জরুরি কাজে বেরিয়েছেন, অথবা রোজকার মতো অফিসেই যাচ্ছেন, আর রাস্তায় অন্তহীন যানজটে আটকে পড়লেন, এমনটা তো রোজই হচ্ছে। ঘোর বিরক্তিকর। ক্ষতিকরও বটে। শুধু মেজাজের ক্ষতি নয়, আর্থিক ক্ষতি।
সেই ক্ষতির পরিমাণ ঠিক কতটা, আমরা তা হাতে-কলমে হিসেব কষে দেখেছি। কলকাতার কয়েকটি ব্যস্ত রাস্তা বেছে নিয়ে সকাল ও বিকেলের অফিসবেলায় সেখানে কতটা যানজট থাকে, তার সূচক তৈরি করেছি। সেই সূচকটির নাম ‘কনজেশন ইনডেক্স’ বা পুঞ্জীভবন সূচক।সকাল ন’টা-দশটা এবং বিকেল ছ’টা-সাতটা— দিনের মাত্র দু’ঘণ্টা নিয়ে এই হিসেব। যে রাস্তায় এই সূচক যত বেশি, সে রাস্তায় যানের গতি তত কম।
দিনের ব্যস্ততম সময়ে এই রাস্তাগুলিতে গাড়ির গড় গতি কত থাকে, এবং কত থাকা উচিত, তার ওপর নির্ভর করেই এই হিসেব কষা হয়েছে। কোনও রাস্তায় গাড়ির গতি কত থাকা উচিত, তা নির্ভর করে সেই রাস্তার প্রস্থ, তাতে চলাচল করা গাড়ির সংখ্যা, পথচারীর সংখ্যা এবং রাস্তার দু’পাশে থাকা দোকানপাটের সংখ্যার ওপর। অর্থাৎ, যে রাস্তা অর্থনৈতিক কারণে ব্যস্ত, সেখানে গাড়ির গতি স্বাভাবিক ভাবেই কম হবে।
রাস্তার দৈর্ঘ্য কত, এবং সে রাস্তায় পুঞ্জীভবন সূচক কত, এই দুটি অঙ্ক জানা থাকলে হিসেব কষে বের করা যায়, রাস্তাগুলোয় দৈনিক মোট কতটা সময় নষ্ট হচ্ছে, এবং টাকার অঙ্কে সেই সময়ের মূল্য কত। যাঁরা ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়েন, ধরে নিচ্ছি যে তাঁদের সময়ের মূল্য বাসে-ট্রামে চড়া মানুষের সময়ের মূল্যের তুলনায় ঢের বেশি।
সঙ্গের সারণিতে হিসেব রয়েছে, কলকাতার দশটি রাস্তায় দিনে দু’ঘণ্টায় মোট কত টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এটুকু হিসেবেই ক্ষতির পরিমাণ বছরে কয়েক কোটি টাকা। মনে রাখা প্রয়োজন, ‘অফিস টাইম’ বা ‘পিক আওয়ার্স’ কলকাতায় দিনে মাত্র দু’ ঘণ্টা নয়, এবং ব্যস্ত রাস্তার সংখ্যাও মাত্র দশটা নয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র কলকাতা পুরসভা এলাকাতেই এই ক্ষতির পরিমাণ হিসেব করতে গেলে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হবে।
এই ক্ষতির অর্থ— শহরের রাস্তায় যানজটে পড়ে এবং ধীর গতির জন্য যে সময় আমরা নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছি, তার জন্য আমাদের প্রত্যেকের উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। যাঁরা বাঁধা মাইনের চাকরি করেন, তাঁরা সময়টুকু বাঁচাতে পারলে অন্য কোনও কাজ করে কিছু আয় করতে পারতেন। কিংবা কোনও বিনোদন অথবা বাজার-দোকান করে কিছু ব্যয় করতে পারতেন, যা বিক্রেতার আয় হিসেবে পরিগণিত হত। এই ক্রেতার ব্যয় এবং বিক্রেতার আয়— অর্থশাস্ত্রের পাঠ্যপুস্তক বলবে, এর মাধ্যমেই উৎপাদন বৃদ্ধি পায় সব ক্ষেত্রে। এবং কর্মসংস্থানও বাড়তে পারত। এক কথায়, অর্থনীতিতে অর্থ চলাচলের প্রক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পেত এবং উৎপাদন, কর্মসংস্থান— সবই আরও উজ্জীবিত হত।
তা ছাড়া, যানজটের কারণে বায়ু এবং শব্দদূষণ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের প্রভূত ক্ষতি করে। এর জন্যও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পায়। অর্থনৈতিক দিক থেকে এ সব ক্ষতির হিসেব করতে গেলে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন। অনেকে হয়তো ওপরের যুক্তি মেনে দূষণের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসাকেও ওষুধ কোম্পানি এবং ডাক্তারের বর্ধিত আয় হিসেবে দেখতে চাইবেন। কিন্তু সেটা তো কাম্য নয়। এ ছাড়া যানজটে আটকে সময়মত গন্তব্যে পৌঁছতে না পারার যে মানসিক ধকল, তারও মূল্য আছে। তা বিভিন্ন রোগেরও সৃষ্টি করে।
কোনও শহরের যত আর্থিক উন্নতি হবে, যান চলাচলও ততই বাড়বে। যানজটও বাড়বে। দিল্লির রাস্তার ধারণক্ষমতা কলকাতার থেকে ঢের বেশি হওয়া সত্ত্বেও দিল্লিতে যানজটের প্রবণতা অনেক বেশি। অনেকেই কোনও শহরের আর্থিক উন্নয়নের মাপ হিসেবে তার যানজটের পরিমাণের হিসেব কষেন। কিন্তু, এই জটের থেকে নিস্তার পাওয়ার কি কোনও পথ নেই?
শ্লথ গতি এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষতির পরিমাণ কমানোর একটি উপায় হল, রাস্তায় ছোট গাড়ির সংখ্যা কমানো। তার জন্য গণপরিবহণে জোর দিতে হবে। পঞ্চাশটি ছোট গাড়ির বদলে একটি বড় বাস রাস্তায় জায়গা কম নেবে এবং দূষণও কমবে। কিন্তু, এর আবার উল্টো দিকও আছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমাতে হলে গাড়ি-শিল্পকে নিরুৎসাহ করতে হয়। এই উদার অর্থনীতির যুগে তেমন কথা বলার সাহস কার আছে? এবং, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করলে যে শুধু বড়, বহুজাতিক গাড়ি নির্মাতা সংস্থারই ক্ষতি, তা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ বেকার হয়ে যাবেন, এমনকী ড্রাইভার, মিস্তিরিরাও কর্মচ্যুত হবেন। আর সরকারি ভর্তুকিতে এবং ভাড়া কম রেখে এত বাস চালু করলে কোষাগারেও টান পড়ে। কিন্তু, ভাড়া বাড়তে দিলেও মুশকিল। পরিবহণ অর্থনীতি বলে, যাত্রীভাড়া লাগামছাড়া ভাবে বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি অবধারিত।
যানজটের সমস্যা এড়ানোর অন্য পথ হল রাস্তা চওড়া করা, সেতু-উড়ালপুল ইত্যাদি তৈরি করা। কিন্তু সেখানে সমস্যা জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক— সব রকম ব্যয়ই এখানে জড়িত। তবে লাভের পরিমাণ যদি ব্যয়ের থেকে বেশি হয়, তা গ্রহণযোগ্য। পরিবহণ অর্থনীতি অবশ্য বলে, রাস্তার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে পরিবহণের চাহিদা ও জোগান— দুই’ই বৃদ্ধি পায়। তাই ঘুরে-ফিরে আবার যে তিমিরে, সে-ই তিমিরেই!
আর একটি উপায় হল কনজেশন চার্জ বা পুঞ্জীভবন মাশুল। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে মাশুলটি দিতে হবে। এই মাশুল না থাকার অর্থ হল, আসলে সরকার গাড়িওয়ালাদের ভর্তুকি দিচ্ছে। এই মাশুল সবাইকে দিতে হলে গাড়ির ব্যবহার কমতে পারে। সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা পরিবহণ কাঠামোর উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে। বিদেশের কিছু বড় শহরে ‘সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’-এ গাড়ির প্রবেশ নিষেধ। তবে এখানেও গাড়ির ব্যবহার কমালে বা বাস ইত্যাদির ভাড়া বাড়ালে তার নেতিবাচক দিকগুলি প্রকট হয়ে ওঠে।
স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে সব নাগরিকের গাড়ির মালিকানা এবং ব্যবহারের অধিকার আছে। সরকারের গাড়ি শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ারও দরকার আছে। যে অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে আজ গাড়ির ব্যবহার এত বেড়ে গেছে, তাকে হঠাৎ রোধ করা যায় না। আবার যানজট এবং দূষণ কমানোর দায়িত্বও সবাইকেই নিতে হবে। তাই সরকারের দায়িত্ব গোটা ব্যবস্থাটিকে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে তোলা। তাকে নিরুৎসাহ করা নয়। পরিকাঠামোর উন্নয়ন, রাস্তাঘাট চও়়ড়া করা, সুষ্ঠু ভাবে যান নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের জন্য সুব্যবস্থা, নিয়মকানুন সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি করা, এবং প্রয়োজনে বেসরকারি সাহায্য নেওয়া— এ সব সরকারের কর্তব্য। এতে অবস্থার উন্নতি সম্ভব।
সুদক্ষিণা গুপ্ত ও অপরাজিতা চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক