সর্বজনীন ন্যূনতম আয় চালু হলে একটা ভয় আছে। সরকার বলতে পারে, এই তো সবাইকে একটা টাকা ধরে দিচ্ছি, আর আমাদের কোনও দায় নেই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্যের নিরাপত্তা, এ সবের জন্যে আর খরচা করব কেন?
বন্ধু জঁ দ্রেজ-এরও একই ভয়, কোনও ভাবে একটা ন্যূনতম আয় চালু করে দিয়ে গরিবের জন্য প্রচলিত অন্য নানা প্রকল্প তুলে নেওয়া বা কাটছাঁট করা হতে পারে। কিন্তু সেটা হলে খুব অন্যায় হবে। এই জন্যেই আমি বলছি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি ইত্যাদি নানা বিষয়ে যে সরকারি উদ্যোগ, ন্যূনতম আয়কে কখনওই যেন তার বিকল্প ভাবা না হয়, ওগুলোকে ছোঁয়া চলবে না। তার একটা কারণ, অনেক সময় টাকা থাকলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে লোকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যথেষ্ট বা ঠিক মতো খরচ করে না। এ ছাড়া একটা তাত্ত্বিক বা দর্শনগত কারণও আছে। ন্যূনতম আয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ‘দায়িত্ব’-এর কথা বলেছিলাম। কেউ যদি সেই দায়িত্ব পালন না করে, টাকাটা উড়িয়ে দেয় এবং তার বা তার পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনগুলো অপূর্ণ থাকে, তা হলে কি আমি ‘টাকা তো দিয়ে দিয়েছি, আর কিছু জানি না’ বলে চুপ করে বসে থাকব? কেউ নিজের দোষে দুর্ঘটনায় জখম হলে আমি কি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব না? এই কারণেই আমি এনরেগা বা কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পটাও বজায় রাখার পক্ষে। তুমি যদি টাকাটা উড়িয়ে দাও, তা হলে মাটি কাটা বা পাথর ভাঙার কাজ করতে পারো। অবশ্য এটা কেবল কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই।
আর খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা?
এটা নিয়ে আমার মনে একটু দোটানা আছে। সস্তায় খাদ্যশস্য সরবরাহের আয়োজন চালু রাখতে গিয়ে অনেকগুলো গোলমাল হচ্ছে বহু কাল ধরে। বড় চাষিদের পিছনে বিরাট ভর্তুকি গুনছে সরকার। তাঁরা নলকূপ বসিয়ে যথেচ্ছ জল তুলে পরিবেশের সর্বনাশ করছেন। তা ছাড়া চাল-গম বাদে অন্য জিনিস, যেমন ডাল তেল সব্জি ইত্যাদি উৎপাদনে তুলনায় যথেষ্ট প্রেরণা থাকছে না। এ দিকে এফসিআইয়ের বিরাট অপচয় আর দুর্নীতির ফলে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থাটা হয়তো সাময়িক ভাবে চালু রাখতে হবে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায়। কিন্তু ন্যূনতম আয় ঠিক ভাবে চালু করতে পারলে সস্তায় খাবার দেওয়ার প্রয়োজন ক্রমশ কমবে।
কিন্তু এখানেই আমি জোর দিয়ে বলব, এই ন্যূনতম আয়টা দুম করে চালু করে দেওয়ার ব্যাপার নয়। আগে প্রস্তুতি দরকার, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, আধার কার্ড ইত্যাদি পুরো পরিকাঠামো তৈরি করা দরকার। দু’একটা রাজ্যে পরীক্ষামূলক ভাবে এটা চালু করে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সব রাজ্যে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, যেমন বিহারে ও উত্তরপ্রদেশে, সেখানে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার জায়গায় ক্রমশ ন্যূনতম আয়ের দিকে এগোনো যেতে পারে।
অনেক রাজ্যে শুধু মেয়েদের নিয়ে ন্যূনতম আয় প্রকল্প শুরু করে দেখা যায়। তারা তো অত মদও খায় না, টাকা উড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও কম! কিংবা জঁ দ্রেজ ও রীতিকা খেরা যেটা বলছেন, প্রথম পর্বে একটা বয়সের পরে সবাইকে পেনশন দাও, আমি তাতেও রাজি আছি। দুই, সমস্ত প্রসূতি ও সদ্য-জননীকে ভাতা দাও, সেটাও ভাল প্রস্তাব। আমি এর সঙ্গে জুড়তে চাই, ইউরোপের অনেক দেশের মতো, শিশু ভাতা। পরিবারে শিশু থাকলেই একটা নির্দিষ্ট টাকা দেওয়া হবে। অন্তত প্রত্যেক শিশুকন্যার জন্য ভাতা দেওয়া যেতে পারে। (মনে হয় না, তাতে আমাদের পড়তি জন্ম-হার অত্যধিক বেড়ে যাবে।) এই তিনটে অনেকগুলো রাজ্যেই শুরু করা যায়, কারণ খুব বেশি টাকা লাগবে না। এ ছাড়া বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, জননী সুরক্ষা ইত্যাদি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, এ সব খাতে প্রশাসনিক ব্যর্থতা অনেক কম, তবে ভাতাগুলির পরিমাণ সামান্য।
মানে রাজ্য ধরে ধরে বিভিন্ন প্রকল্প করা...
এর আর একটা সুবিধে হল, রাজ্য সরকারি ভর্তুকি সাশ্রয়ের তাগিদটা বেশি হতে পারে, মোদী উপর থেকে হুকুম দিয়ে ভর্তুকি কমাতে বললে অনেক রাজ্যই শুনবে না। আর, যে সব রাজ্যে আর্থিক অবস্থা তুলনায় ভাল, সেখানে ন্যূনতম আয় প্রকল্পটা শুরু করা যায়, কাজ হলে অন্যরাও উৎসাহ পাবে। এই ভাবে ধাপে ধাপে করা যায়। ঢাকঢোল পিটিয়ে হঠাৎ একটা ঘোষণা করে দিলাম, তাতে কাজও হবে না, মাঝখান থেকে ধারণাটার বদনাম হবে। মোদীর অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার প্রবণতা প্রকট বলেই এই কথাটা বলা বিশেষ দরকার। কেরামতি দেখিয়ে ২০১৯-এর ভোটে জিতব ভাবলে বিপদ। নোট বাতিলের ফলে, যা হিসেব দেখলাম, এ বছর অর্থনীতির আড়াই লাখ কোটি টাকা ক্ষতি হবে। বেশির ভাগটাই তো গরিবের ক্ষতি। তাই একটু ভেবেচিন্তে প্রস্তুতি নিয়ে এমন নানা উদ্যোগ করলে বরং গরিবের ক্ষতির খানিকটা পূরণ হবে!
আর একটা প্রশ্নও জঁ দ্রেজরা তুলে থাকেন। আমাদের দেশে সামাজিক খাতে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যে, সরকারের খরচ খুব কম, অনেক অনুন্নত দেশের তুলনায়ও কম। তাই টাকা থাকলে আগে স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে খরচ করা উচিত। কথাটায় খুবই যুক্তি আছে। অন্যান্য প্রয়োজনের টাকাটা কোথা থেকে আসবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
নতুন কর না বসিয়ে কতটা কী করা যায়, তা আগেই বলেছি। কিন্তু নতুন করই বা বসবে না কেন? তার সুযোগ তো আছে! যেমন, প্রথমত, ক্যাপিটাল গেনস ট্যাক্স। ধনতান্ত্রিক আমেরিকাতেও দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী আয়ের ওপর কর নেওয়া হয়, আমাদের দেশে নেওয়া হবে না কেন? দুই, জমি-বাড়ি বা রিয়েল এস্টেটের উপর যথেষ্ট কর আদায়ের ক্ষেত্রে কারচুপি হয়েই চলেছে। সেটাকে শোধরাতে পারলে রাজ্য এবং পুরসভার আয় অনেক বাড়তে পারে। তিন, কৃষি আয়। বড় বড় ফার্মহাউস বা বাগানবাড়ি করে কিংবা কৃষির নামে বড়লোকেরা কর ফাঁকি দিয়ে চলেছে, অথচ উঁচু মাত্রার কৃষি আয়ের উপর কর বসানোর কথা বললেই গরিব চাষির নামে স্লোগান উঠবে! চার, উত্তরাধিকারের ওপর কর। আমেরিকার মতো দেশেও সে কর বসানো হয়। আমাদেরও ছিল, কিন্তু সেই আশির দশকে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাঁচ, ওয়েলথ ট্যাক্স বা সম্পদ কর। গোটা দুনিয়া জুড়ে যখন সম্পদের বৈষম্য নিয়ে বিরাট আলোচনা চলছে, গ্লোবাল ওয়েলথ ট্যাক্স বসানোর কথা উঠছে, ঠিক তখনই, গত বছরের বাজেটে ভারতে সম্পদ কর তুলে দেওয়া হল! পরিহাস বটে। অথচ গত কুড়ি-তিরিশ বছরে আমাদের দেশে সম্পদের বৈষম্য অনেকটাই বেড়েছে, এখন তার মাত্রা পৃথিবীর প্রথম সারিতে, ব্রাজিল ইত্যাদি লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সমকক্ষ। কিন্তু সম্পদের ওপর আমাদের আর কর দিতে হবে না!
অবস্থাপন্নদের ভর্তুকি রদ করে, রাজস্ব ছাড়ের মাত্রা কমিয়ে, তার সঙ্গে যে করগুলো বললাম সেগুলো বসানো গেলে যে বাড়তি রাজস্ব আসবে তা দিয়ে একটা ভাল অঙ্কের ন্যূনতম আয়ের ব্যবস্থা করেও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে খরচ বাড়ানো সম্ভব। ফিসকাল স্পেস বা রাজকোষের পরিসর আছে, সেটা বাড়ানোর রাস্তাও আছে। কিন্তু সে জন্য রাজনৈতিক পরিসরটা তৈরি করা চাই।
(শেষ)
সাক্ষাৎকার: অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়