নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল নয়াদিল্লিতে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের মাধ্যমে একটি বার্তা দিয়েছেন— কালাপানি-লিপুলেখ-লিম্পিয়াধুরা অঞ্চল নিয়ে মতপার্থক্য-সহ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয়সূচিতে থাকলেও, ভারত-নেপাল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এগুলোই একমাত্র নির্ণায়ক নয়। সীমান্ত বিরোধে তৃতীয় পক্ষের সহযোগিতা নিয়ে জল্পনা উস্কে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সাম্প্রতিক মন্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে খানাল পুনর্ব্যক্ত করেন যে, কাঠমান্ডু প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর দাবি, ব্রিটেনের সঙ্গে নেপালের সহযোগিতার লক্ষ্য হল এমন সব ঐতিহাসিক নথিপত্র সংগ্রহ করা যা তাঁদের দাবির সপক্ষে কাজ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য কোনও বাহ্যিক মধ্যস্থতা আহ্বান করা নয়। প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে নেপালের বিদেশমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হল, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরই তিনি ভারতকে নেপালের কিছু অংশ দখলের দায়ে অভিযুক্ত করলেন। পাশাপাশি এও দাবি করলেন যে ভারতীয় ভূখণ্ডের কিছু অংশে নেপালের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ভারতের উষ্মা বাড়িয়ে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই বিষয়ে তাঁরা ব্রিটেন ও চিনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
লক্ষণীয়, এই ঘটনা এমন সময়ে হল, যখন উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক সংহতি ও সংযোগের মাধ্যমে ক্রমশ গড়ে ওঠা কূটনৈতিক সম্পর্কের গতিধারা বজায় রাখতে আগ্রহী বলেই মনে করা যায়। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ নিজেদের এমন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যারা শাসনব্যবস্থার সংস্কার, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকীকরণের উপর গুরুত্ব দেয়। ইতিমধ্যেই নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে আলোচনার পরিধি বাড়ানোর আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে এবং নয়াদিল্লিকে নেপালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও অভিহিত করেছে। দুই দেশের মধ্যে উন্মুক্ত সীমান্ত এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগের পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট, আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি বাণিজ্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো ক্ষেত্রগুলো এই পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠছে। আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি এই ক্রমবিকাশমান কর্মসূচিরই ইঙ্গিতবাহী।
তবে, দিল্লির ভোলা উচিত নয় যে পূর্বে পড়শি রাষ্ট্রটিতে ব্যাপক প্রভাব বজায় রাখা গেলেও বর্তমানে সেই আধিপত্য বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষত ২০১৫ সালে নেপালের সংবিধান নিয়ে সৃষ্ট মতবিরোধ এবং ভারতের আরোপিত বাণিজ্য অবরোধের পর। সে দেশে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং একই সঙ্গে আমেরিকা ও চিনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। বহিরাগত হস্তক্ষেপের ধারণা এড়িয়ে কাঠমান্ডুর সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করতে নয়াদিল্লির দক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থেকে অর্থনৈতিক কূটনীতির দিকে ঝুঁকতে হবে— জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন, সংযোগ প্রকল্পে বৃহত্তর সহযোগিতা প্রদান এবং তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন ও রফতানিতে গতি আনা জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতির খেলা সহজ নয়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে