Harassments

আপনজন

ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬ ধারা অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ-বিদ্বেষ ছড়ানো আইনত দণ্ডনীয়। তবে ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি ‘পাকিস্তানি’ বা ‘বাংলাদেশি’ কথাগুলির প্রয়োগ আইনত দণ্ডনীয় কি না, সে বিষয়ে আইন বা আদালতের কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশ নেই।

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ০৬:১৭
Share:

এত দিন অন্যান্য রাজ্যে ঘটত, এ বার খাস কলকাতাতে। তেঘরিয়ায় এক আনাজ বিক্রেতা যুবকের পরিচয়পত্র দেখতে চাইল, তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দেশ থেকে বার করে দেওয়ার শাসানি দেওয়া হল। গভীর দুর্ভাগ্য, নিজের রাজ্যে, নিজের শহরের রাস্তাঘাটে, দোকান-বাজারে হিংসার মুখে পড়তে হচ্ছে মুসলিমদের। দুর্বৃত্তদের বিদ্বেষের পিছনে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে লুণ্ঠনের ইচ্ছা— বাজারে মুসলিম বিক্রেতার জায়গাটি দখল করে নেওয়া, দোকান, ব্যবসা, বাসস্থান দখল করে নেওয়ার ফন্দি। এই অত্যাচারকে এখনই ‘অপরাধ’ বলে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। অঙ্কুরেই এর বিনাশ করতে হবে, নইলে সাম্প্রদায়িকতার বিষ দ্রুত গ্রাস করবে বাংলার সমাজকে। কোনও মুসলিম ব্যক্তিকে ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিহিত করা, তার নাগরিকত্বের প্রমাণ দাবি করা, অপমান করা, তাঁকে দেশ থেকে বার করে দেওয়ার হুমকি— এ রাজ্যে এগুলিকে অপরাধের এক বিশেষ গোত্র বলে চিহ্নিত করা দরকার। এই ভাবেই উত্তর ও পশ্চিম ভারতে এন্তার ব্যবহার হচ্ছে ‘পাকিস্তানি’ শব্দটি। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে দিল্লির আদালত মন্তব্য করেছিল (২০২৫)— মিশ্র ‘পাকিস্তান’ কথাটি তাঁর বক্তব্যে জুড়ে বিদ্বেষ ছড়িয়ে ভোট বাড়াতে চেয়েছেন (দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন, ২০২০)।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬ ধারা অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ-বিদ্বেষ ছড়ানো আইনত দণ্ডনীয়। তবে ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি ‘পাকিস্তানি’ বা ‘বাংলাদেশি’ কথাগুলির প্রয়োগ আইনত দণ্ডনীয় কি না, সে বিষয়ে আইন বা আদালতের কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশ নেই। গত বছর একটি রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল যে, ভারতীয়ের প্রতি ‘পাকিস্তানি’ শব্দটি নিম্ন রুচির পরিচয়, কিন্তু ‘অপরাধ’ নয়। সম্প্রতি বিদ্বেষ বাক্যকে (হেট স্পিচ) একটি বিশিষ্ট অপরাধ চিহ্নিত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেছিল একটি অসরকারি সংস্থা। বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং সন্দীপ মেহতা বলেছেন যে এটা আইনসভার কাজ, আদালতের নয়। বর্তমানে যে সব আইন, বিধি-ব্যবস্থাগুলি আছে, সেগুলি এই অপরাধের মোকাবিলায় যথেষ্ট। আদালতের এক্তিয়ার সম্পর্কে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ যথার্থ। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিকারের ব্যবস্থা কি সত্যিই পর্যাপ্ত? বিদ্বেষ বাক্যের বক্তা যদি ক্ষমতাসীন, প্রভাবশালী হন তখন পুলিশ সহজে অভিযোগ নেয় না, দুর্বল ধারা দেয়, শিথিল তদন্ত হয়, আদালতে মামলা ঝুলেই থাকে। অন্য দিকে, বিদ্বেষ বাক্যে রাশ টানতে যে আইনগুলি রয়েছে— জনসমাজে শান্তি নষ্ট করা, জাতীয় ঐক্যে আঘাত, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক নষ্ট করা, ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত করা প্রভৃতি— সেগুলি সহজেই আছড়ে পড়ে সাংবাদিক, সমাজকর্মী, সাহিত্যিক, ব্যঙ্গ-কৌতুক শিল্পীদের উপর।

সম্প্রতি হোমবাউন্ড (২০২৫) চলচ্চিত্রে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ চলাকালীন এক মুসলিম যুবকের প্রতি রসিকতার ছলে নানা কটাক্ষ করছিলেন সহকর্মীরা। পাকিস্তানের প্রতি যুবকের আনুগত্যের ইঙ্গিত চলতে থাকে। অপমানিত যুবকটি কাজ ছেড়ে দেয়। এমন মানসিক নির্যাতন ও দৈনন্দিন জীবনের ক্ষতির হিসাব কোথায়। এই অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রশাসনিক রূপরেখা তৈরি করা দরকার। সমাজকেও বুঝতে হবে, এই হৃদয়হীন নির্যাতন বন্ধ করা দরকার। নাগরিকের কাজ প্রতিবেশীকে রক্ষা করা, তার পাশে থাকা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন