Food Crisis

ক্ষুধার গ্রাস

সমস্ত কিছু ছাপিয়ে আরও এক উদ্বেগচিত্র সামনে আসছে— বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয়ের প্রবণতা। রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সংক্রান্ত রিপোর্ট বলছে, শুধুমাত্র ২০২২ সালে ১০৫ কোটি টন খাদ্যবস্তু অপচয় করেছিল গোটা বিশ্ব।

শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ০৭:১৩
Share:

আমরা যদি মহাকাশ জয় করতে পারি, তা হলে শৈশবের ক্ষুধাকেও জয় করতে পারব— বলেছিলেন মহাকাশচারী বাজ় অলড্রিন। কিন্তু বাস্তব অন্য কথাই বলে। সাম্প্রতিক কালে ক্ষুধার গ্রাস বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমস্যাগুলির অন্যতম। সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’-এর ২০২৬ গ্লোবাল আউটলুক অনুযায়ী, ৩১ কোটিরও বেশি মানুষ খিদে নিয়ে রোজ শুতে যান। তারও মধ্যে ৪ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ভয়ঙ্কর খাদ্য অ-নিরাপত্তার শিকার। এবং ভারত, কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুধার গ্রাস থেকে পরিত্রাণ পায়নি। ২০২৫-এর বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল ১০২তম। শুধু তা-ই নয়, তার প্রাপ্ত স্কোর ছিল ২৫.৮, যার মধ্য দিয়ে এক গুরুতর খাদ্য অ-নিরাপত্তার ছবি ফুটে ওঠে।

ক্ষুধার এ-হেন পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ দিনের সতর্কবার্তাকেই সত্য প্রমাণ করে। এর কারণ কিন্তু উৎপাদনে ঘাটতি নয়। বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে এখনও এই গ্রহের প্রায় প্রতিটি মানুষেরই খাবার জোটার কথা। বাস্তবে যে তার প্রতিফলন দেখা যায় না, তার কারণ মূলত দারিদ্র, সংঘাত আর জলবায়ু পরিবর্তন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলিতে এক টুকরো রুটির জন্য হাহাকার চিত্র সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমের কল্যাণে সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। ইজ়রায়েলের আক্রমণে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাজ়ার পথে ত্রাণের খাদ্য-পানীয় সংগ্রহে দীর্ঘ অপেক্ষা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। নব্বইয়ের দশকে সুদানের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় কেভিন কার্টারের তোলা একটি ছবি তাঁকে পুলিৎজ়ার পুরস্কার এনে দিয়েছিল— অনাহারে মৃতপ্রায় এক শিশু ও একটি শকুনের। উভয়েই খাদ্যের অপেক্ষায়। মর্মান্তিক ছবিটি দুর্ভিক্ষপীড়িত এবং মহামারি আক্রান্ত দক্ষিণ সুদানের প্রকৃত চেহারাটি হাট করে খুলে দিয়েছিল অবশিষ্ট বিশ্বের সামনে। সে ছবি সম্মানিত হলেও বিশ্বনেতাদের টনক কিন্তু নড়েনি। তাই এখনও বিশ্বের নানা প্রান্তে আছড়ে পড়ছে বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ় প্রণালীতে দীর্ঘ অবরোধ বিশ্বে যে জ্বালানি ও সারের সঙ্কট সৃষ্টি করেছে, তাতে দরিদ্র দেশগুলিতে খাদ্য নিরাপত্তা আগামী দিনে প্রবল ভাবে বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা। রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কাও। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, তীব্র সামুদ্রিক ঝড় প্রতিনিয়ত তছনছ করছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত। ঘরবাড়ি, জীবিকা, জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বিশাল সংখ্যক মানুষ, প্রতিনিয়ত। বিপন্ন দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলি। তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব ক্ষুধার পরিসংখ্যানগুলি অস্বীকারের উপায়মাত্র নেই।

তবে এ সমস্ত কিছু ছাপিয়ে আরও এক উদ্বেগচিত্র সামনে আসছে— বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয়ের প্রবণতা। রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সংক্রান্ত রিপোর্ট বলছে, শুধুমাত্র ২০২২ সালে ১০৫ কোটি টন খাদ্যবস্তু অপচয় করেছিল গোটা বিশ্ব। অপচয়ের কারণে এক দিকে অসংখ্য মানুষ খাদ্যবঞ্চিত হচ্ছেন। অন্য দিকে, বিপুল পরিমাণ নষ্ট হওয়া খাবার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। গৃহস্থ বাড়ির হেঁশেল থেকে নিম্নমানের সংরক্ষণ পদ্ধতি— অপচয়ের কারণ নানাবিধ। ভারতের রান্নাঘরে অপচয় হওয়া খাদ্যের পরিমাণ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কম হলেও এখানে অনেক ক্ষেত্রে চরম আবহাওয়া এবং নিম্নমানের সংরক্ষণ পদ্ধতির কারণে পর্যাপ্ত উৎপাদনও দরিদ্রের পাত অবধি পৌঁছতে পারে না। এই ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগী হওয়া জরুরি। প্রতিটি কণা খাদ্যের মূল্য অপরিসীম— বিবেচনা হওয়া উচিত এই পথে। দরিদ্রের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বহু প্রকল্প আছে। তার সুবিধা প্রত্যেক দরিদ্র প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, নজরদারি জরুরি। চন্দ্রযান, মহাকাশযানের স্বপ্নমাখা দেশে নাগরিকদের একাংশ ক্ষুধায় কাতর হবেন— এ দৃশ্যের তিলমাত্র সম্ভাবনাটুকুও সমূলে উপড়ে ফেলার সময় এসেছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন