Modi slams Nehru

সম্পাদক সমীপেষু: অক্ষমের বিনোদন

ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানরা তো নিজেদের ইচ্ছাতেই এই দেশে থেকে গিয়েছিলেন, এই প্রত্যাশায় যে, তাঁরা একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পরিসরে বসবাস করবেন।

শেষ আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৪
Share:

জওহরলাল নেহরু।

সম্পাদকীয় ‘দূরবর্তী’র (২০-১) পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “অন্যকে অপবাদ দিয়া আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা অক্ষমের চিত্তবিনোদন, আমাদের তাহাতে কাজ নাই।”

দেশের বর্তমান শাসক দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে অপবাদ দেওয়াকে যেন অভ্যাসে পরিণত করেছেন। এটা অনস্বীকার্য যে, প্রায় দু’শো বছর পরাধীন থাকার পর প্রাপ্ত স্বাধীন দেশে, যে দেশ যৎপরোনাস্তি উৎপীড়িত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখাটা ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং। বলা বাহুল্য, পণ্ডিত নেহরু সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন এবং তা রূপায়ণের চেষ্টা করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ পালন করা যে দেশের সর্বোচ্চ শাসকের পক্ষে সোনার পাথরবাটি নয়, তা তিনি তাঁর বিবিধ কর্ম ও বক্তব্যের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন। আজ নেহরু অনুসৃত সেই ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শই হাল আমলের ‘একদেশদর্শিতা’-র পথে অন্যতম শক্ত কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতে থেকে যাওয়া মুসলমানরা তো নিজেদের ইচ্ছাতেই এই দেশে থেকে গিয়েছিলেন, এই প্রত্যাশায় যে, তাঁরা একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পরিসরে বসবাস করবেন। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এই প্রত্যাশাকেই বাস্তবায়িত করতে সদা জাগরূক ছিলেন, এবং তার জন্য তিনি তাঁর যোগ্য সহকর্মীদের একাংশের হয়তো বা বিরাগভাজনও হয়েছিলেন। তবু, এক জনের বা এক দলের ব্যক্তিগত সহিষ্ণুতার উপর রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ভর করতে পারে, এ কথা ভুললে চলবে না। অধিকার-পরিবেশনের ক্ষেত্রে যদি কোনও এক পক্ষের প্রতি পক্ষপাত করা হয়, তবে সাধারণ মানবপ্রকৃতিতে সেই অবিচার সহ্য হয় না। তার থেকেই অশান্তির এক বাতাবরণ তৈরি হয়।

মানুষ যখন সব দিক দিয়েই দরিদ্র হয়, তখন সে বাইরের দিকে গৌরব খুঁজে ফেরে; কথার জোরে গৌরব প্রতিষ্ঠা করতে চায়; পুঁথি থেকে শ্লোক খুঁটে, উপাসনালয় খুঁড়ে খুঁড়ে ভগ্নস্তূপ থেকে গৌরবের মালমশলা সংগ্রহ করে। এ ভাবে সত্যকে ব্যবহার থেকে দূরে রেখে যদি শুধু গলার জোরে অতীত গৌরবের বড়াই করতে বসি, তবে আমাদের ধিক! শুধুমাত্র মন্দির-মসজিদকেন্দ্রিক রাজনীতি, অথবা পূর্বজদের কারণ-অকারণে নিন্দামন্দ করাটাই কি সত্যিই আজ দেশের স্বার্থে মঙ্গলজনক?

অয়ন কুমার মল্লিক, বাগনান, হাওড়া

বিপথে চালিত

‘দূরবর্তী’ শীর্ষক সম্পাদকীয় বিষয়ে কিছু কথা। বর্তমান শাসক দল ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী, এবং সেই কারণেই সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি বাদ দেওয়ার জন্য তারা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে গণতন্ত্রের যে একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, এই সত্যটিকেও তারা স্বীকার করতে চায় না। এখনও সংবিধান থেকে এই শব্দটির অবলুপ্তি ঘটেনি, তাই রাষ্ট্রের নিয়ামক নীতি হিসাবে এই শব্দটির মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রনায়কদের প্রাথমিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কোনও ধর্মেরই পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে না। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস বা অবিশ্বাস এবং সেই অনুযায়ী তার আচার-আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সেখানে রাষ্ট্রের থাকবে না কোনও বিরোধিতা। বরং ধর্মাচরণের পথে বাধা সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে সেই বাধা দূর করা। আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অনুসারী বলে ঘোষিত হলেও, বাস্তবে এই নীতিকে সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মান্যতা দেয়নি। স্বাধীনতা-উত্তর পর্বের শুরুতে এই বিষয়ে যে সামান্য ভূমিকা পালন করা হয়েছিল, আজ তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে পেতে এক কদর্য রূপ পরিগ্রহ করেছে।

সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নেহরুর আপত্তির পরেও তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়েও, অভিযোগের আঙুলটি রাজেন্দ্র প্রসাদের দিকে নয়, তুলেছেন জওহরলাল নেহরুর দিকে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি প্রশাসনের বিরূপতা কোন স্তরে পৌঁছলে এমন মনোভাব তৈরি হতে পারে, তা ভাবলে গভীর উদ্বেগ জন্ম নেয়।

নেহরুর চিন্তা যত দূর অগ্রসর হয়েছিল, রাজেন্দ্র প্রসাদের চিন্তা তত দূর পৌঁছতে পারেনি, এ কথা সত্য। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজেন্দ্র প্রসাদের দৃষ্টিভঙ্গিগত দূরত্বও কম নয়; বরং তাও বিস্তর। রাজেন্দ্র প্রসাদ মনে করতেন, সমস্ত ধর্মের প্রতি সমান পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ নিহিত। এই ধারণা ঠিক কি না তা তর্কসাপেক্ষ, তবু এই চিন্তার ধারেকাছেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পৌঁছাতে পারেননি। শুধু কেন্দ্র নয়, রাজ্যের শাসকদের একাংশের চিন্তাভাবনাও বর্তমানে একই পথের অনুসারী।

আসলে যত দিন যাচ্ছে, বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে ক্রমশ অতিষ্ঠ করে তুলছে। যে দলগুলির নেতারা মন্দির-মসজিদ নিয়ে শোরগোল তুলছেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক হিসাবে তাঁদের প্রথম এবং জরুরি দায়িত্ব ছিল এই জ্বলন্ত সমস্যাগুলির সমাধানের চেষ্টা করা। তা না-করে যে ভাবে তাঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নিচ্ছেন, তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মন্দির-মসজিদ নিয়ে উন্মাদনা ছড়ানো ছাড়া জনগণকে দেওয়ার মতো তাঁদের আর কিছু নেই।

আজ পুঁজিপতি শ্রেণির আনুকূল্য বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ক্ষমতায় আসীন থাকা সম্ভব নয়। হয়তো তাই তাদের সেবা করাই আজ প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় জনসাধারণের বৃহৎ অংশের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতেই ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার পরিসর থেকে সরিয়ে এনে এ ধরনের ধর্মীয় গোঁড়ামির নিগড়ে মানুষকে বেঁধে রাখার এমন প্রচেষ্টা।

গৌরীশঙ্কর দাস, খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

বিস্তর দূরত্ব

বৈচিত্রের মধ্যে একতার ভিত্তিতে নেহরুর ভারত গড়ে উঠেছিল। অন্য দিকে, হিন্দু মহাসভার হাত ধরে সংখ্যাগুরু মঞ্চ ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার বীজ বপন করেছিল। বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান দেশের সংখ্যাগুরু জনতাকে হিন্দুত্বের আধারে জাগ্রত করতে চাইছেন। ফলে নরেন্দ্র মোদী ও জওহরলাল নেহরুর ভারতের চিত্রের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।

যখন আমাদের দেশে আধুনিক অর্থে জাতীয়তাবোধের বিকাশ শুরু হয়, তখন প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে এক রাষ্ট্র বা এক জাতিত্বের চেতনা আদৌ ছিল কি না, সে অনুসন্ধানও শুরু হয়। ভারতে নানা জাতি ও সভ্যতা এসে মানবজাতির এক মহোৎসবে মিলিত হয়েছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে এই তত্ত্বেরই জয়গান ধ্বনিত হয়েছিল। সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখতে চাওয়া বর্তমান সময়ের তথাকথিত ‘বিকশিত ভারত’ যে নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার সঙ্গে যোজনখানেক দূরত্ব রচনা করেছে, তা অনস্বীকার্য।

সঞ্জয় রায়, হাওড়া,

আশাজাগানিয়া

প্রতিটি সফল মানুষের পিছনে থাকে একটি গল্প। কিন্তু সেই গল্পের নেপথ্যে থাকা মানুষগুলো না থাকলে সাফল্যের গল্পটি হয়তো কখনও সৃষ্টিই হত না।

“‘পড়তে চাই’, বালিকার আর্জি শুনে স্কুলে ফেরালেন গ্রামবাসী” (২৪-১) প্রতিবেদনটি গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে। আজও প্রত্যন্ত গ্রামে বহু রূপা দাস আছে, যাদের অভাব অদম্য ইচ্ছের পথ রুদ্ধ করে দেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নাবালিকা মেয়েদের শিশুশ্রমে বা অকাল বিবাহে ঠেলে দেওয়া হয়। রূপার ক্ষেত্রেও তা হতে পারত, কিন্তু হয়নি।

কারণ তার পাশে দাঁড়িয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী, আশাকর্মী, স্থানীয় ক্লাবকর্তা, শিক্ষক, প্রশাসন এবং গ্রামবাসীরা। তাঁরা এক সঙ্গে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষ এখনও মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে।

গীতিকা কোলে, কলকাতা-৫২

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন