‘শ্রীআশা ভোঁসলে (১৯৩৩-২০২৬)’ (১৩-৪) প্রয়াণলেখের পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখা। সঙ্গীতের জগতে আশা ভোঁসলে এক কিংবদন্তি নাম। গত আট দশক ধরে তাঁর সুধাকণ্ঠে সমস্ত ভারতবাসী মুগ্ধ। দীর্ঘ জীবনে তিনি শুধু হিন্দি নয়, অন্যান্য ভারতীয় ভাষাতেও অজস্র গান করেছেন।
বাংলা গানের জগতে তাঁর গান গাওয়ার ইতিহাসও কম দিনের নয়। তাঁর যাত্রাপথকে মোটামুটি দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হল গত শতাব্দীর মোটামুটি পঞ্চাশের দশক থেকে ষাটের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন সুরকারের সুরে গাওয়া গান, এবং এর পর রাহুল দেব বর্মণ-এর সুরে বিভিন্ন আঙ্গিকের গান। বিশেষত বাংলায় যে সুরকারের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি হলেন সুধীন দাশগুপ্ত। তাঁর সুরে ‘আকাশে আজ রঙের খেলা’ আর ‘নাচ ময়ূরী নাচ রে’ ভীষণ জনপ্রিয় হয়। মান্না দে-র সুরে ‘আমায় তুমি যে ভালবেসেছ’ এবং ‘যে গান তোমায় আমি’, নচিকেতা ঘোষ-এর সুরে ‘থুইলাম রে মন’, ‘মনের নাম মধুমতী’— সব গানেই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কণ্ঠনৈপুণ্য, সরল অভিব্যক্তি আর গানের প্রতি ভাবের প্রকাশ।
রাহুল দেব বর্মণ-এর সুরে ‘যাব কি যাব না’ ও ‘এই এ দিকে এসো’ গানের মাধ্যমে ধরা পড়েছে তাঁর গলার লাস্য, চটুলতা আর নাটকীয়তার অপূর্ব মিশ্রণ। রাহুল প্রকৃত অর্থেই ছিলেন প্রতিভাবান শিল্পী। শুধু লোকসঙ্গীত নয়, পাশ্চাত্য সঙ্গীতকেও আত্মস্থ করে নিজের মতো করে সুর প্রয়োগ করেছেন। আর সেই সব প্রয়োগের বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটেছে আশার এই সব গানের মাধ্যমে, যেমন ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না’, ‘ফুলে গন্ধ নেই’, ‘কথা দিয়ে এলে না’, ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’ প্রভৃতি।
এ ছাড়া বাংলা সিনেমায় তাঁর গানের সংখ্যা কিছু কম নয়। সুরকারদের মধ্যে আছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, পবিত্র চট্টোপাধ্যায়, রাহুল দেব বর্মণ প্রমুখ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘তোমার গানের সরগম’ (প্রক্সি), সুধীন দাশগুপ্তের সুরে ‘মন মেতেছে মন ময়ূরীর’ (পিকনিক), ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’ (প্রথম কদম ফুল), পবিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘আমি আপন করিয়া’ (মেঘ কালো), নচিকেতা ঘোষের সুরে ‘নাচ আছে গান আছে’ (ফরিয়াদ) প্রভৃতি গানে ঘটেছে প্রতিভার বিচ্ছুরণ।
গানের জগতে আশা ভোঁসলে অনন্য। বিরল তাঁর প্রতিভা। আর তাই, যত দিন গানের জগৎ বেঁচে থাকবে, তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।
অবনীন্দ্র মোহন রায়, কলকাতা-৯৬
সঙ্গীতনদী
জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘অদ্বিতীয়া: সুরের আগুন অনির্বাণ, প্রয়াত আশা’র (১৩-৪) পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। আশা ভোঁসলে যে যুগসন্ধিক্ষণে প্লেব্যাক জগতে প্রবেশ করেন, সে সময় তাঁর দিদি সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর গানের জগতে সুপ্রতিষ্ঠিতা। ‘মেলডি’ আর লতা যেন সমার্থক। যে কোনও মেলডি-ভরা গান মানেই, নামকরা সঙ্গীত পরিচালকেরা চোখ বুজে লতাকেই ভরসা করতেন। বুদ্ধিমতী আশা সহজেই বুঝে যান যে, এই ফিল্মি গানের জগতে খ্যাতি লাভ করতে হলে তাঁকে শুরুতে অন্য ঘরানার গান বাছতে হবে। তাই তিনি তৈরি করলেন এক আপন স্বকীয়তা, নিজস্ব স্টাইল। সে সময় তিনি পাশে পেয়ে গিয়েছিলেন বিখ্যাত সুরকার ওপি নায়ার-কে। ওপি এবং আশা সঙ্গীতজগতে এক নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। সেই সব গানে এতটাই মাদকতা ও নিজস্বতা ছিল যে, গান বাজলেই শ্রোতারা বুঝে যেতেন— এই গান ওপি-আশা জুটির।
তার পর এল রাহুল দেব বর্মণের যুগ। আরডি এবং আশা— এ যেন হীরকখচিত সহাবস্থান। কত শত কালজয়ী গান যে তাঁদের জুটিতে তৈরি হয়েছে, তা বলে শেষ করা প্রায় অসম্ভব। আশাকে নিয়ে আর ডি সঙ্গীতের ল্যাবরেটরিতে রকমারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, যেগুলি সাফল্য লাভ করেছে।
এক কথায় সঙ্গীতনদীর সব ক’টি ধারা— প্রেমসঙ্গীত, আধুনিক গান, গজল, ভজন, কাওয়ালি, ধ্রুপদী, ক্যাবারে, সুফি সঙ্গীত— সবেতেই তাঁর সহজ সন্তরণ। তিনি স্নাত সুমধুর সুরের মরমিয়া মূর্ছনায়। আর সেই সুরতরঙ্গের পেলব অভিঘাতে ধন্য হয়েছেন অগণিত শ্রোতা।
অভিজিৎ কর, নয়াবস্তি, জলপাইগুড়ি
আশার সেতু
বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েও, বাংলার বুকে বাস করেও আজ বহু তথাকথিত ‘বাঙালি’ গর্ব করে বলেন— ‘আমার বাংলাটা ঠিক আসে না’। ইচ্ছাকৃত হিন্দি বা ইংরেজি উচ্চারণে বিকৃত বাংলা বলা, কিংবা অযথা বহির্বঙ্গীয় শব্দ জুড়ে দিয়ে নিজেদের ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘আন্তর্জাতিক মানসিকতা’র প্রমাণ দিতে চাওয়া যেন এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এমন এক সময়েই সাদা-কালো যুগের কলকাতা দূরদর্শনের একটি সাক্ষাৎকার আমাদের অন্য এক ছবি দেখাল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মহারাষ্ট্রের কন্যা হয়েও আশা ভোঁসলে কী অনায়াসে, ঝরঝরে বাংলায় কথা বলছেন। উচ্চারণ নিখুঁত না হলেও তার মধ্যে যে শ্রুতিমাধুর্য, যে আন্তরিক শ্রদ্ধা, তা অনস্বীকার্য।
তাঁর প্রতিটি কথায় ধরা পড়ে বাংলার মাটি, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি, বাঙালি সত্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি গভীর ভালবাসা ও মমত্ব। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘বড়ো আশা ক’রে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও,/ ফিরায়ো না জননী’ এই আবেগেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
যাঁকে বাঙালি হৃদয় এক বার আপন করেছে, তাঁকে কোনও দিন ফেরানো যায় না। বিখ্যাত মরাঠি গান ‘রেশমাচ্যা রেঘানী’র অনুপ্রেরণায় গাওয়া ‘কাজল কাজল আঁখিতে/ তোমায় বেঁধে রাখিতে/ ছল করে যাই আমি জল আনিতে’র শিল্পী ‘আশা-তাই’ (আশাদিদি) বাংলা ও মহারাষ্ট্রের মধ্যে অনন্য সাংস্কৃতিক সেতু হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
কাজল চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-১১৪
হৃদয়ের টান
চলচ্চিত্রসঙ্গীতের পাশাপাশি বাংলা আধুনিক গানেও আশা ভোঁসলে রেখে গেলেন গভীর অবদান। বাংলা ভাষা তাঁর মাতৃভাষা না হলেও বাংলা গানের প্রতি তাঁর টান ছিল হৃদয়ের। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— “বাংলা গান গাইতে আমার আলাদা ভাল লাগে; এই ভাষার সুর আর কথার মধ্যে এক অদ্ভুত মাধুর্য আছে।” এই অনুভব থেকেই বাংলা গানের প্রতি তাঁর নিবেদন এত আন্তরিক। বাংলা গানে তাঁর কণ্ঠে সৃষ্টি হয়েছে একের পর এক অনবদ্য সুরস্মৃতি। ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি’— গানগুলি আজও বাঙালি হৃদয়ে সমান জনপ্রিয়। রাহুল দেব বর্মণ-এর সুরে গাওয়া তাঁর বাংলা গানগুলি আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণভান্ডারে অমূল্য সম্পদ।
তাঁর কণ্ঠে বাংলা সঙ্গীত পেয়েছিল এক নতুন সৌন্দর্য, এক নতুন আবেদন। তিনি বাংলা গানের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়।
হেমন্ত গরাই, চন্দননগর, হুগলি
চিরন্তন
প্রেম, বিরহ, উচ্ছ্বাস কিংবা জীবনের গভীর অনুভূতি— সব কিছুকেই আশা ভোঁসলে তাঁর কণ্ঠে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। রাহুল দেব বর্মণ-এর সঙ্গে তাঁর জুটি চিরকালীন কিংবদন্তি। এমনকি পরিণত বয়সেও নতুন নতুন সুরের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন।
বাংলা গানেও তাঁর আধিপত্য ছিল। বাঙালি শ্রোতারা তাঁর কণ্ঠের জনপ্রিয় গানগুলি, যেমন ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘আসব আর এক দিন’, এবং ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ প্রভৃতি চিরকাল মনে রাখবেন।
সুবীর ভৌমিক, কলকাতা-৫৫
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে