UK Freezes Venezuelan Gold

মাদুরো সরতেই টন টন সোনা ‘গায়েব’! ব্যাঙ্কে গচ্ছিত ‘হলুদ ধাতু’ পকেটে ভরে ভেনেজ়ুয়েলাকে ললিপপ ধরাল ধূর্ত ইংরেজ

আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্রিটেনের ব্যাঙ্কে টন টন সোনা রেখেছিল ভেনেজ়ুয়েলা। কিন্তু কারাকাসে নিকোলাস মাদুরো সরকারের পতন হতেই সেই ‘হলুদ ধাতু’ আর ফেরানো হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে আটলান্টিকের ওই দ্বীপরাষ্ট্র।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭
Share:
০১ ১৮

আচমকা মার্কিন হামলা। রাজধানী থেকে সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণ’। নতুন বছরের শুরুতেই জোড়া ঘটনায় দিশেহারা ভেনেজ়ুয়েলা। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার দেশটিতে বোমা ফাটিয়েছে ব্রিটেন। তাদের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত থাকা ৩১ টন সোনা কিছুতেই কারাকাসকে ফেরত দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আটলান্টিকের ওই দ্বীপরাষ্ট্র। এর জেরে খনিজ তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্রটির অবস্থা যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো তা বলাই বাহুল্য।

০২ ১৮

২০১৩ সালে ভেনেজ়ুয়েলায় ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। ওই সময় আর্থিক সঙ্কটের জেরে বেশ হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছিল কারাকাস। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের ভূগর্ভস্থ ভল্টে সোনা গচ্ছিত রাখা শুরু করেন তিনি। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটলান্টিকের পারের দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ৪৮০ কোটি ডলারের ‘হলুদ ধাতু’ জমা করেন মাদুরো। তাঁর পতনে এই সোনাই ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারের সরকার।

Advertisement
০৩ ১৮

যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স মাদুরোকে তুলে আনার পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভেনেজ়ুয়েলার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ডেলসি রদ্রিগেজ়। তিনি কুর্সিতে বসার পরই সোনা ফেরানোর বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলে স্টার্মার প্রশাসন। তখনই ইংরেজ বিদেশমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, ‘‘কারাকাসকে আমরা হলুদ ধাতু ফিরিয়ে দিচ্ছি না। কারণ, সেখানকার বর্তমান সরকারের কোনও আইনগত বৈধতা নেই।’’ তাঁর এই মন্তব্যের পরই দুনিয়া জুড়ে শুরু হয় হইচই।

০৪ ১৮

তবে মাদুরো পতনের পরই যে ভেনেজ়ুয়েলার সোনা কব্জা করার ছক ব্রিটেন কষেছে, এমনটা নয়। তিনি কুর্সিতে থাকাকালীনই ওই ‘হলুদ ধাতু’ নিয়ে কারাকাসের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সঙ্গে টানাপড়েনে জড়িয়ে পড়ে লন্ডন। ফলে বাধ্য হয়ে ইংল্যান্ডের আদালতের দ্বারস্থ হয় মাদুরো প্রশাসন। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরও ওই সোনা আর উদ্ধার করতে পারেননি তিনি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একেবারে খাদের কিনারায় গিয়ে পড়ে লাটিন আমেরিকার দেশটির অর্থনীতি।

০৫ ১৮

সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে শেষ বার ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের ভল্ট থেকে ‘হলুদ ধাতু’ উদ্ধারের একটা মরিয়া চেষ্টা করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাদুরো। ১৯৫ কোটি ডলার মূল্যের সোনা ফেরত চেয়ে লন্ডনের একটি আদালতে আপিল করে তাঁর সরকার। শুনানিতে বেশ কয়েক জন দুঁদে আইনজীবীকে দাঁড় করিয়েছিল কারাকাস। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। কারণ, তত দিনে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে গিয়েছেন মাদুরো। বিষয়টিকে ওই মামলায় ঢাল করেন ব্রিটিশ বিচারপতিরা।

০৬ ১৮

মাদুরোর পূর্বসূরি বামনেতা উগো চাভেজ় প্রেসিডেন্ট থাকার সময় থেকেই ভেনেজ়ুয়েলার উপর বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রোশ। ফলে ধীরে ধীরে পশ্চিমি দুনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কারাকাসের উপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বৃদ্ধি করে ওয়াশিংটন। পরবর্তী কালে মার্কিন পাশা উল্টে দিতে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডে সোনা রাখার সিদ্ধান্ত নেন মাদুরো। আর্থিক সঙ্কট তীব্র হলে ওই ‘হলুদ ধাতু’ ইউরোপের বাজারে বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।

০৭ ১৮

ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের পাশাপাশি সোনা গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে সুইৎজ়ারল্যান্ডকেও বেছেছিলেন ভেনেজ়ুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট। বার্নের শুল্ক দফতরের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বর্তমানে ওই ‘হলুদ ধাতু’র বাজারমূল্য প্রায় ৫২০ কোটি ডলার। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, দেশের আর্থিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে সুইস ব্যাঙ্কে সরকারি সোনা গচ্ছিত রাখেননি তিনি। সেখানে কার্যত জমা হয়েছে মাদুরোর পাচার করা ‘হলুদ ধাতু’।

০৮ ১৮

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩-’১৬ সালের মধ্যে ভেনেজ়ুয়েলা থেকে সুইৎজ়ারল্যান্ডে গিয়েছে প্রায় ১১৩ টন সোনা। মাদুরোর নির্দেশে ওই ‘হলুদ ধাতু’ পাচারে জড়িত ছিল কারাকাসের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কই। বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ২০১৭ সালে এ ভাবে সোনা পাঠানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইউরোপের ২৭ দেশের ওই সংগঠন। তার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অবশ্য ‘হলুদ ধাতু’ আর সুইস ব্যাঙ্কে পাঠাতে পারেননি লাটিন আমেরিকার দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট।

০৯ ১৮

মার্কিন ফৌজের হাতে মাদুরো গ্রেফতার হওয়ার পর সুইস ব্যাঙ্কের ভল্টে জমা থাকা সোনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় বার্ন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেনেজ়ুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ৩৬ জন ঘনিষ্ঠ সহযোগীয় যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয় সেখানকার সরকার। ফলে সুইৎজ়ারল্যান্ডের ব্যাঙ্কে জমা থাকা ‘হলুদ ধাতু’ আগামী দিনে আর কারাকাস উদ্ধার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।

১০ ১৮

বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, সুইস সরকারের ওই পদক্ষেপে ভেনেজ়ুয়েলার তেমন সমস্যা হবে না। তবে বিপদে পড়তে পারেন মাদুরো, তাঁর পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। কারণ, ওই ইউরোপীয় দেশটির ব্যাঙ্কে জমা থাকা সোনাকে কারাকাসের সরকারি সম্পত্তি বলা যাবে না। ব্যক্তিগত ভাবে সম্ভবত সংশ্লিষ্ট ‘হলুদ ধাতু’ কিনেছিলেন তাঁরা। এ ব্যাপারে এখনও স্পষ্ট করে অবশ্য কিছু বলতে পারেনি বার্ন। তা ছাড়া ব্রিটেনের মতো সংশ্লিষ্ট সোনা ফেরত দেওয়া হবে না, এ কথাও বলেননি সুইস কর্তৃপক্ষ।

১১ ১৮

এ ছাড়া সুইৎজ়ারল্যান্ডে গচ্ছিত মাদুরোর স্বর্ণভান্ডার নিয়ে আরও একটি তত্ত্ব রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, ‘হলুদ ধাতু’র প্রক্রিয়াকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য ইউরোপের ওই দেশে সোনা পাঠিয়েছিল ভেনেজ়ুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। কারণ, সুইৎজ়ারল্যান্ড হল বিশ্বের অন্যতম স্বর্ণ পরিশোধনকেন্দ্র। বর্তমানে বার্নের হাতে আছে চারটি পরিশোধনাগার। যদিও আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার চাপ থাকায় এত দিন কারাকাসের ‘হলুদ ধাতু’র ব্যাপারে কোনও রকম উৎসাহ দেখায়নি তারা।

১২ ১৮

আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, ২০১২-’১৬ সালের মধ্যে ইউরোপের বাজারে বিপুল পরিমাণে সোনা বিক্রি করে ভেনেজ়ুয়েলা। এর বেশির ভাগটাই হয়েছিল সুইৎজ়ারল্যান্ডের মাধ্যমে। শুধু তা-ই নয়, ‘হলুদ ধাতু’র বার চোরাপথে এশিয়ার দেশগুলিতে পাঠাতেও দু’বার ভাবেননি মাদুরো। ফলে ২০১৮ সাল আসতে আসতে কারাকাসের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বর্ণভান্ডার প্রায় খালি হয়ে যায়।

১৩ ১৮

মাদুরোর পতনে সোনার পাশাপাশি খনিজ তেলের বিশাল ভান্ডারও ভেনেজ়ুয়েলার হাতছাড়া হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই এই ইস্যুতে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘কারাকাসের অন্তর্বর্তিকালীন সরকার আমেরিকাকে সরবরাহ করবে তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল উচ্চমানের তেল, যা বিক্রি হবে বাজারমূল্যে।’’ এই অর্থের নিয়ন্ত্রণও যে ওয়াশিংটনের হাতেই থাকবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।

১৪ ১৮

মাদুরো অপহরণের কয়েক দিনের মাথাতেই ভেনেজ়ুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি সেরেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর জেরে কারাকাসের অপরিশোধিত তৈলভান্ডারের উপর নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে ওয়াশিংটন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস্টোফার রাইট। তাঁর কথায়, ‘‘সংশ্লিষ্ট তরল সোনার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি ডলার।’’ ক্যারিবিয়ানের উপকূলের দেশটির খনিজ তেল ভারতকে বিক্রির ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে আমেরিকা।

১৫ ১৮

একসময় ভেনেজ়ুয়েলার ‘তরল সোনা’র অন্যতম ক্রেতা ছিল নয়াদিল্লি। কিন্তু কারাকাসের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়তেই সেখান থেকে তেল কেনা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয় ভারত। বর্তমানে রাশিয়া থেকে সর্বাধিক ‘তরল সোনা’ কিনছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। এতে আমেরিকার আপত্তি থাকলেও তাতে তেমন গা করেনি নয়াদিল্লি। এর জেরে এ দেশের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভেনেজ়ুয়েলার তেল কিনলে সেই সমস্যা মিটে যেতে পারে বলেও মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

১৬ ১৮

মার্কিন জ্বালানি সচিব জানিয়েছেন, আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা নিয়ম মেনে বিক্রি হবে ভেনেজ়ুয়েলার তেল। ‘তরল সোনা’ রফতানি থেকে প্রাপ্ত টাকা কারাকাসেই পাঠাবে ওয়াশিংটন। সেই টাকা আমজনতার হিতার্থে খরচ করতে পারে মাদুরো-পরবর্তী সেখানকার অন্তর্বর্তী সরকার। এই প্রক্রিয়ায় কোথাও দুর্নীতিকে জায়গা দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

১৭ ১৮

গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়ে ভারত। ওই সময় দেশের সোনা ব্রিটিশ ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখতে বাধ্য হয় নয়াদিল্লি। পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতিতে উদারীকরণ নিয়ে আসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ। ওই সময় তিনি ছিলেন এ দেশের অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে সেই ‘হলুদ ধাতু’ ইউরোপ থেকে ফিরিয়ে এনেছে দিল্লি।

১৮ ১৮

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ফৌজ ইউক্রেন আক্রমণ করলে মস্কোর উপর ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। ফলে ক্রেমলিনের টাকা আটকে দেয় একাধিক দেশের ব্যাঙ্ক। গত প্রায় চার বছর ধরে এর কানাকড়িও উদ্ধার করতে পারেনি রাশিয়া। ভেনেজ়ুয়েলার ক্ষেত্রে ফের এক বার দেখা গেল সেই ছবিরই পুনরাবৃত্তি, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement