বাঙালির নতুন বছরের শুভারম্ভ পয়লা বৈশাখ। নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে আসে এই দিনটি। ব্যবসায়ীদের কাছে নতুন পসরা সাজিয়ে সিদ্ধিদাতা গণেশ আর ধনলক্ষ্মীর আরাধনার সঙ্গে এই দিনটি ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। আর, পরিবারের ছোট সদস্যদের কাছে এর পরম আনন্দ অনুভূতি দুর্গাপুজোর মতোই নতুন পোশাকে সেজে ওঠায়।
নবাবি আমল থেকে জমিদারবাড়িতে এই দিনটিকে আবার ‘পুণ্যাহ’ হিসেবে মানা হত। সোজা কথায়, জমিদারবাড়িতে এই দিন প্রজারা বকেয়া খাজনা দিতে যেতেন। ওই একটি দিন দরিদ্র প্রজাদের জন্য থাকত বিশেষ ভূরিভোজের ব্যবস্থা।
আমার ছোটবেলা কেটেছে বর্ধমানের একটি গ্রামে। সেখানে দেখেছি মুদিখানা, কাপড়ের দোকান, গয়নার দোকান থেকে পরিবারের প্রধানের নামে নিমন্ত্রণপত্র আসত, এই দিনটিতে দোকানের শুভ মহরত বা নতুন খাতা পুজো উপলক্ষে। পত্রের উপর দিকে থাকত গণেশের ছবি আর তার নীচে লেখা থাকত ‘ওঁ গণেশায় নমঃ’। আর মুসলমান দোকানিরা লিখতেন ‘এলাহি ভরসা’। এই নিমন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকারান্তরে দোকানদাররা নিত্যদিনের ক্রেতাদের কাছ থেকে বকেয়া আদায় করতেন। আবার ক্রেতাদের সঙ্গে আগামী দিনেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ওই দিন মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। দোকানে ধার বাকি না থাকলেও পরিচিত অন্য ক্রেতাদেরও নিমন্ত্রণ করে মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে সুসম্পর্কটিকে আরও দীর্ঘায়ু করা হত। এখনও বাঙালির এই উৎসবটিকে ‘হালখাতা’ বলা হয়।
ওই দিন সকালে বাড়ির মেয়ে-বৌরাও নববস্ত্রে, গয়না পরে, সিঁদুরের টিপ আর পায়ে আলতা পরে বিভিন্ন মন্দিরে পুজো দিয়ে আগামী দিনগুলির জন্যে পরিবারের সকলের সৌভাগ্য কামনা করতেন। আবার বিকেলবেলায় তাঁরা চিঁড়ে, মুড়কি, গুড়, বাতাসা, সন্দেশ, দই এবং নানাবিধ ফলমূল দিয়ে বড় বড় পোড়া মাটির মালশা সাজিয়ে মন্দিরে বিশেষ বৈকালিক পুজো দিতেন। পুজো শেষে ওই মন্দির প্রাঙ্গণে পুজোর ভোগ হিসেবে সবাই ফলাহার সারতেন। মা, কাকিমা, ঠাকুরমার সঙ্গে লেজুড় হয়ে আমরা বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও মহানন্দে সেই ফলাহারে যোগ দিতাম। মাটির মালশায় সেই ফলাহার ছিল আমাদের কাছে অমৃত সমান।
পরিবার প্রধান অথবা পুরোহিত এসে ওই দিন নতুন পঞ্জিকা থেকে রাশিফল অনুসারে বর্ষফল পাঠ করে শোনাতেন। এই অনুষ্ঠানকে বলা হত পাঁজি পড়া। আমরা ছোটরা ও-সব বুঝতাম না, কিন্তু ওই সময় দীর্ঘ ক্ষণ ধরে চুপ করে হাতজোড় করে বসে থাকাটাই ওই দিনের বড় শাস্তি বলে মনে হত। বাড়িতে ওই দিন নানাবিধ পঞ্চব্যঞ্জন রান্নার আয়োজনে বাড়িটা যেন ‘ভোজবাড়ি’ হয়ে উঠত। সব মিলিয়ে দিনটা বেশ আনন্দেই কাটত ছোট-বড় সকলের।
বর্তমানে নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে প্রবীণ বয়সে সেই ছোটবেলার বাংলা নববর্ষের আনন্দময় দিনটিকে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি।
অমলকান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়, ডানকুনি, হুগলি
সম্প্রীতি-চিত্র
‘যেটুকু দেখছি, তা-ই কি সব’ (১০-৪) অরিতা ধারা ভট্ট-র লেখার পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। মুর্শিদাবাদ এক সময় বাংলা-বিহার-ওড়িশার রাজধানী ছিল। এখানে সিরাজউদ্দৌলার পাশাপাশি রানি ভবানীও ছিলেন। বলা হয়, তিনিই প্রথম বাঙালি রানি, যাঁর আমলে বারাণসী পর্যন্ত পাকা রাস্তা, সরাইখানা, শিব মন্দির, দুর্গা মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একাধিক জলের ট্যাঙ্ক তৈরি হয়।
ঘটনাচক্রে মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে আমার শৈশব-কৈশোর অনেকটাই কেটেছে। এখানে ঢোকার মুখে প্রথমে রয়েছে পির দরগা, তার পর চার্চ, জৈনদের উপাসনাকেন্দ্র এবং বারোদুয়ারিতে দুর্গা মন্দির, গঙ্গার ধারে রেল লাইনের কাছে বাশুলী তলা। এ সবই পুরনো স্থাপত্য বহু ইতিহাসের সাক্ষী। এই আজিমগঞ্জে শায়িত রয়েছেন সিরাজউদ্দৌলা ও তাঁর বংশধরেরা। মুর্শিদকুলি খাঁ-র নাম থেকেই মুর্শিদাবাদ। তাঁর সময় বহরমপুর ছিল সদর শহর। আর একটু পেরিয়ে সাতগাছিতে তৈরি হয়েছিল প্রথম রামকৃষ্ণ মিশন। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জে জৈন সম্প্রদায়েরই ১৩টি সুদৃশ্য, বিশাল মন্দির রয়েছে। তার মধ্যে গুলজার বাগে আম, নারকেল, সুপারি গাছের বাগান আর পুকুর নিয়ে ৩২ বিঘা জমি জুড়ে শ্বেতপাথরের ‘দাদারস্তান’, বা পার্শ্বনাথের মন্দির। কাঁসার কাজে মুর্শিদাবাদ অতুলনীয়। এ ছাড়া গরদ, পিয়োর সিল্ক যা ‘মুর্শিদাবাদি সিল্ক’ নামে পরিচিত, আজও পৃথিবীখ্যাত।
সেই সময় মুর্শিদাবাদ ছিল শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্যের পীঠস্থান। শরৎ পণ্ডিত বা দাদাঠাকুরের বাড়িও এই জেলাতেই। পুরাতত্ত্ব নিয়ে লেখার প্রবীণ মানুষ রামদাস সেনও এই জেলার নাম উজ্জ্বল করেছেন। সম্পূর্ণ অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা অনুবাদ পত্রিকা-র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বৈশম্পায়ন ঘোষালও এখানকারের ভূমিপুত্র।
ষোড়শ শতকের শেষ থেকেই এখানে মুসলিম আধিপত্য। আকবরের সময় মকসুখ খাঁ এখানে এসেছিলেন পর্তুগিজদের বাংলা-বিহার-ওড়িশা থেকে তাড়ানোর জন্য। তার পর এলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। ফলে ক্রমশ জনসংখ্যা বাড়ল। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে স্বাধীনতার সময় তিন দিনের জন্য মুর্শিদাবাদ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল। এর পর নকশাল আন্দোলনের ঢেউ এই জেলাকে ভীষণ ভাবেই প্রভাবিত করে। সেই সব অশান্ত দিন অতিক্রান্ত করে মুর্শিদাবাদের মানুষ সব সময়ই মাথা উঁচু করে সম্প্রীতি বজায় রেখে চলছেন।
কিন্তু বর্তমানে মুর্শিদাবাদ মানেই দাঙ্গা, অশান্তি, অবরোধ, জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার হুমকি। এই পরিবর্তনের পিছনে কারণ যা-ই থাক না কেন, অচিরেই এই অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করা জরুরি।
বিতস্তা ঘোষাল, কলকাতা-৯০
মহাকাশযাত্রা
১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭ অভিযানের ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর নাসা-র ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’-এর হাত ধরে এই প্রথম মানুষ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে যাওয়ার দুঃসাহসিক অভিযান দেখাল। ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’ হল নাসা-র নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক চন্দ্র অভিযান কর্মসূচি, যার লক্ষ্য হল চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মহাকাশচারী পাঠানো, চন্দ্র পৃষ্ঠে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা এবং চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের প্রযুক্তি তৈরি করা। এই প্রোগ্রামের অন্তর্গত প্রথম পর্যায়ে আর্টেমিস-১ মিশনের মাধ্যমে ২০২২ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন হয় ওরিয়ন মহাকাশযান ও স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটের মানববিহীন পরীক্ষামূলক উড়ান। দ্বিতীয় পর্যায়ে আর্টেমিস-২ অভিযানের নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে চন্দ্র পরিক্রমাকারী প্রথম মানববাহী মিশন। সম্প্রতি সেই অভিযানটি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হল। উল্লেখ্য, আর্টেমিস-২ মিশনের চার সদস্যের দলে রয়েছেন প্রথম নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি এবং প্রথম অ-আমেরিকান মহাকাশচারী।
অভিযানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ‘ফ্লাইবাই’। মহাকাশ গবেষণায় ‘ফ্লাইবাই’ হল এমন একটি অভিযান যেখানে একটি মহাকাশযান কোনও গ্রহ, উপগ্রহ বা অন্য কোনও মহাজাগতিক বস্তুর খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়, কিন্তু সেটির কক্ষপথে প্রবেশ করে না বা পৃষ্ঠে অবতরণ করে না। আর্টেমিস-২ অভিযানের সাফল্য আজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড় পাওনা। এটি প্রমাণ করে যে মানুষ এখন পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মহাবিশ্বের যে কোনও প্রান্তে পৌঁছনোর ক্ষমতা রাখে।
কিন্তু আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ চলছে। এক শ্রেণির মানুষের ক্ষমতার লোভের ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে নির্মিত উন্নত অস্ত্রসম্ভার বহু মানুষের হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই ভয় হয়, এই বিশাল ক্ষমতাকে যদি মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করতে না পারি, তবে সভ্যতা উন্নতির বদলে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে।
তাপস কুমার চিনি, কলকাতা-১০২
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে