—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
সাইবার-অপরাধ শুধু ঘটে বয়স্ক মানুষদের সঙ্গেই, তাঁদের আন্তর্জাল-অজ্ঞতা বা স্বল্পজ্ঞানের সুযোগ নিয়ে— এমন একটা ধারণা প্রচলিত। ডিজিটাল অ্যারেস্ট, ব্ল্যাকমেলিং-সহ নানা প্রবঞ্চনা, শারীরিক-মানসিক হেনস্থা ও আর্থিক ক্ষতির যে ঘটনাগুলি সামনে আসে তাতে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকেরা প্রাপ্তবয়স্ক, মুখ্যত প্রবীণ। অথচ আন্তর্জাল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে অল্পবয়সিরা, বাল্য ও শৈশবও আজ বহুলাংশে আন্তর্জাল-কেন্দ্রিক। অভিভাবকদের দৃষ্টির অগোচরে নাবালক শিশু-কিশোরদের সেখানে প্রতারণার তো বটেই, অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও অমূলক নয়। বস্তুত হচ্ছেও তা-ই। ছোটরা অনলাইনে নানা গেম খেলে, তার আড়ালে অপরাধী কখনও তাদের ব্ল্যাকমেল করে চলেছে; কখনও প্ররোচিত করা হচ্ছে ভিডিয়ো, এমনকি অজানতেই পর্নোগ্রাফি তৈরিতেও; মাত্রা ছাড়াচ্ছে ‘সাইবার বুলিং’। ২০২৩-এর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় রুজু হয়েছে, সে বছর এমন ১,৭৭,৩৩৫টি মামলার প্রায় অর্ধেকই আন্তর্জালে শিশু-কিশোরদের অপরাধের শিকার হওয়া বিষয়ক। উঠে আসছে উদ্বেগজনক তথ্য: ভারতে ৮৫ শতাংশ বালক-বালিকাই সাইবার বুলিংয়ের শিকার। যৌন হেনস্থা থেকে ব্যক্তিগত ক্ষতির হুমকি, বাকি নেই কিছুই।
এই সব ভয়ঙ্কর অপরাধের সুরাহা হচ্ছে না কেন? কারণ নানাবিধ। প্রথম ও প্রধান কারণটি— ঘটনাগুলি সামনে আসছে না বলে। শিশু-কিশোররা সব সময় যে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধের মাত্রা বা গুরুত্ব বুঝতে পারে তা-ও নয়, বুঝলেও তারা ভয়ে বা লজ্জায় তা অভিভাবকদের বলছে না। যদি বা বলছেও, দেখা যাচ্ছে অভিভাবকেরাও তা গুরুত্ব দিচ্ছেন না; ছোটদের বকাঝকা করে, আন্তর্জাল সংযোগ বা সমাজমাধ্যম-উপস্থিতি সাময়িক ভাবে ছিন্ন করে ‘সমস্যা’ মেটানোর চেষ্টা করছেন, পুলিশকে জানাচ্ছেন না— অভিযোগ দায়ের দূরস্থান। আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে লোকলজ্জা বা বিব্রত হওয়ার ভয় বড়দের বিরত করছে আইনি পদক্ষেপ ও ন্যায়বিচারের পথ থেকে, অন্য দিকে অপরাধী থেকে যাচ্ছে অধরা, সুযোগ বুঝে তাক করছে একই বা অন্য শিশু-কিশোরকে। আর যে শিশু বা বালিকাটি অনলাইন অপরাধের শিকার হল, তার মনের খোঁজ রাখছে না কেউ— নিজেকেই দোষী ঠাওরে চরম পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে।
এই মুহূর্তেই এ দিকে নজর না দিলে সমূহ বিপদ। বাড়িতে পড়াশোনার ফাঁকে বা অবসরে আন্তর্জালে শিশুসন্তানেরা কখন কী করছে তা দেখার দায়িত্বটি মা-বাবা ও বাড়ির সবার— পেশাগত কর্মব্যস্ততা ও অন্য সব কিছুর পাশাপাশিই এ দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ছোটরা অনেকটা সময় কাটায় স্কুলে, শিক্ষকেরাও তাদের অনেকটা সময়ের অভিভাবক, এগিয়ে আসতে হবে তাঁদেরও— স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, বিশেষজ্ঞদের একত্র করে আন্তর্জাল অপরাধ নিয়ে ছাত্রোপযোগী আলোচনা, নাটিকা, প্রদর্শনী করতে পারেন। সর্বোপরি, এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে পুলিশ-প্রশাসন ও সরকারকে— পাড়া, ব্লক, অঞ্চল স্তরে প্রচার-অভিযান, ক্লাবগুলিকে কাজে লাগিয়ে সচেতনতা শিবির আয়োজন করা দরকার। প্রতিটি শিশুর সার্বিক সুস্থ ভবিষ্যতের প্রশ্নে কোনও আপস নয়, বোঝা দরকার এখনই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে