— প্রতীকী চিত্র।
সাংবাদিকরা যে কথা বুঝতে বাধ্য হয়েছেন, এ বার সাধারণ নাগরিকদেরও একই কথা শিখে নিতে হবে— কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করলেও বিপদ। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক ইনফর্মেশন টেকনোলজি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া এথিক্স কোড) সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট রুল ২০২৬-এর যে খসড়া প্রকাশ করেছে, তাতে স্পষ্ট যে, বিরুদ্ধ স্বর দমনের পথে আরও প্রবল ভাবে চলতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। ২০২৪ সালেও সরকার স্বাধীন ডিজিটাল নির্মাতা এবং অনলাইন কনটেন্টের উপরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করেছিল; সে দফায় প্রবল জনমতের চাপে শেষ অবধি পিছু হটতে হয় সরকারকে। বর্তমান খসড়া বিল আরও এক বার সেই একই চেষ্টা করছে। ‘প্রকাশক নন’ এমন ব্যক্তিবিশেষের অনলাইন মতামতকে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসতে উদ্যোগী এই বিল। গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক অথবা ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার একাধিক নজির আছে। নাগরিক সমাজের মুখ থেকে অসরকারি সংস্থা বা স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান— সরকারের সামান্য সমালোচনা করার ফলে রাষ্ট্রীয় রোষের শিকার হয়েছেন অনেকেই। এ বার এই মুখ বন্ধ করানোর প্রক্রিয়াটিকে আরও বেশি আইনি, আরও কাঠামোগত করে তোলার উদ্যোগ। এই খসড়া বিল যে ভঙ্গিতে ব্যক্তিনাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, গোটা গণতান্ত্রিক বিশ্বে তা ব্যতিক্রমী— বৈশ্বিক স্তরে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ সাধারণত প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়; সরাসরি ব্যক্তিগত নির্মাতাকে ব্লকিং অর্ডার পাঠানো, ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা, বা কনটেন্ট পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া অত্যন্ত বিরল। স্পষ্ট বলা প্রয়োজন যে, ভুয়ো তথ্য, ডিপফেক বা বিভ্রান্তিকর প্রচার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু সেই যুক্তিকে সামনে রেখে নাগরিক-কণ্ঠ দমন করা নিতান্ত একাধিপত্যবাদ।
অর্থনীতির যুক্তি কেন্দ্রীয় সরকার বিলক্ষণ বোঝে। জানে যে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির ব্যবসার উপরে চাপ তৈরি করতে পারলে তারাই স্বপ্রবৃত্ত হয়ে সরকার-বিরোধী গণতান্ত্রিক স্বর দমনের কাজ করবে। ফলে খসড়া বিল অনুসারে, ব্যক্তির মতামতের দায় বর্তাবে সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উপরেও। ৩৬ ঘণ্টার বদলে তিন ঘণ্টার মধ্যে সরকার-নির্দিষ্ট কনটেন্ট অপসারণের বাধ্যবাধকতা, ‘অ্যাডভাইজ়রি’-কে কার্যত আইনি নির্দেশে পরিণত করা, ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ-মান্যতার সঙ্গে যুক্ত করা— স্পষ্টতই সরকার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির উপরে এমন চাপ তৈরি করতে চায়, যাতে তারাই গণতান্ত্রিক মত দমনের যন্ত্র হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারের এই পদক্ষেপ ঘৃণাভাষণ বা বিদ্বেষদমনে বিন্দুমাত্র সহায়ক হবে না। কারণ, গত কয়েক বছরে স্পষ্ট যে, শাসক দলের পক্ষে যারা সমাজমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ায়, তাদের অন্যায় সরকারের চোখে পড়ে না। এই নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র বিরোধী স্বরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, নাগরিকের এমন আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনও অবকাশ নেই।
সে কারণেই, বিষয়টি শুধুমাত্র ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর’-দের প্রভাবিত করবে না, তা সমগ্র ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করা, প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমালোচনামূলক কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা— কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের এই রূপ কোনও নাগরিকের পক্ষেই ইতিবাচক হতে পারে না। এমনকি, বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতার প্রবলতম সমর্থকের পক্ষেও নয়। সব নাগরিক সব সময় রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো অবস্থায় থাকেন না। যাঁরা সেই কাজটি করেন, তাঁরা আসলে সব নাগরিকের জন্যই রাষ্ট্রের চোখে চোখ রাখার সাহস দেখান। তাই, এই দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা রাজনৈতিক মত-নির্বিশেষে নাগরিক কর্তব্য। এক বার নাগরিক স্বাধীনতার পরিসর সঙ্কুচিত হলে তাকে পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন, অসম্ভবও বলা চলে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে