সমুদ্র থেকে বিষাক্ত গ্যাস মিশছে বাতাসে। —ফাইল চিত্র।
বিশ্ব উষ্ণায়নের বাড়বাড়ন্ত দীর্ঘ দিন ধরেই চিন্তায় রেখেছে বিজ্ঞানীদের। সময় যত এগোচ্ছে, তত দূষণ বাড়ছে। আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবী। তার ফলে জলবায়ু, আবহাওয়াতেও নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। তবে এই বিশ্ব উষ্ণায়নের নেপথ্যে একটা বড় ভূমিকা যে রয়েছে সমুদ্রের, তা অনেকেই জানতেন না। সমুদ্র থেকে হু হু করে বিষাক্ত মিথেন গ্যাস নির্গত হয়ে চলেছে। তাতেই আরও বেশি করে দূষিত হচ্ছে বাতাস। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই এই মিথেনের নিঃসরণ নিয়ে বিভ্রান্ত। কী ভাবে কেন সমুদ্র থেকে বিষাক্ত গ্যাস বেরোচ্ছে, এত দিনে তার হদিস পাওয়া গেল।
সমুদ্রে মিথেনের উৎস নিয়ে গবেষণা করেছেন নিউ ইয়র্কের রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রসিডিং অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ। সেখানেই সমুদ্রে মিথেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এমন এক জৈবিক প্রক্রিয়ায় সমুদ্রের মধ্যে মিথেন উৎপন্ন হয়ে চলেছে, যা পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়লে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় করল এই গবেষণা।
মিথেন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। সমুদ্রে এর অবস্থানের একটি ধাঁধা দীর্ঘ দিন ধরে বিজ্ঞানীদের বিচলিত করছে। সাধারণ ভাবে সমুদ্রের উপরিতলের জলে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন থাকে। কিন্তু এই উপরিতলের জল থেকেই ধারাবাহিক ভাবে বাতাসে মিথেন মিশে চলেছে। এটি মিথেনের স্বাভাবিক, সহজাত প্রবণতার বিপরীত। কারণ, মিথেন সাধারণ ভাবে অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে তৈরি হয়। বদ্ধ জলাশয়ে মিথেন উৎপন্ন হয়। জলের অক্সিজেনসমৃদ্ধ অংশে মিথেন উৎপন্ন হওয়ার কথা নয়। তাই সমুদ্রের উপরিতল থেকে মিথেন বাতাসে মিশে যাওয়ার ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের কাছে অপ্রত্যাশিত। মার্কিন বিজ্ঞানীরা এই রহস্যেরই কিনারা করেছেন।
মিথেনের এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সারা বিশ্বের তথ্যভান্ডার বা ডেটাবেস এবং কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেছিলেন তাঁদের গবেষণায়। সমুদ্রে একটি বিশেষ জৈবিক প্রক্রিয়ার কথা তাঁরা জানতে পেরেছেন। গবেষণায় দাবি, সমুদ্রে উপস্থিত নির্দিষ্ট কিছু জীবাণু জৈব পদার্থগুলিকে ভাঙার সময় মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করে। তবে অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান ফসফেটের অভাবেই এই উৎপাদন সম্ভব হয়। রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক থমাস ওয়েবার বলেছেন, ‘‘এর অর্থ হল, খোলা সমুদ্রে মিথেন উৎপাদন এবং তার বাতাসে মেশার মূল নিয়ন্ত্রক হল ফসফেটের অভাব।’’ সমুদ্রে মিথেনের উপস্থিতি এবং চরিত্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত দিনের ধারণা বদলে যাচ্ছে এই নতুন তথ্য আবিষ্কারে। এত দিন অক্সিজেনসমৃদ্ধ জলে মিথেনের উৎপাদনকে কার্যত অসম্ভব বলে দেগে দেওয়া হত। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন, ফসফেট কম থাকলে অক্সিজেনসমৃদ্ধ জলেও মিথেনের উৎপাদন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে আর কোনও রহস্য নেই!
বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, সমুদ্রে মিথেন উৎপাদনের এই প্রক্রিয়া বিশ্ব উষ্ণায়নের পরিপূরক। এক দিকে যেমন এই প্রক্রিয়ার ফলে মিথেনের উৎপাদন বাড়ছে এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন ত্বরাণ্বিত হচ্ছে, তেমনই বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণেও সমুদ্রে ফসফেট কমছে এবং মিথেন তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। উষ্ণ পরিস্থিতিতে সমুদ্রে আরও বেশি করে বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয় বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গিয়েছে, জয়বায়ুর পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র উপরিতল থেকে নীচের দিকে উত্তপ্ত হয়। তাতে উপরিতলের জলের সঙ্গে সমুদ্রের গভীরের জলের ঘনত্বে তারতম্য ঘটে। বিজ্ঞানীদের মতে, ঘনত্বের এই তারতম্য ফসফেটের অভাবের অন্যতম কারণ। এর ফলে পুষ্টি উপাদানগুলি জলের উপরের স্তর থেকে নীচের স্তরে মিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। মিশ্রণ কম হওয়ায় উপাদানগুলিও সমুদ্রের উপরিতলে পৌঁছোতে পারে না। ফলে তাতে মিথেনের উৎপাদন বাড়ে।
মার্কিন বিজ্ঞানীদের এই অনুসন্ধান জয়বায়ু পরিবর্তনের গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সমুদ্রে মিথেন তৈরি নিয়ে আরও পরীক্ষানিরীক্ষা এবং অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ুর পরিবর্তন সংক্রান্ত পূর্বাভাসের প্রযুক্তিতে এখনও কিছু ফাঁক থেকে গিয়েছে। মিথেনের গবেষণা আগামী দিনে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে সাহায্য করবে, আশাবাদী রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল।