West Bengal Assembly Election 2026

ভোটনির্ঘোষ

আগেও এ রাজ্যে ভোটকালীন রদবদলের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তবে কিনা, রদবদলের এমন ব্যাপকতা আগে দেখা যায়নি, এই যুদ্ধকালীন তৎপরতাও না। বোঝাই যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের এ বারের নির্বাচন কোনও কারণে একান্ত বিশেষ বলেই মনে করছে কেন্দ্র।

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫১
Share:

ভোট আসতে মাসাধিক কাল বাকি, কিন্তু দু’হাজার ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পরিণত। একের পর এক বিস্ময়কর, অস্বস্তিকর ও অভূতপূর্ব ঘটনার সমাবেশে এ বারের নির্বাচন এক ব্যতিক্রমী চেহারা নিয়েছে। সামনের মাসে একই সঙ্গে আরও চারটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচন, একই সঙ্গে পাঁচ ভোটনির্ঘণ্ট ঘোষিত— কিন্তু তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ কেবল ব্যতিক্রমী নয়, নিঃসন্দেহে একক ও বিশিষ্ট। ভোটের ঘোষণা ইস্তক একের পর এক চমক। একমাত্র এই রাজ্যেই এ বারে দুই দফায় ভোট, অন্য সব রাজ্যে এক দফায়। বিশেষ উল্লেখনীয়, অনেক দিন পর এই রাজ্যে এত কম দফায় ভোট। আপাত যুক্তিটি হল— ভোটকালীন হিংসা, বিশৃঙ্খলা ও সংঘাতের সম্ভাবনা হ্রাসের জন্যই এই ব্যবস্থা। ইতিপূর্বে অবশ্য কমিশনেরই বিবেচনা ছিল, হিংসা ও অশান্তি কমানোর উপায় হল অনেকগুলি পর্বে ভেঙে ভোটগ্রহণ। হিসাব পাল্টানোর কার্যকারণ যা-ই হোক, সৌভাগ্য যে একশো আশি ডিগ্রি ঘূর্ণিত এই যুক্তিতে দুই দফায় ভোটকে শাসক-বিরোধী সব দলই স্বাগত জানিয়েছে। তদুপরি দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গেই সর্বাধিক সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। একমাত্র এই রাজ্যেই ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতে এক জন করে পর্যবেক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে গুরুতর, ভোট ঘোষণার রাতেই এই রাজ্যের মুখ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিব পরিবর্তিত হয়েছেন। এবং পরের দুই দিন ধরে প্রশাসনের শীর্ষকর্তা ও পুলিশ বিভাগের সকল শীর্ষ আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে— এত বড় সংখ্যায় প্রশাসনিক রদবদল বস্তুত পূর্বদৃষ্টান্তবিহীন। দুই রাতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় সব শীর্ষ আধিকারিক পদে নতুন মুখ।

বলা বাহুল্য, এই সব পদক্ষেপের কোনওটিই নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার বহির্ভূত নয়। নির্বাচন ঘোষিত হয়ে যাওয়ার পর কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। আগেও এ রাজ্যে ভোটকালীন রদবদলের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তবে কিনা, রদবদলের এমন ব্যাপকতা আগে দেখা যায়নি, এই যুদ্ধকালীন তৎপরতাও না। বোঝাই যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের এ বারের নির্বাচন কোনও কারণে একান্ত বিশেষ বলেই মনে করছে কেন্দ্র। এই ব্যাপক প্রশাসনিক রদবদলের সঙ্গে এও উল্লেখ্য যে, কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির কাছে এখন কলকাতা হল ‘পাখির চোখ’। দুয়ে দুয়ে চার করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সমগ্র কার্যক্রমকে ‘মধ্যরাতের গুপ্ত তাণ্ডব’ নামক অতিনাটকীয় অভিধা দিয়েছেন। তৎসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংক্ষুব্ধ পত্রও প্রেরণ করেছেন। তাঁর নিজস্ব স্বার্থেই তাঁর রাজনীতি ধাবমান, তা যেমন স্পষ্ট, কেন্দ্রীয় শাসকের রাজনৈতিক স্বার্থও এই সব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দ্বারা সুরক্ষিত করার প্রয়াস হচ্ছে, তাও পরিষ্কার। এত বড় মাপের প্রস্তুতির ফলে ভোটপর্ব নিরাপদ ও হিংসাবিহীন হবে, এমন আশা রইল। সঙ্গে রইল একটি আশঙ্কাকণ্টকও, কেননা রাজ্য নির্বাচনে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ এ বার এতই আলাদা মাপের, নজরকাড়া।

সর্বাধিক নজরকাড়া— এসআইআর সঙ্কট। ১৫ মার্চ নির্বাচনী ঘোষণা হয়ে গেল, অথচ ষাট লক্ষাধিক ‘বিবেচনাধীন’ পশ্চিমবঙ্গবাসীর কথাটি তুচ্ছই থেকে গেল। এতসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার অনিশ্চিত রেখে গণতান্ত্রিক নির্বাচন— ভারতীয় রাষ্ট্রে এখনও অবধি অভূতপূর্ব। যাঁরা নিজেদের বাতিল-সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে চান, তাঁদের জন্য নাকি ট্রাইবুনাল-পন্থা, অথচ এখনও তার চিহ্নমাত্র নেই, এবং শুরু হলেও তার সহজ মীমাংসা, কল্পনাতীত। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সমস্ত দায়িত্ব জাতীয় নির্বাচন কমিশনের, তথা কেন্দ্রীয় সরকারের। পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকে স্পষ্ট বার্তা এটাই— যে সরকার জনগণনার উদ্যোগ করতেও ব্যর্থ, ভোটতালিকা তৈরির সূত্রে এখন তা নাগরিকত্ব হরণের অভিমুখে অগ্রসরমাণ, এর থেকে বিপজ্জনক সময় ভারতীয় গণতন্ত্র দেখেনি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন