্রশাসনকে দিতে হবে। কী ভাবে সেখানে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়া দিনের পর দিন ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া গেল, সেই প্রশ্নের জবাবই বা পুলিশ-প্রশাসন দেবে না কেন?
ওই গুদামে নাকি ‘ফায়ার অডিট’ হয়নি। তা হলে দমকল বা পুলিশ কেন আগেই পদক্ষেপ করল না? যদি করত তা হলে এতগুলো প্রাণ হয়তো অকালে ঝরে যেত না। সাম্প্রতিক কালে শহরের সেতু কিংবা বহুতলগুলিতে স্বাস্থ্যপরীক্ষার যে রেওয়াজ চালু হয়েছে, আগুন লাগার সম্ভাব্য স্থানগুলিতে ওই একই পরীক্ষা চালু করতে অসুবিধা কোথায়? এই ধরনের বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পেতে দরকার আরও কড়া নজরদারি। পাশাপাশি প্রয়োজন আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা করার কঠিন মনোভাব। নয়তো সাধারণ মানুষকে তার মাসুল দিয়ে যেতে হবে বহু কাল ধরে।
রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
জতুগৃহ
আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে। বর্তমান শাসক দল তখনও বিরোধী দলের ভূমিকায়। বাংলার মানুষ চাইছেন ‘পরিবর্তন’ হোক। দুপুরের দিকে স্টিফেন কোর্টে লিফটের শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। নিমেষে সমস্ত বাড়িটাকে আগুন গ্রাস করে নেয়। চল্লিশের বেশি মৃত্যু! শাসক কোণঠাসা, বিরোধীদের আস্ফালন ছিল দেখার মতো। সরকার পরিবর্তন হল পরের বছরই। কিন্তু আগুনের তাপ কমল না। বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড আগের সরকারের আমলেও হয়েছে, এই সরকারের আমলেও চলেছে। দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না— এটা যেমন ঠিক, তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখাটাও সমান ভাবে জরুরি, যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়।
সে দিনের স্টিফেন কোর্টের পর কলকাতায় বহু বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড বার বার নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। গত বছরেও মেছুয়ার হোটেলের ভয়ঙ্কর আগুনে ১৪ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। এর পর সেই লোকদেখানো তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণের নাটক। বাস্তবে পরিস্থিতি বদলায় কি? এ বার জায়গাটা একটু বদল হয়ে নাজিরাবাদের ফাস্ট ফুড এবং ডেকরেটারস সংস্থার গোডাউন। অগ্নিকাণ্ড এতটাই ভয়ঙ্কর যে, অনেকের শুধু দেহাংশটুকুই মিলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে জায়গাটা জলাভূমি ছিল, প্রশাসনিক মদতে সেই জায়গায় গুদাম তৈরি হয়। যদি সত্যি অনিয়ম হয়ে থাকে, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, দমকল বিভাগ কী করছিল? না কি সবাইকে ‘তুষ্ট’ করেই এই অবৈধ গোডাউন। এখন জানা যাচ্ছে, ফায়ার অডিট হয়নি, তদন্ত করে দেখা হবে। সন্দেহ থেকে যায়, সত্যিই কি লাইসেন্স দেওয়ার আগে কোনও রকম ইনস্পেকশন হয়? অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিকঠাক আছে কি না, দেখা হয়? যদি না-হয়ে থাকে তো দায় কার? স্টিফেন কোর্টের ঘটনার সময় তখনকার যাঁরা বিরোধী, তাঁরাই এখন ক্ষমতায়। তাঁদের দমকলমন্ত্রীর অকুস্থলে পৌঁছতে ৩২ ঘণ্টা লেগে গেল?
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কুম্ভমেলায় মানুষ মারা গেলে বিধানসভায় বিবৃতি দেন ওটা ‘মৃত্যুকুম্ভ’ বলে। এ দিকে গোটা রাজ্য যে ক্রমে জতুগৃহ হয়ে উঠছে, তার খবর কে রাখে? গদি রক্ষার রাজনীতিতে সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদের কি কোনও মূল্যই নেই?
স্বপন চক্রবর্তী, জগৎবল্লভপুর, হাওড়া
মর্মান্তিক
মৃত্যু সব সময় বেদনার। গত ২৫ জানুয়ারি গভীর রাতে নাজিরাবাদের গুদামে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তাতে সাতাশ জন শ্রমিকের দেহাংশ মিলেছে। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর দায় কার? ভয়াবহ আগুন লাগার পর স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কি কোনও খবর ছিল না যে গুদামে কিছু শ্রমিক ভিতরে আটকে আছেন, বার হতে পারছেন না? তা হলে কেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার করার ব্যবস্থা করা হল না? রাজ্যের বাইরে বাংলার কোনও পরিযায়ী শ্রমিক অত্যাচারিত হলে বা এসআইআর-এর কারণে কারও মৃত্যু হলে মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে মুখর হন। অথচ, নাজিরাবাদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এত জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন, মুখ্যমন্ত্রী সেই দিন সেখানে এক বারের জন্যও গেলেন না? শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণের ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকলেন? মানুষ জানতে চান, যে শ্রমিকরা পুড়ে মারা গেলেন, তাঁরা কি কেউ তাঁর রাজ্যের বাসিন্দা নন? ঘটনার বত্রিশ ঘণ্টা পর রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সেখানে যান এবং বলেন গুদামে কোনও অগ্নিসুরক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর অজুহাত, প্রজাতন্ত্র দিবসে ব্যস্ত থাকায় তিনি সময়মতো আসতে পারেননি। আরও বললেন, ফায়ার ‘অডিট’ হয়েছিল কি না তিনি জানেন না, খোঁজ নেবেন। রাজ্যের প্রশাসনিক হাল এখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়।
বছরের পর বছর এই ভাবে প্রশাসনকে সামনে রেখে একের পর এক বেআইনি বাড়ি, গুদাম, বোমার কারখানা তৈরি হচ্ছে এই রাজ্যে, আর দুর্নীতির শিকড় গভীরতর হচ্ছে। নেতা-মন্ত্রীরা উন্নয়নের পাঁচালি গেয়ে মানুষকে বোকা বানাচ্ছেন আর মানুষ প্রাণ দিয়ে তার মূল্য চোকাচ্ছেন। এটাই কি এখন এ রাজ্যে সাধারণ মানুষের ভবিতব্য?
মিহির কানুনগো, কলকাতা-৮১
অদ্ভুত যুক্তি
কলকাতার উপকণ্ঠে নাজিরাবাদে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে বহু সংখ্যক শ্রমিকের অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর রাজ্য সরকারের ভূমিকা খুবই লজ্জাজনক। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, কলকাতায় অবস্থানরত দমকলমন্ত্রীর অকুস্থলে যেতে সময় লাগল বত্রিশ ঘণ্টা, অথচ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সেখানে গিয়ে আগুন নেবানোর কাজ তদারকির করার কথা ছিল। আর যিনি রাজ্যের অভিভাবক তথা মুখ্যমন্ত্রী, তিনিও যে ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃতদের পরিজনদের পাশে দাঁড়ালেন না, এটা চরম দুঃখের।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু এই শহরে এই প্রথম নয়। এর আগেও হোটেল, মার্কেট প্রভৃতি স্থানে একাধিক বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে অনেক আশার বাণী শোনানো হলেও কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি নাজিরাবাদে ফের অগ্নিকাণ্ড এবং বহু শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা তার প্রমাণ। কলকাতার মহানাগরিক তথা পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম গুদামঘরের নির্মাণ ২০০৬ সালের আগে হয়েছে বলে দায় সারতে চেয়েছেন। ভারী অদ্ভুত এই যুক্তি। বিগত সরকারের আমলে কোনও বেআইনি নির্মাণ হলে, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থায় গলদ থাকলে তার শোধরানোর দায়িত্ব কি এই সরকারের উপর বর্তায় না? এই সরকারের আমলে দুর্ঘটনার সব দায় পূর্ববর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের নিরপরাধ প্রমাণ করা যায় কি? রাজ্য সরকারের উচিত অফিস, কারখানা, গুদাম— সর্বত্র অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা এবং তা ঢেলে সাজানো। শুধু প্রতিশ্রুতির বর্ষণ নয়, চাই আন্তরিক ভাবে কাজ করে দেখানো।
অতীশচন্দ্র ভাওয়াল, কোন্নগর, হুগলি
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে