সম্পাদক সমীপেষু: কলমের গুলিগোলা


তাপস সিংহ ‘স্বাধীনতা, সংখ্যাগুরুর কৃপা’ (১৫-৮) লেখাটিতে নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তিনি ফারুক আহমেদ দার-এর কথা বলেছেন। যে কিনা সেনাবাহিনীর দিকে পাথর ছুড়েছিল বলেই জানা যায়। যে হেতু সে গরিব ও একটি বিশেষ ধর্মের মানুষ তাই শক্তিশালী সেনার বিরুদ্ধে সে এমন কাজ করতেই পারে? আমাদের দেশের নীতিবাগীশ মানুষরা বিশেষ একটা বোধশক্তি নিয়ে চলেন: দুর্বল বা গরিব বা অসহায় মানুষরা ভুল বা অন্যায় করতেই পারেন, যেন সেটা তাঁদের বিশেষ অধিকার। কিন্তু ধনী, বা শক্তিশালী সম্প্রদায়ের উক্ত অধিকার নেই। কিছু দিন আগেই দেশের এক বীর সন্তান ‘আওরঙ্গজেব’কে উগ্রপন্থীরা তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করল। হত্যার আগের ভিডিয়ো শো সারা পৃথিবী দেখল। এই ঘৃণ্য কাজের প্রতিবাদ কি বুদ্ধিজীবীদের লেখনী থেকে বেরিয়েছিল? না কি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কিছু সেনাকে মাঝে মাঝে হত্যা করাই যায়! সেই অধিকার উগ্রপন্থীদের আছে? আর, কাশ্মীরের বহু জায়গাতে আজও ১৪ অগস্ট পাকিস্তানের পতাকা তোলা হয়। বহু কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন করেন বলেই তো উগ্রপন্থীরা মারা গেলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মারাত্মক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শত শত গ্রামবাসী শবযাত্রায় বেরিয়েও পড়েন। তখন তাপসবাবুর মতো লেখকরা দেশের মানুষকে সংযত থাকার পরামর্শ দেন। মানবাধিকার রক্ষার দায় শুধু সেনাবাহিনীর থাকতে হবে। আর উগ্রপন্থীদের সমর্থনকারীরা যথেচ্ছ অন্যায়, অনৈতিক কাজ করে যাবেন, সেটার জন্য ক্ষোভ, বিক্ষোভ সৃষ্টি হলেই এই লেখকদের কলম ঝলসে উঠবে ওই ক্ষোভের বিপক্ষে!

মাত্র কয়েক দিন হল অসমে নাগরিক পঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের চাপে রাজ্য সরকার অতি দ্রুত কাজটি করতে বাধ্য হয়েছে। এত জটিল কার্যাবলি সম্পন্ন করতে গেলে ভুল থাকবেই। আর কিছু লোক তো বাইরে থাকবেনই, সে জন্যই তো নাগরিক পঞ্জি। কিন্তু কিছু লোক এটাকে রাজ্য সরকারের চরম অন্যায় বলে মনে করেই কলমের গুলিগোলা ছুড়ছেন। তাঁরা ভুলেই গিয়েছেন, কাজটা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে হয়েছে। তাঁরা বরং সুপ্রিম কোর্টের কাছে মতামত ব্যক্ত করুন।

নীলাদ্রি দাস, কলকাতা-১৪৪

 

এক ঢিলে

ক’দিন হল, একটা ভারী অদ্ভুত যুক্তি বাতাসে ভাসছে। অসমের নাগরিক পঞ্জি নিয়ে নাকি দেশের বাকি অংশের লোকের কিছু বলাটা উচিত নয়। কিন্তু প্রশ্নটা যখন দেশের নাগরিকত্বের, তখন এটাকে আর শুধু অসমের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলা বোধ হয় ঠিক হবে না। তালিকা-বহির্ভূতদের নিয়ে সরকার কী করতে চলেছে, সেটা প্রথমে খুব পরিষ্কার না হলেও, বিরোধী শক্তির লাগাতার চাপটুকু যে দরকার ছিল, তা সংসদে সরকার পক্ষের জবাবি ভাষণ দেখলেই বোঝা যায়। গত ৩-৮ তারিখে রাজ্যসভায়, উনি বললেন, ‘আব্বুলিশ’! উনি মানে স্বরাষ্ট্রসেবক। রাজনাথবাবু যা বললেন তার সংক্ষিপ্তসার করলে দাঁড়ায়, নাগরিক পঞ্জির মাধ্যমে রাষ্ট্র কেবল এটুকু জানতে চাইছে, কারা আমাদের দেশের বৈধ নাগরিক, আর কারা নন। লিস্টের বাইরে যাঁরা আছেন তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্টের টাটকা রায় উদ্ধৃত করে ৭ নম্বর শর্ত প্রসঙ্গে এমপি সুখেন্দুশেখরবাবুর যে প্রশ্ন ছিল সেটাও নাকি হুবহু মানা হচ্ছে। কিছু দুষ্টু লোক শুধু শুধু তিলকে তাল করছে। মিলল না, মিলল না, কিচ্ছুটি মিলল না। ‘বিদেশি তাড়াব’ জাতীয় যে আস্ফালন ক’দিন যাবৎ অমিত শাহবাবু দিলীপবাবু থেকে ছোটবড় নেতাগণ করছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদিতে ভক্তগণ যে ভাবে হা-রে-রে-রে করে দেশের সুরক্ষা চিন্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তার থেকে পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে, রাষ্ট্র জানাল, আব্বুলিশ! তেমন কিছুই হচ্ছে না, শুধু একটু নাগরিক- নাগরিক খেলছি! যদিও জানানো হয়নি, ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোয় এখন কত জন আছেন, তাঁরা কী ভাবে বন্দি থাকা অবস্থায় প্রামাণ্য নথি জোগাড়ের চেষ্টা করবেন, বা ক্যাম্প গড়ার কাজে কেন্দ্রীয় কোষাগার থেকে এর পর আরও টাকা মঞ্জুর হল কেন? আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই ভাবলেন, বাঃ! সামান্য একটা আঞ্চলিক দলের হট্টগোলে এতটা পশ্চাদপসরণ! এতটা সাদামাটা পরিকল্পনা যে রাষ্ট্রের ছিল না সেটা তো স্পষ্ট, কারণ নেতা-মন্ত্রীদের বিবৃতি ছাড়াও ২২০ কোম্পানি সেনা পাঠানো, নেট বন্ধ, আগাম ১৪৪ ধারা জারি, জনপ্রতিনিধিদের আটকে দেওয়া, এগুলো কারওই চোখ এড়ায়নি। সমস্যা কিন্তু আরও অনেক গভীরে। গত কয়েক বছরে ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের  কথা মনে রাখলে, এই ৪০ লাখি লুকোচুরির গুরুত্ব সম্যক অনুধাবন করা শক্ত নয়। এক ঢিলে কয় পাখি মারা হল গুনতে থাকুন: ১) রাফালের মতো পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির ইসু এক ধাক্কায় পিছনের সারিতে চলে গেল। ২) মেহুল ভাইয়ের অ্যান্টিগা পলায়নে সক্রিয় সহযোগিতার কেলেঙ্কারি ধামাচাপা। ৩) জিডিপি, বেকারত্ব, তেল, গ্যাসের দাম, নোটবন্দি, যাবতীয় ব্যর্থতার খতিয়ান আপাতত আড়ালে। ৪) উন্নাও, কাঠুয়ায় অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা লোকে ভুলে গেল। ৫) সব চেয়ে বড় কথা, নতুন একটা বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপণ করা গেল, ধর্ম, জাতিবিদ্বেষের পর আঞ্চলিকতা বিদ্বেষ। মেরুকরণ যাদের ক্ষমতা দখলের প্রধান উৎস, তাদের পক্ষে এর চেয়ে ভাল কী-ই বা হতে পারে?

মানস ঘোষ, হাওড়া

 

নিজে দেখেছি

আমি কর্মসূত্রে তিন বছর নমনি (লোয়ার) অসমে থেকে চোখের সামনে দেখেছি, রাতারাতি একটা গোটা এলাকা কী ভাবে ইমিগ্রেশন করে দখল করা হল এবং রাতারাতি কিছু টাকা দিয়ে ভোটার আইডি কার্ড এবং অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি হল (অবশ্যই আগের সরকারের আমলে)। সত্যি বলতে কী, আজ এই নাগরিক পঞ্জির সূত্রে আগামী দিনে হয়তো আমরা এক নূতন কাশ্মীর দেখব। জানি না কেন বাংলা সরকার এ বিষয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামাচ্ছে, উত্তর বাংলায় ইতিমধ্যেই এই পদক্ষেপ করা উচিত ছিল।

প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, ইমেল মারফত

 

খাল কেটে

অধুনা বারুইপুরের কিছু এলাকায় শাসকদলের মদতে পুষ্ট ব্যক্তিরা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে ভারতীয় নাগরিকত্ব (নিদেন পক্ষে ভোটার কার্ড) পাওয়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। আড়ালে আবডালে অনেক জায়গায় এ হেন চেষ্টা চলছে। আমি নিজে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন পাশ করা চাকরি-সন্ধানী এক যুবক। যে বন্ধুরা চাকরি পেয়েছে, তাদের সিংহভাগ এখন ভিনরাজ্যে। বেঙ্গালুরু, পুণে, হায়দরাবাদে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের ভিড়। আর যারা এ রাজ্যে চাকরিরত, তারাও নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিম্নযোগ্যতার কাজে যুক্ত। যোগ্যতার অভাবে নয়, চাকরির অভাবে। আমি নিজের পারিপার্শ্বিক বললাম। রাজ্যের এ রকম কত বিষয় আছে, যার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার মতো মানসিকতা এখনও দেখা যায়নি। সেখানে রাজ্য কিনা বাইরের শরণার্থী আর অনুপ্রবেশকারীদের হয়ে ওকালতিতে নেমেছে। ঘরের লোককে বসতে দেওয়ার যোগ্যতা যার নেই, পাশের বাড়ির লোকের জন্য দরদ দেখানোও তার শোভা পায় না।

অসম সরকার একটি অসাধারণ পদক্ষেপ করেছে। অসমের আসল নাগরিকরা যাতে রাজ্যের সমস্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্য এই কঠোর পদক্ষেপ। বলা দরকার, এখনও পদক্ষেপটি ত্রুটিমুক্ত নয় এবং সম্পূর্ণও নয়। কিন্তু আমাদের রাজ্য যখন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত, তখন বহিরাগতদের প্রতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ সমর্থন খাল কেটে কুমির আনার সমান।

শুভজিৎ পাল, কলকাতা-১৪৪