Humanity

শত্রু

উস্কানি থেকে পৃষ্ঠপোষকতা, পুরোটাই চলছে শাসকের নীরব ও সরব অঙ্গুলিহেলনে। আরও দুর্ভাগ্যের, আইন-শৃঙ্খলার নিয়ামকরাও অনেক সময়েই সঙ্গী হচ্ছেন তাতে।

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:২০
Share:

ছত্তীসগঢ়ের রামনারায়ণ বাঘেল মারা গেলেন কেরলে, গত বছর ১৭ ডিসেম্বর। তার আট দিন আগে, ৯ ডিসেম্বর মারা গেছেন ত্রিপুরার অ্যাঞ্জেল চাকমা, উত্তরাখণ্ডে।মারা গেছেন বললে সত্যের অপলাপ হয়, দু’টি ক্ষেত্রেই দু’জনকে মেরে ফেলা হয়েছে— গোড়ায় টিটকিরি কেটে, পরে চড়াও হয়ে, প্রচণ্ড প্রহার করে। এই কাজ উগ্র, ক্রুদ্ধ জনতার, যারা রামনারায়ণকে বহিরাগত, অ্যাঞ্জেলকে বিদেশি মনে করেছিল। পরিযায়ী শ্রমিক রামনারায়ণকে মারতে মারতে তারা প্রশ্ন করেছিল তিনি ‘ঘুসপেটিয়া’, বাংলাদেশি কি না; অ্যাঞ্জেলের ক্ষেত্রে ঘটনার সূত্রপাতই ‘চিনা’ বলে বিদ্রুপে, তাঁর প্রতিবাদের প্রত্যাঘাত এসেছে গণপ্রহারে হত্যায়; মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত যাঁর মুখে শেষ কথা ছিল— ‘আমি এক জন ভারতীয়।’ নিপীড়ক ও ঘাতক সহ-ভারতীয়রা অবশ্য তা শোনেনি, শুনলেও কান দেয়নি।

এই তালিকাতেই যোগ করা যায় বিহারে গত মাসেই জনতার গণপ্রহারে মৃত বস্ত্রবিক্রেতা মহম্মদ আতহার হুসেনকে। ক’দিন আগে ক্রিসমাসের আবহে মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশ উত্তরাখণ্ড অসম তামিলনাড়ু কেরল দিল্লিতে উৎসবমুখর খ্রিস্টানদের আক্রমণ ও হেনস্থার যে ঘটনাগুলি খবরে এল, সেগুলির কোনওটিতেই যে কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি— তাকে কি সৌভাগ্য ধরে নিতে হবে? দলিত মেয়ের ধর্ষণ, নিম্নবর্গের পুরুষকে জনতার বিচারে অত্যাচারের সাজা— নতুন বছর এলেও প্রতিটি ঘটনা পুরনো সব উদাহরণের মতোই ঘটমান। গণহিংসা ‘ভিজিল্যান্ট জাস্টিস’-এর রূপ ধরে প্রকট করে তুলছে আজকের ভারতীয় সমাজের এই নগ্ন সত্য: যে কেউ, দেশের যে কোনও জায়গায় নিগৃহীত এমনকি নিহতও হতে পারেন— তাঁর চেহারা, বিশ্বাস, জাত, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, পোশাকের জন্য। যে কারও জীবনাশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে— কাকে তিনি ভালবাসছেন, কতটা যুক্তিশীল চিন্তা করছেন বা ক্ষমতার মুখের সামনে কোন সত্য বলছেন, তা। এ তো তবু বৃহৎ জীবনসত্যের ব্যাপার, ধর্মাচরণ, আচার-অনুষ্ঠান, খাওয়া-পরা-জীবিকার মতো অভ্যস্ত কাজগুলির জন্যও যে প্রাণ চলে যেতে পারে প্ররোচনাহীন ভাবে উগ্র ও হিংস্র কিছু সহনাগরিকের হাতেই, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’-এর প্রচারক ভারতে কে তা ভেবেছিল?

বিবিধের মাঝে মহান মিলন নিয়ে এত কাল গর্বিত ছিল যে ভারতীয় সমাজ, তার কী এমন হল যে ভাষা ধর্ম পোশাক খাবার তথা মত ও পথের বহুত্বকে সহ্য করা দূরস্থান, তার অস্তিত্বটুকু পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না চোখের সামনে? এর একটা কারণ নিশ্চয়ই রাজনীতি, বিশেষত শাসকের সংখ্যাগুরুবাদী রাজনৈতিক বয়ান: আসমুদ্রহিমাচল ভারতকে এমন ভাবে তা ছেয়ে ফেলেছে যে, যে কোনও প্রান্তিক বা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে চড়াও হতে এতটুকু বাধছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গণপ্রহার বা গণহিংসার অধিকাংশ ঘটনার পিছনে অভিযুক্ত বা অপরাধীরা শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত অথবা তার মতাদর্শের সমর্থক— হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের লোকেদের চার্চ ভাঙচুর, বা গোমাংস বহন-পরিবহণের জন্য নিরীহ মুসলমান কর্মীকে নিগ্রহ একই হিংসার দুই পিঠ। ক্ষমতাসীনের রাজনৈতিক বয়ানের জোর খাটিয়েই চলছে দলিতের অবমাননা, নারীধর্ষণ। শাসকের রাজনীতি কাজ করছে কখনও গণহিংসার নিয়ামক, কখনও অনুঘটক হিসেবে: নয়তো যে মানুষ কখনও আলাদা ভাষায় কথা বলা সহমানুষকে ‘বিপদ’ বা ‘শত্রু’ বলে ভাবেনি জীবনে, সে কেনই বা তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করবে; কোন যুক্তিতে ভাববে যে এই ভারতে ভিন্ন ধর্ম জীবনচর্যা বা যৌন পরিচয়ের মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত নেই? গণহিংসার তাৎক্ষণিকতায় যুক্তিবিচার মুছে যায় তা যেমন সত্য, তারও বড় সত্য: আজকের ভারতে গণহিংসার ইশারা-উস্কানি থেকে পৃষ্ঠপোষকতা, পুরোটাই চলছে শাসকের নীরব ও সরব অঙ্গুলিহেলনে। আরও দুর্ভাগ্যের, আইন-শৃঙ্খলার নিয়ামকরাও অনেক সময়েই সঙ্গী হচ্ছেন তাতে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মৃত্যু নয়, হত্যা হচ্ছে গণতন্ত্রের।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন