SIR

গণতন্ত্রের লজ্জা

রাষ্ট্র ও কমিশনের পক্ষ থেকে যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, দ্বিচারিতা, অসংবেদনশীলতার নজির গড়া হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার দম্ভপ্রসূত মূঢ়তা।

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩২
Share:

নাগরিকের ভোটাধিকারের সুরক্ষার নামে সেই অধিকারের ভোক্তাদের উপরেই লাঞ্ছনা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের ছবি দেখা যাচ্ছে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে। শুনানি-কেন্দ্রের সামনে নথির বোঝা কাঁধে বিপর্যস্ত, সন্ত্রস্ত মুখের সারি। হুইলচেয়ারে, অ্যাম্বুল্যান্সে শুনানিতে হাজির পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী, অশক্ত বৃদ্ধ, শয্যাশায়ী নাগরিক, শোকের পোশাকে সদ্য-স্বামীহারা। লাইনে না দাঁড়াতে হলেও যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির দোহাই দিয়ে শংসাপত্র-সহ তলব করা হয়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যুবককে। দৃশ্যগুলি ফিরিয়ে আনছে নোটবন্দির স্মৃতি। নাগরিকের প্রশ্ন: শেষ পর্যন্ত শাস্তি কার? ভুয়ো ভোটার ধরা পড়বে, না কি নিরীহদের জীবনযন্ত্রণা বাড়বে? নোট বাতিলের প্রক্রিয়াজাত অস্থিরতাকে বলা হয়েছিল সাময়িক কষ্ট। সে সিদ্ধান্তের পিছনে একটি তাৎক্ষণিক কাণ্ডজ্ঞানহীনতা ছিল। কিন্তু এসআইআর-এর ক্ষেত্রে তো তা হওয়ার কথা নয়। তবুও নাগরিকের যে হয়রানি এবং অসম্মান ঘটে চলেছে, তার ব্যাখ্যা দেওয়া, এবং ক্ষমাপ্রার্থনার দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না।

বছরের গোড়াতেই নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছিল, ৮৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভোটারদের ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে শুনানি ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে। নির্দেশ অমান্য করলে বিএলও ও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু এক মাস পরেও সেই নির্দেশ কার্যকর তো দূরস্থান, তার উল্টো ছবিই দেখা যাচ্ছে। কেন এঁদের বার বার ডাকা হচ্ছে, আদৌ তার জন্য কোনও আধিকারিককে জবাবদিহির আওতায়ও আসতে হল কি না, এ বিষয়ে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের নীরবতা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটিকে আবারও প্রকাশ্যে আনে। তা হল, চূড়ান্ত অস্পষ্টতা, সমন্বয়ের অভাব। কোন নথি গ্রহণযোগ্য, কত বার হাজিরার পর নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে— এ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা। প্রযুক্তিতে ত্রুটি থাকলে সেই সর্বজনীন সমস্যা সংশোধনের দায় উল্টে ভোটারের ঘাড়েই চাপানো হচ্ছে, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ভয় ও আতঙ্কের বাতাবরণে দিশাহারা মানুষ। শুনানি-কেন্দ্রে ট্রাঙ্কে করে পূর্বপুরুষের কবরের মাটি নিয়ে নাগরিকের উপস্থিতি ও ‘ডিএনএ’ পরীক্ষার জন্য চিৎকার কোনও ব্যতিক্রম নয়, ডায়মন্ড হারবারের মতো এই একই ধরনের ঘটনা মালদহেও দেখা গিয়েছে। কোনও রাষ্ট্র তার নাগরিককে এ ভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে, তা দেখেও বিশ্বাস করা কঠিন।

বার বার ডাক পাঠানো, মানসিক চাপ প্রয়োগ, উদ্বেগ বৃদ্ধির জেরে অসুস্থতা এমনকি হৃদ্‌রোগে মৃত্যু, আত্মহননের ঘটনা বাড়ছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রাপ্য মর্যাদার সাংবিধানিক অধিকারও কি লঙ্ঘিত হচ্ছে না? ক্ষেত্রবিশেষে ছাড় ও বাড়িতে গিয়ে শুনানির ব্যবস্থা মারফত তাঁদের বিশেষ সহায়তার রাষ্ট্রিক দায়িত্বটি অবহেলা করে তাঁদের জীবনে বাড়তি সমস্যার উদ্রেক তো আইন ও সংবিধানের পরিপন্থী। সন্দেহ নেই, বিশেষ নিবিড় সংশোধন গণতন্ত্রকে স্বচ্ছ রাখার জন্য জরুরি। কিন্তু, তা কার্যকর করতে গিয়ে রাষ্ট্র ও কমিশনের পক্ষ থেকে যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, দ্বিচারিতা, অসংবেদনশীলতার নজির গড়া হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার দম্ভপ্রসূত মূঢ়তা। ভোটাধিকারকে প্রশাসনের দাক্ষিণ্যে প্রাপ্ত সুবিধা ভেবে নেওয়ার অমার্জনীয় ভুল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন