India-Pakistan Row on Pink Salt

পাকিস্তান থেকে কিনে বিশ্ব জুড়ে বিক্রি, ‘হিমালয়ান গোলাপি লবণে’ ইসলামাবাদের ‘কাটা ঘায়ে নুনের’ ছিটে দিচ্ছে নয়াদিল্লি!

পাকিস্তান থেকে সল্ট-বোল্ডার কিনে ‘হিমালয়ান গোলাপি লবণ’ ব্র্যান্ড তৈরি করেছে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী। ফলে নুনের ব্যবসাতেও লেজেগোবরে হচ্ছে ইসলামাবাদ। কী ভাবে?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৯
Share:
০১ ১৮

গোলাপি লবণের যুদ্ধে মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। ইসালামাবাদ থেকে কাঁচামাল কিনে তা প্যাকেটজাত করে দিব্যি দেশে এবং বিদেশের বাজারে বিক্রি করছে নয়াদিল্লি। সব জানা সত্ত্বেও পশ্চিমের প্রতিবেশীর হাত-পা বাঁধা! ফলে এই ব্যবসাতেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোল খেতে হচ্ছে শাহবাজ় শরিফ সরকারকে। আর তাই গোটা ঘটনায় তাদের ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে’ লেগেছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

০২ ১৮

ভারতের খুচরো বাজারে জনপ্রিয়তা রয়েছে ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’-এর। গত তিন দশক ধরে প্যাকেটজাত এই পণ্যটি দেশে এবং বিদেশের বাজারে বিক্রি করছে টাটা বা আশীর্বাদের মতো জনপ্রিয় শিল্পগোষ্ঠী। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’ পর্বের সময় সামান্য ধাক্কা খায় তাদের ব্যবসা। ২০২৬ সালে অবশ্য এর বেশির ভাগটাই সামলে উঠেছে তারা। যদিও বর্তমানে ঘুরপথে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে তাদের।

Advertisement
০৩ ১৮

এ দেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলির তৈরি ব্র্যান্ড ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’-এর জন্ম কিন্তু উত্তর ভারতের পার্বত্য এলাকায় নয়। এর খনি রয়েছে পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের খেওরায়। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম লবণখনি। পাক পঞ্জাবের রাজধানী লাহৌর থেকে খেওরার দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। দুনিয়ার বৃহত্তম গোলাপি নুনের খনি রয়েছে কানাডার অন্টারিও রাজ্যের সিফটোয়। সেখান থেকে অবশ্য গোলাপি লবণ সে ভাবে আমদানি করে না নয়াদিল্লি।

০৪ ১৮

ইসলামাবাদের সরকারি নথি অনুযায়ী, পাক প়ঞ্জাবের খেওরার খনিতে আছে আনুমানিক ৮.২ কোটি মেট্রিক টন গোলাপি লবণ। প্রতি বছর সেখান থেকে ৩.৬ লক্ষ টন পিঙ্ক সল্ট উত্তোলন করছে পশ্চিমের প্রতিবেশী। এর ৭০ শতাংশ চলে যায় বিভিন্ন ধরনের শিল্পসংস্থায়। বাকিটা ব্যবহার হয় খাবার হিসাবে। এর জন্য খেওরায় মোট ৩০টি লবণ প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট রয়েছে।

০৫ ১৮

খনি থেকে ওঠা গোলাপি লবণকে খাওয়ার উপযুক্ত করে তোলা মোটেই সহজ নয়। এর জন্য প্রথমেই গুঁড়ো করতে হবে লবণ-শিলা বা সল্ট-বোল্ডার। ওই সময় তাতে কোনও জীবাণু মিশে আছে কি না, সে দিকে নজর রাখতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে আলাদা করা হয় সল্ট-বোল্ডারে মিশে থাকা অন্যান্য খনিজ উপাদান। গোলাপি নুনের প্রক্রিয়াকরণ কারখানা পাকিস্তানে খুব একটা নেই। ফলে এত দিন বিপুল পরিমাণে ওই বিশাল বিশাল পাথরগুলি এ দেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে বিক্রি করেছে ইসলামাবাদ।

০৬ ১৮

পাক প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে কাজে লাগাতে দেরি করেননি নয়াদিল্লির ব্যবসায়ীরা। অমৃতসরের কারখানায় তৈরি গোলাপি লবণকে প্যাকেটজাত করার সময় অবশ্য পাকিস্তানের নাম মুছে দেন তাঁরা। এর ফলে অচিরেই ভারত এবং ভারতের বাইরে প্রবল জনপ্রিয়তা পায় ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’। কাঁটাতারের ওপারের এ-হেন চাতুরি ধরে ফেলতে ইসলামাবাদের শাসকদের খুব একটা সময় লাগেনি। যদিও নুন প্রক্রিয়াকরণের কারখানা না থাকায় এ ব্যাপারে কিছুই করার ছিল না তাঁদের।

০৭ ১৮

২০১৯ সালে প্রথম বার ধাক্কা খায় গোলাপি লবণের ব্যবসা। ওই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সিআরপিএফের কনভয়ে ফিদায়েঁ হামলা চালায় ইসলামাবাদ মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীর এক সদস্য। এতে প্রাণ হারান ৪০ জন আধা সামরিক জওয়ান। প্রতিশোধ নিতে কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়ার বালাকোটে সন্ত্রাসবাদীদের গুপ্তঘাঁটিতে ‘এয়ার স্ট্রাইক’ করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। এতে ‘যুদ্ধং দেহি’ অবস্থায় পৌঁছে যায় দুই প্রতিবেশী।

০৮ ১৮

পুলওয়ামা হামলা দুই দেশের বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। ঘটনার পর পাকিস্তানের উপর থেকে ‘সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের’ (মোস্ট ফেভারড নেশন) তকমা কেড়ে নেয় নয়াদিল্লি। পাশাপাশি, ইসলামাবাদের পণ্যে চাপে ২০০ শতাংশ শুল্ক। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের এই সিদ্ধান্তে রাতারাতি দামি হয়ে ওঠে গোলাপি লবণ। যদিও তত দিনে বাজারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’। ফলে এর চাহিদা খুব একটা হ্রাস পায়নি।

০৯ ১৮

বিষয়টি নিয়ে কাতারের গণমাধ্যম আল জ়াজিরার কাছে মুখ খুলেছেন অমৃতসরের ব্যবসায়ী ভিপান কুমার। তাঁর কথায়, ‘‘শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৯ সালে গোলাপি লবণের সল্ট-বোল্ডারের আমদানি মূল্য কেজিপ্রতি ৩.৫ টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে ২৪.৫ টাকায় পৌঁছোয়। তবে তাতে ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’-এর বিক্রি কমেনি। উল্টে বেশি দাম দিয়েও সংশ্লিষ্ট নুন কিনতে সঙ্কোচ করেনি আমজনতা।’’ পরবর্তী কালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

১০ ১৮

গত বছরের (২০২৫ সাল) এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ফের নিরীহ পর্যটকদের উপর হামলা চালায় পাক মদতপুষ্ট তিন জঙ্গি। এতে মৃত্যু হয় ২৬ জনের। এর পর মে মাসে ভারতীয় ফৌজের পাল্টা প্রত্যাঘাতে গুঁড়িয়ে যায় পশ্চিমের প্রতিবেশীর একাধিক সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি। শুধু তা-ই নয়, একে কেন্দ্র করে চার দিনের সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ। সংশ্লিষ্ট অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখে কেন্দ্র।

১১ ১৮

এই সামরিক অভিযান-পরবর্তী সময়ে পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক। পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে আমদানি-রফতানি প্রায় বন্ধ করেছে নয়াদিল্লি। বাণিজ্য মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারি পর্যন্ত ইসলামাবাদে ৪৪.৭৭ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য পাঠায় নয়াদিল্লি। সেখান থেকে আমদানির অঙ্ক ছিল ৪.২ লক্ষ ডলার। সেটা এখন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

১২ ১৮

‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ধাক্কায় গোড়ার দিকে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়ে এ দেশের গোলাপি লবণের ব্যবসা। ২০২৪ সালে প্রায় ৬৪২ টন সল্ট-বোল্ডার আমদানি করে নয়াদিল্লি। ২০১৮ সালে সেটা ছিল ৭৪,৪৫৭ টন। এই জোগান সংঘাত-পরবর্তী সময়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঘরে-বাইরে পিঙ্ক সল্টের বাজার ধরতে একরকম মরিয়া হয়ে ওঠেন পাক ব্যবসায়ীদের একাংশ।

১৩ ১৮

২০১০ সালে ভারতের গোলাপি লবণের ব্র্যান্ড নাম নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আপত্তি জানায় পাকিস্তান। কিন্তু, সেখানে ধাক্কা খায় ইসলামাবাদ। দুনিয়ার তাবড় আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ছিল, কোনও প্যাকেটজাত পণ্যের নাম তার উৎসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দিতে হবে, তার কোনও মানে নেই। তা ছাড়া সল্ট-বোল্ডার বিক্রির পর নয়াদিল্লি সেটা কী নামে বা কী রূপে বিক্রি করবে, সেটা প্রতিবেশী কোনও দেশ ঠিক করতে পারে না।

১৪ ১৮

আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ধাক্কা খেয়েও পাকিস্তান দমে যায়নি। উল্টে গোলাপি লবণকে নতুন কায়দায় প্যাকেটজাত করে বাজারে নিয়ে আসে ইসলামাবাদ। কোনওটার নাম দেয় ‘লাহৌরি লবণ’। কোনটা আবার ‘খেওরা-সল্ট’। প্যাকেটের গায়ে খনির ছবি দিয়ে পণ্যটিকে জনপ্রিয় করার চেষ্টাও চালিয়েছেন পশ্চিমের প্রতিবেশীর শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীরা।

১৫ ১৮

কিন্তু, অচিরেই খুচরো বাজারে মুখ থুবড়ে পড়ে পাকিস্তানের এই সমস্ত প্রচেষ্টা। বিদেশের বাজারে কেউই ইসলামাবাদের ‘খেওরা-সল্ট’ পছন্দ করেননি। তাঁদের রান্নাঘরে বরাবরের মতো জায়গা পেয়ে এসেছে ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’। চাহিদা না কমায় বিকল্প রাস্তায় সল্ট বোল্ডার ঘরের মাটিতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন এ দেশের শিল্পপতিরা। ‘সিঁদুর’-পরবর্তী সময়ে সেটা অপাতত স্থায়ী রয়েছে।

১৬ ১৮

সেই বিকল্প রাস্তা হল সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই হয়ে সল্ট-বোল্ডার আমদানি। আবার প্যাকেটজাত ‘হিমালয়ান পিঙ্ক সল্ট’ও ওখানকার বাজারেই বিক্রি করেছে এ দেশের একাধিক শিল্পগোষ্ঠী। ফলে দুবাই হয়ে এখানকার গোলাপি লবণ পাকিস্তানের খুচরো বাজারে ঢুকছে বলা যেতে পারে।

১৭ ১৮

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধের জেরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা পশ্চিম এশিয়া। লড়াইয়ের গোড়াতেই পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে তেহরান। ফলে আমিরশাহি বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলিতে পণ্য পাঠানো নয়াদিল্লির জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ৮ এপ্রিল সাবেক পারস্যের সঙ্গে দু’সপ্তাহের জন্য সংঘর্ষবিরতির ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে অবিলম্বে হরমুজ় খুলতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

১৮ ১৮

যুদ্ধবিরতিকে চিরস্থায়ী করতে আমেরিকার সামনে ১০ দফা শর্ত রেখেছে ইরান। এর মধ্যে একটি হল হরমুজ়ের নিয়ন্ত্রণ। সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা হয়তো মেনে নেবেন ট্রাম্প। সে ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ার বাজারে গোলাপি লবণের ব্যবসাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার মেগা সুযোগ যে নয়াদিল্লি পাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement